Jul 25, 2019

বাজেট ভাবনা

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেছেন। মোট বাজেটের পরিমাণ ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এটি একটি মেগাবাজেট। মোট বাজেট ১৯৭২-৭৩ সালের ৭৮৬ কোটি টাকার তুলনায় ৬৬৬ গুণ বেশি। এমনকি গত অর্থবছরের ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বাজেটের তুলনায় এটি ১৩ শতাংশ বেশি।

গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই হার হবে আরও বেশি। এই বিরাট বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ রয়েছে। কারণ বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাজেট বাস্তবায়ন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি, বরং ঐতিহাসিকভাবে এই হার নিম্নমুখী। তবে বাজেটের কত শতাংশ বাস্তবায়ন হলো-তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর বাস্তবায়নের মান অর্থাৎ বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা কী অর্জন করতে পারলাম।


আমাদের বাজেট, বিশেষত উন্নয়ন বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয় উল্লেখযোগ্য কিছু মেগাপ্রকল্পে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দশটি বিশাল আকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। যেমনÑ রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২০১০ সালে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। গত ৯ বছরের এই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। তা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আমাদের আশঙ্কা। মেগাপ্রকল্পের সঙ্গে মেগাদুর্নীতি জড়িত। এ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় সাম্প্রতিক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশ’ কেলেঙ্কারিতে। এ ছাড়া অনেক মেগাপ্রকল্পে কাজের মান নিয়ে জনমনে অনেক গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

উপরন্তু অনেক নির্মাণ প্রকল্প, বিশেষত রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কারের প্রকল্প অর্থবছরের শেষ সময় এসে তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয়। ফলে অনেক অপচয় হয়। তাই বড় বাজেট করে বাহবা কুড়ানোর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রীকে বাজেট বাস্তবায়নের মান সম্পর্কেও জবাবদিহি করতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের মান সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীকে জবাবদিহি করার বড় সুযোগ হলো পূর্ববর্তী বছরের সংশোধিত বাজেট। সংশোধিত বাজেটের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়নে অনেক অসঙ্গতি ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সংশোধিত বাজেট নিয়ে সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে তেমন কোনো আলোচনা হয় না।

বস্তুত বাজেট নিয়ে কোনো গভীর আলোচনা সংসদে হয় না। তাই আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে সংসদ সদস্যরা সংশোধিত বাজেট নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। অর্থমন্ত্রীও কেন তার প্রস্তাবিত বাজেটকে সংশোধিত করতে হলো, বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান হয়েছেÑ তা স্বপ্রণোদিত হয়ে সংসদে উত্থাপন করবেন। মেগাবাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার যুক্তিতে। উচ্চপ্রবৃদ্ধির হার দ্রুতগতির উন্নয়নের সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রথমত, প্রশ্ন রয়েছে প্রবৃদ্ধির হারের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে। ভারতের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম গবেষণা করে দেখিয়েছেন, ভারতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার সরকারি হিসাব থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম।

সরকারি হিসাব মতে, সাম্প্রতিককালে ভারতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধির হারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও অনেকের মনেই গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। তাই আমাদের প্রবৃদ্ধি হার নিয়ে সরকারের বাইরে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষণা হওয়া জরুরিÑ যাতে ওই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সব সন্দেহের অবসান ঘটে। উচ্চপ্রবৃদ্ধির হারের উৎস কী? আমাদের উচ্চপ্রবৃদ্ধির বড় উৎস হলো মেগাপ্রকল্পগুলো। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে পরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়েছে ২৬ হাজার ১৭ কোটি টাকা। ভূতত্ত্ব, পরিকল্পনা, পানিসম্পদ ও গৃহায়ন খাতে ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ১০টি ফাস্ট ট্র্যাক মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৯ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা (, ১৪ জুন ২০১৯)। অনেক মেগাপ্রকল্প নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর মধ্যে পরিবেশবিধ্বংসী ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে এমন প্রকল্পও রয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের জীবনমানে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। অবশ্য এগুলো একশ্রেণির মানুষকে, বিশেষ করে যারা সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত, তাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে সহায়তা করছে। তাই উচ্চপ্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে আয় ও সুযোগের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তা ভবিষ্যতে সমাজে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সরকারও স্বীকার করছে, আমাদের দেশের ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এই বৈষম্য যে কত প্রকট ও ব্যাপক, তা সরকারি হিসাবে আসে না। আমাদের অর্থনীতিতে কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বিরাট পরিমাণের। ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই ওই অপ্রদর্শিত কালোটাকার মালিক। বৈষম্য পরিমাপে এই অপ্রদর্শিত আয় যুক্ত করা হলে বৈষম্যের পরিমাণ আরও ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাবে। তাই আমাদের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।

এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। উন্নত জীবনমান অর্জিত হলে মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন হয়। আর এসব পরিবর্তন ঘটে যখন সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ ও উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা পান এবং তাদের জন্য অধিক পুষ্টির জোগান পান। অবকাঠামো খাতে ক্রমবর্ধমান বিরাট বিনিয়োগের কারণে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হার উচ্চ হলেও আমাদের শিক্ষার মানে অবনতি ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবার মানে কাক্সিক্ষত উন্নতি ঘটেনি। ফলে অনেক অসুস্থ মানুষকেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে হয়। সম্প্রতি একটি হিসাবে দেখা গেছে, ভারতে চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া বিদেশি রোগীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশই বাংলাদেশি।

এ ছাড়া পুষ্টি জোগানের ক্ষেত্রে আমরা সফলতা দেখতে পাচ্ছি না। তাই আমাদের অর্জিত উচ্চপ্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনমানে কতটুকু প্রভাব ফেলে-এ প্রশ্ন থেকেই যায়। পরিশেষে বলব-বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবসংক্রান্ত দলিল নয়, এর মাধ্যমে জাতীয় অগ্রাধিকারও চিহ্নিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয় না। বিগত বছরের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে কিছু যোগ-বিয়োগ করে সাধারণত বাজেট প্রণয়ন করা হয়। এর সঙ্গে কিছু নতুন উন্নয়ন প্রকল্প জুড়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু অতীতের চলমান প্রকল্পগুলো-যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, সেগুলো সাধারণত বাদ দেওয়া হয় না। তাই আমাদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া একটি গতানুগতিক ছকের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছে। আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হলে এই ছকের বাইরে আসতে হবে। আমি আশা করি, আমাদের ভবিষ্যতের বাজেটগুলো আর গতানুগতিক ছকবাঁধা হবে না।

তথ্যসূত্র: http://www.dainikamadershomoy.com/post/203478

No comments:

Post a Comment