Dec 1, 2018

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জরুরি কমিশনের নিরপেক্ষতা

সম্প্রতি ড. কামাল হোসেন ঘোষণা দিয়েছেন যে, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না। এ ঘোষণা আমাদেরকে আশাবাদী করেছে যে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর সব দলকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এখনও শঙ্কা থেকে যায়- নির্বাচনটি কি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে? এর ফলাফল কি গ্রহণযোগ্য হবে?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করার পথে অনেকগুলো প্রর্বতপ্রমাণ বাধা রয়েছে। প্রথম বাধা হল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ।

আমরা দেখেছি যে, গত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির মাধ্যমে সরকার তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘরছাড়া করেছে, যাতে তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাতে না পারে। এর মাধ্যমে তথাকথিত ‘খুলনা মডেল’র নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছে।


জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি এ ধরনের দমন-পীড়ন ও হয়রানিতে নতুনমাত্রা যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে গায়েবি মামলা, যা কোনো সভ্যসমাজে ঘটে না। অভিযোগ উঠেছে যে- প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর ছাড়িয়ে এবার গ্রেফতার বিরোধী দলের চতুর্থ স্তরের নেতাকর্মী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কিছুদিন আগে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমার এক সহকর্মীকে বলেছেন যে, নির্বাচনের সময়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ঠিকানা হবে হয় কারাগার, না হয় নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে।

বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৪২৯টি। আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৪৪১ জন। অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৪ জন। এ সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ১০ হাজার ৫১৩ জন।

দুই দফায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে মামলার তালিকাও জমা দিয়েছে বিএনপি। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের করা মামলাগুলো স্থগিত হয় এবং যারা এসব মামলায় কারাগারে আছে, তারা যেন জামিনে মুক্তি পান, যাতে তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

পুলিশের বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা এখন নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় উদ্ঘাটনে নিয়োজিত হয়েছে। এটি নিয়ে নাকি পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন লুকোচুরি খেলছে (প্রথম আলো, ১৯ নভেম্বর ২০১৮)। আশা করি, কমিশন দ্রুত পুলিশের সব ধরনের বাড়াবাড়ির অবসান ঘটাবে এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেফতার বন্ধ করবে।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে দ্বিতীয় বাধা হল সংসদ বহাল থাকা। সংবিধান আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যদেরকে ‘আইন প্রণয়নের ক্ষমতা’ প্রদান করলেও, সংবিধান এবং উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে তারা স্থানীয় উন্নয়নেই বেশি মনোযোগী। আর স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে তারা স্থানীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

অনেক এলাকায় সংসদ সদস্যের অনুমতি ছাড়া তাদের নির্বাচনী এলাকায় এমনকি গাছের পাতাও নড়ে না। তাই সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে নির্বাচনী মাঠ অসমতলই থেকে যাবে, কারণ সংসদ সদস্যদের পক্ষে অতি সহজেই নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করা সম্ভব হবে। তাদেরকে নির্বাচন প্রভাবিত না করার কথা বলা হলেও তারা যে তা শুনবেন, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্বাচন কমিশন আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনতে পারত, যে অঙ্গীকার কমিশন করেছিলও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশন ২০০৮ সালে প্রণীত, যখন সংসদ বহাল ছিল না, আচরণবিধিই মূলত বহাল রাখল। একটি সময়োপযোগী আচরণবিধি প্রণয়নে নির্বাচন কমিশনের এ ব্যর্থতার ফলে নির্বাচনী মাঠ অসমতলই থেকে যাবে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা সমসুযোগ থেকে বঞ্চিতই থাকবেন।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন গঠিত।

নির্বাচনের সময়ে কমিশন রেফারির ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বর্তমান কমিশন গত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও কমিশনের ভূমিকা বহুলাংশে প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেছে।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে তফসিল ঘোষণার পর তাদের গ্রেফতার হওয়া ৪৭২ জন নেতাকর্মীর তালিকা কমিশনকে দেয়া হয়েছে (প্রথম আলো, ১৬ নভেম্বর ২০১৮)। এখন দেখার বিষয় কমিশন এ তালিকা নিয়ে কী করে!

