Dec 1, 2018

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে কিছু প্রস্তাব

খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক গুরুতর প্রশ্ন উঠলেও নিকট অতীতে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই রংপুরে একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচন থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং তার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের খাতিরে আমাদের নির্বাচনী বিধিবিধান ও ব্যবস্থায় জরুরিভাবে কিছু পরিবর্তন আনা আবশ্যক।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো নির্বাচন কমিশন, সরকার, তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। এসব অংশীজনের নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের ওপরই নির্ভর করবে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না। আর এসব অংশীজন যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে বা না করতে পারে, তাহলে নির্বাচন বিতর্কিত হতে বাধ্য।

তবে ওপরে উল্লেখ করা অংশীজনের মধ্যে সবার ভূমিকা সম–গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের। বস্তুত কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনের সব আয়োজন সম্পন্ন
করার জন্য, যাতে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। কারণ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্বশর্ত।
নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো সরকার ও সরকারি দল। সাম্প্রতিক কালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে এটি আবারও সুস্পষ্ট যে সরকারের অংশ হিসেবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি দল সদাচরণ না করলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের পক্ষেও তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভবপর হয় না। তাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অপরিহার্য হলেও তা যথেষ্ট নয়। তবে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার সংবিধান প্রদত্ত অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ব্যবহার করে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে অসম্মতি জানাতে পারে, মাঝপথে নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে, এমনকি তদন্ত সাপেক্ষে নির্বাচনী ফলাফলও বাতিল করতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের সততা, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া, এটি এক দিনের বিষয় নয়। নির্বাচন এক দিনের বিষয় হলে ‘এক দিনের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যাকে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয় নির্বাচনের পরদিন থেকে এবং শেষ হয় পাঁচ বছর পর পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনেক ধাপ রয়েছে এবং এ ধাপগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্বাচনের সঠিকতা নির্ভর করে। প্রসঙ্গত, সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল এবং পলিটিক্যাল রাইটস, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি অনুযায়ী আমরা ‘জেনুইন’ বা সঠিক নির্বাচন করতে দায়বদ্ধ। তাই অন্যরা আমাদের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে, যেমন পারে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে।
সঠিক নির্বাচনের জন্য আবশ্যকীয় ধাপগুলো হলো যাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য, তাঁদের ভোটার হতে পারা; যাঁরা প্রার্থী হতে আগ্রহী, তাঁদের প্রার্থী হতে পারা; ভোটারদের সামনে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প থাকা; প্রার্থীদের এবং সব দলকে নির্বিঘ্নে ও হয়রানিমুক্তভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেওয়া; প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে কোনোরূপ বাধা না থাকা এবং এজেন্টদের হয়রানি না করা; ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও সঠিক তথ্য থাকা; ভোট প্রদান টাকা ও পেশিশক্তিমুক্ত হওয়া; ভোটের দিনে ভোটারদের স্বাধীনভাবে ও প্রভাবমুক্ত হয়ে ভোট দিতে পারা; ভোটকেন্দ্র এবং তার নিকটস্থ স্থানে কোনোরূপ মিছিল ও প্রচার-প্রচারণা না চালাতে পারা এবং ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা রক্ষা করা; সঠিকভাবে ভোট গণনা ও প্রকাশ করা; ভোটের পর সরকারের পক্ষ থেকে জনরায়কে ভন্ডুল করা থেকে বিরত থাকা; ভোটের ফলাফল অপছন্দের কারণে ভোটারদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া থেকে নিবৃত্ত থাকা এবং সর্বোপরি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য হওয়া। এসব ধাপ সঠিক হলে নির্বাচনী মাঠ সমতল থাকে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনে ওপরে উল্লেখ করা ধাপগুলো সঠিক না থাকার কারণে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই খুলনা ও গাজীপুরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আসন্ন তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে আমরা নিম্নোক্ত প্রস্তাবগুলো করছি:
১. আইনানুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচন বাতিল হওয়ার কথা। তাই আমাদের নির্বাচনী, তথা রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের/রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে প্রার্থীদের, বিশেষত মেয়র পদপ্রার্থীদের হলফনামাগুলো প্রয়োজনে এনবিআর ও দুদকের সহায়তা নিয়ে চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা।
২. বর্তমানে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের হলফনামা চ্যালেঞ্জ করার বিধান রয়েছে। এই বিধান স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রেও এবং সব ভোটারের জন্যও প্রযোজ্য করা।
৩. আমাদের সব নির্বাচনী আইনের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা হলো প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশন/রিটার্নিং কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করবেন, যা বাস্তবে ঘটে না। তাই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর (যেমন সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০-এর ৮৪, ৮৯ ধারা) স্পষ্টকরণ আবশ্যক, যাতে বিরাজমান ‘দ্বৈত শাসন’–এর অবসান ঘটে এবং নির্বাচনকালীন সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশন/রিটার্নিং কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। এ লক্ষ্যে ‘সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ’–এর অভিপ্রায়ে নির্বাচন কমিশনের ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনো বাসিন্দা বা ভোটারকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার না করার’ নির্দেশনাসংবলিত নির্বাচন কমিশনের ২৪ জুন ২০১৮-এর প্রজ্ঞাপনের মতো একই নির্দেশনা সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্যও অনতিবিলম্বে জারি করা আবশ্যক। এই নির্দেশনায় আরও স্পষ্টকরণ আবশ্যক যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি ব্যতিরেকে সিটি করপোরেশনের কোনো বাসিন্দা বা ভোটারকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। আর ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করার লক্ষ্যে সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করা হলে কমিশনকে বিধির ৮১ ধারার অধীনে শাস্তি কার্যকরও করতে হবে।
৪. ভোট গ্রহণের সময় সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত করা এবং ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ভোটকেন্দ্রে আগের রাতের পরিবর্তে ভোটের দিন সকালে বিতরণ করা। গ্রীষ্মকালে এবং মহানগরের নির্বাচনে এটি করা অতি সহজেই সম্ভব।
৫. ভোট গ্রহণের শুরুতে ব্যালট বাক্স সবাইকে প্রদর্শনের সময় বাক্স খালি বলে সব প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত, যদি না কোনো প্রার্থী তা লিখিতভাবে পরিত্যাগ করেন, একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা।
৬. প্রতি ঘণ্টায় মোট ভোট প্রদানের সংখ্যা সব প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা।
৭. ভোট গণনা শেষে ভোটের হিসাব সব
প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষরসংবলিত একটি প্রত্যয়নপত্র প্রকাশ করা।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী বিধিবিধানে এসব এবং প্রয়োজনে আরও পরিবর্তন আনতে পারে। আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাসেম মামলার রায়ে [৪৫ ডিএলআর (এডি) (১৯৯৩)] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে সংবিধানের ‘তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ’–এর বিধানের অধীনে প্রদত্ত অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে আইনি বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারবে। এ ছাড়া আমাদের নির্বাচন কমিশনকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর জন্য একমাত্র প্রয়োজন কমিশনের সদিচ্ছা।

তথ্যসূত্র:
https://www.prothomalo.com/opinion/article/1526601/%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A6%A3%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A7%81-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%B2%E0%A6%A8%E0%A6%BE?fbclid=IwAR2Gsmaa0NnQYYOM6c0untgwE49qByuJFvplg2O_tb6chxwzQP76HkXJw6o

No comments:

Post a Comment