Dec 1, 2018

সমঝোতাই সংকটের সমাধান

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বহুল প্রতীক্ষিত সংলাপ। ১ নভেম্বর ১৪ দল ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরবর্তী এক সপ্তাহে ৭০টি দলের সঙ্গে সংলাপ হয়। প্রথম সংলাপের মাধ্যমে কোনো উল্লেখযোগ্য সমাধান না আসায় ৭ নভেম্বর এ দুই জোটের (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ১৪ দল) মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয় এই সংলাপ। যদিও দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের মধ্যে- যাদের মধ্যে ভয়াবহ বৈরী সম্পর্ক- সংলাপের উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল, কারণ আমরা বহুদিন থেকেই সংলাপ এবং এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাধানের দাবি করে আসছিলাম।

আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে এবং আমরা একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে পাব, যার মাধ্যমে মানুষ তার ভোটাধিকার ফিরে পাবে।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি একতরফা এবং এতে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ায় অনেকেই তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যদিও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হল সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তবে নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়, যদিও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের যাত্রাপথের সূচনা হয়।
বিদ্যমান সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে প্রথমত দরকার হবে নির্বাচনকালীন এমন একটি সরকার, যা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন হবে এমন একটি নির্বাচন কমিশন যা নিরপেক্ষ আচরণ করবে। আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশন গত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে এরই মধ্যে জনগণের আস্থা বহুলাংশে হারিয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রয়োজন হবে সংসদ ভেঙে দেয়া। কারণ সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচনে সমতল ক্ষেত্র বিরাজ করবে না, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পর্বতপ্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সংসদ সদস্যরা স্থানীয়ভাবে প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। দুর্ভাগ্যবশত সংলাপে এই তিন ক্ষেত্রে- নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও সংসদ ভেঙে দেয়া- কোনো অগ্রগতিই হয়নি।
পক্ষান্তরে সংলাপের মাধ্যমে যেসব ক্ষেত্রে সমাধানের আশ্বাস পাওয়া গেছে তা হল- সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা, গায়েবি মামলা প্রত্যাহার করা, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে আসতে দেয়া এবং সভা-সমাবেশের অনুমতি প্রদান করা। আমরা মনে করি, সরকার বিরোধী পক্ষকে যেসব বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে সেগুলো তাদের প্রাপ্য অধিকার এবং সরকারের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
কারণ রাজনৈতিক কারণে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার না হওয়ার এবং নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা চালানোর অধিকার এবং বাক ও সমাবেশের স্বাধীনতা তো চাওয়ার বা অনুকম্পার বিষয় নয়- এগুলো নাগরিকের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।
ইভিএমের ব্যাপারে আসা যাক। যে ইভিএম যন্ত্র ব্যবহার করা হবে তা কেউ কখনও দেখেনি এবং এর বৈশিষ্ট্য ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কারও কোনো ধারণাই নেই। নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব ছিল যন্ত্রটির নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণের জন্য বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে বিশেষ ডেমনস্ট্রেশনের আয়োজন করা, যাতে এটি নিয়ে সব সন্দেহের অবসান ঘটে এবং একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি হয়, যা করতে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এছাড়াও তাদের আস্থা অর্জন না করে ইভিএম ব্যবহার হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেয়া কমিশনের অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট বরখেলাপ, কারণ গত বছর ইসি আয়োজিত সংলাপ শেষে রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য ছাড়া নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে না বলে কমিশন সবাইকে আশ্বস্ত করেছিল। এখন কার স্বার্থে ইভিএম ব্যবহারে কমিশন এত অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিককালে ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ’ ব্যাপারটা একটা আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এখনও হয়নি এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, সেসব উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়টি স্বীকৃত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূলত, পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনে কারচুপি ও জবরদস্তির প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে। বাংলাদেশেও বিতর্কিত নির্বাচনগুলো ছাড়া অতীতে অন্য জাতীয় নির্বাচনগুলো বিদেশিরা পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আসার সময় এখন পার হয়ে গেছে বলেই অভিজ্ঞদের ধারণা।
সংলাপে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, গায়েবি মামলা প্রত্যাহার করা হবে, যদিও কোনো সভ্য দেশে গায়েবি মামলা হয় না। কিন্তু গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, ৬ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার অভিযান চালায়। সমাবেশের আগের দিন রাতেই পুলিশ বিরোধী পক্ষের কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে (প্রথম আলো, ৮ নভেম্বর ২০১৮)।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে তিন দিনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ২,২০০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করার অভিযোগ উঠেছে (দি ডেইলি স্টার, ৯ নভেম্বর ২০১৮)। এছাড়া ডিএমপির প্রতিটি থানায় নতুন করে মামলা হয়েছে।
এসব মামলার বাদী পুলিশ নিজেই (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৮ নভেম্বর ২০১৮)। ঢাকার বাইরে থেকে ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রেও বাধা দেয়া ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ঐক্যফ্রন্টের ৯ নভেম্বরের সমাবেশের আগের দিন রাজশাহীকে সারা দেশ থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলা হয়েছিল।

আমরা আশা করেছিলাম, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে বিবদমান দলগুলো একটি ঐকমত্যে পৌঁছবে, কিন্তু তা হয়নি। আমাদের অভিজ্ঞতা হল, দলীয় সরকারের অধীনে কখনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়- অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে আমাদের দেশে যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার সবগুলোতেই ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়েছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ব্যাপক হারে দলীয়করণ হয়েছে, যা বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কর্মরত দলীয় ব্যক্তিরা তাদের স্বার্থেই হয়তো তা করতে দেবে না। তাই নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সমঝোতা হওয়া জরুরি ছিল।
বর্তমান অবস্থায় মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতা দরকার এবং এখনও সে সময় আছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের মনে রাখা দরকার, ভোটের অধিকার অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন।
ভোটের ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই একাত্তরে এ দেশের জনগণ তাদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে। তাই ভোটের অধিকার আমাদের প্রাপ্য ও প্রাণের দাবি এবং রাজনীতিবিদরা আমাদেরকে এই অধিকার দিতে বাধ্য।
আমরা আশা করি, আমাদের সম্মানিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সংলাপের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছবেন, বিরাজমান সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে একটি ‘জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষর করবেন এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটাবেন [দেখুন : রাষ্ট্র মেরামতে চাই ‘জাতীয় সনদ’ (প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০১৮)]।
কারণ সংলাপই একমাত্র সমাধানের পথ, যার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা। আর তা হলেই ভবিষ্যতের সংকট ও অনিশ্চয়তা এড়িয়ে জাতি হিসেবে আমরা শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারব।
তথ্যসূত্র:
https://www.jugantor.com/todays-paper/window/110356/%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%9D%E0%A7%8B%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8?fbclid=IwAR1XnWA_D8baQHZX0VBb662z_D_nlckudejzdMp4OqkBhtpDCepETh_Hia4

No comments:

Post a Comment