সম্প্রতি আরেকটি ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন নেতাকমীরা মিছিল ও শোডাউন করে ঢাকা মহানগরের একাংশকে অচল করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে, যাতে কমিশন কোনো বাধা প্রদান করেনি। এ প্রক্রিয়ায় দুই প্রার্থীর নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে দু’জন ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনার পর ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে বলে আমরা শুনিনি। এ ছাড়া একজনকে গ্রেফতার করে ১২ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলেও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন বেরিয়েছে।

তবে বিএনপির মনোনয়নপত্র কেনা শুরু হওয়ার পর কমিশন পুলিশকে চিঠি দিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করে। পরবর্তী সময়ে গত ৯ নভেম্বর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে এবং সংঘর্ষকালীন কয়েকজন হেলমেটধারীকে পুলিশের গাড়ি ভাংচুর এবং একজনকে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিতে দেখা যায়।

এরপর পুলিশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের এবং ৬৫ জনকে গ্রেফতার করে ৩৮ জনকে রিমান্ডে নিয়েছে (প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর ২০১৮)। এখন দেখার বিষয় নির্বাচন কমিশন নির্মোহভাবে তদন্ত করে সত্যিকারের দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি প্রদান এবং পুলিশের অসম আচরণের প্রতিকার করবে কিনা।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তফসিল ঘোষণার আগে সরকার অনেক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছে, যেসব ব্যক্তি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। তাই নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদেরকে বদলি করা আবশ্যক। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে আশা করি কমিশন এ ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেবে।

কমিশনের আরও কিছু বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রথম বিষয়টি হল গণমাধ্যমের জন্য প্রণীত আচরণবিধির পরিবর্তন। বর্তমান আচরণবিধি অনুযায়ী গণমাধ্যমের কর্মীরা সামান্য সময়ের জন্য নির্বাচনী কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, কিন্তু তারা কোনো ছবি তুলতে পারবেন না এবং নির্বাচনকালীন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু প্রকাশও করতে পারবেন না।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, গণমাধ্যম কর্মীরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করে না, বরং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা কমিশনের সহায়ক শক্তি। তারা নির্বাচনের দিনে কমিশনের চোখ-কান তথা পর্যবেক্ষক হতে পারে। তাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে গণমাধ্যম কর্মীদের আস্থায় নেয়া এবং তাদের নির্বাচন সম্পর্কিত রিপোর্টিংয়ের ওপর বাধানিষেধ অপসারণ আবশ্যক।

আরও আবশ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষদের আসার ও তাদের অবস্থানের সময়সীমা ও পর্যবেক্ষণের ওপর সব অযৌক্তিক বাধানিষেধের অবসান। এ ছাড়াও রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং একটি এক্সপার্ট প্যানেল দ্বারা নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়ন ছাড়া আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাও আবশ্যক।

কমিশন নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ সেনাবাহিনী ব্যারাকে থাকবে এবং রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে তলব করবে। এভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না, কারণ নির্বাচনে কারচুপি দ্রুত সংঘটিত হয় এবং তা প্রতিহত করার জন্য সেনাবাহিনীকে টহলে থাকতে হবে। তাই সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে না রেখে টহলে রাখার জন্য কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে।

শোনা যাচ্ছে যে, নির্বাচনের কয়েক দিন আগ থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হবে। একইভাবে নির্বাচনের দিনে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হবে। সম্প্রতি স্কাইপি বন্ধ করার মাধ্যমে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। আমরা কমিশনকে এসব সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করব।

আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হওয়া অতি জরুরি। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করার কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। এর পাশাপাশি আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে হলি আর্টিজানের জঘন্য আত্মঘাতী হত্যাকারীদের মতো বিপদগামী হয়ে যেতে পারে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এমন অবস্থা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।

তথ্যসূত্র: https://www.jugantor.com/todays-paper/first-page/114474/%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A7%81-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A4%E0%A6%BE?fbclid=IwAR1iUsx9r3TTGCBboASQMh1Wdwt2apyycss2ccj2wneR3K07z94__i4OG_0

1 comment: