Dec 1, 2018

এ যেন এক জন অসন্তুষ্টির বাজেট

গত ৭ জুন মাননীয় অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে  ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যার মধ্যে বাৎসরিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিবি বরাদ্ধের পরিমান হল এক লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা এবং অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় দুই লাখ ৫১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।বাজেটেপ্রক্কলিত রাজস্ব আদায় তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের আদায় দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা এবং এনবিআর বহির্ভূত আদায় ৮৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। আর বাজেট ঘাটতি পূরণের উৎস হবে: ব্যাংক থেকে ঋণ ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, বিদেশি ঋণ ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি অনুদান চার হাজার ৫১ কোটি টাকা।

জনগণের কল্যাণে এবং জনগণের স্বার্থেইবাজেট প্রণীত ও সংসদে পেশহবার কথা। জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনই এর লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। বাস্তবে কি তাই ঘটেছে?

জনগণের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষ। এছাড়াও জনগণের একটি অংশ ব্যবসায়ী। বাজেট তথা সরকার থেকে এদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা রয়েছে। আবার এদের প্রত্যাশার মধ্যে কিছু কিছু মিলও রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ব্যবসায়ীরা চায় তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা। একইসঙ্গে তারা চায় বিনিয়োগের জন্য ইনসেনটিভ বা উৎসাহ প্রদান এবং সহায়ক আইনি কাঠামো। আর বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা পক্ষান্তরে নির্ভর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। এসবের জন্যই অবশ্য প্রয়োজন কতগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান। শক্তিশালী এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকলেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদল নিশ্চিত হয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয় ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এক থা বলার অপেক্ষা রাখে না দলীয়করণের সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষুন্ন হয় এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা হ্রাস পায়।

পক্ষান্তরে জনগণের উচ্চ, মধ্য ও নিবিত্ত নির্বিশেষে -- প্রত্যাশা হল কর্মসংস্থান এবং সুযোগ, বিশেষত নি¤œ বিত্তদের জন্য সমসুযোগ। জনগণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ক্রিয়াশীল সাংবিধানিক, বিধিবদ্ধ ও রাষ্ট্র বহির্ভূত (যেমন, নাগরিক সমাজ) প্রতিষ্ঠান।প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও জনগণের, বিশেষত সচেতন জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রগতিশীল ব্যবসায়ীরাও অবশ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পক্ষে।

মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সম্প্রতি সংসদের উত্থাপিত বাজেট কি জনগণের এসব প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক হবে? স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, বাজেটের মাধ্যমে জনগণের সব প্রত্যাশা পূরণে আংশিক ভূমিকা রাখতে পারে মাত্র। এর জন্য আরও প্রয়োজন বিশেষত সরকারের পক্ষ থেকে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেগুলোর ওপর মূলত নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। দুর্ভাগ্যবশত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদল করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের কোনে লক্ষনই এখনও আমরা দেখতে পাই না।

বিনিয়োগের পরিবেশের কথায় আসা যাক। আমাদের আর্থিক খাতে আজ চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আমাদের শেয়ার বাজারে একাধিকবার লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এর পেছনের রাঘব-বোয়ালদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থাই সরকার নেয়নি।ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির মতে আমাদের ব্যাংকে ডাকাত পড়েছে। এ ডাকাতদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার যেন তাদেরকে সুরক্ষাই দিচ্ছে এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদেরকে উৎসাহিতও করছে। ব্যাংক খাতে তারুল্য সংকট ও ক্রমবর্ধমান ঋণ খেলাফির করণে সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে, যা অদূর ভবিষতে কমার কোনো লক্ষন দেখা যায় না।সম্প্রতি ব্যাংক মালিকগণ সুদের হার কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছে, তার যথার্থতা নিয়েও বিশেজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে চরম বিশৃঙ্খলা এবং এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব -- যেমন, ব্যাংকিং কমিশন গঠনের অঙ্গীকার থেকে সরে আসা Ñ সুস্থ বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্ঠিতে চরম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ব্যবসায়ীক সম্প্রদায়ের জন্য অস্বস্থি সৃষ্টি না করে পারে না।

এছাড়াও সরকার ব্যাংকিং খাতে আড়াই শতাংশ করের হার কমানোর প্রস্তাব করলেও, করপোরেট ট্যাক্স কমানোর কোনোরূপ উদ্যোগ বাজেটে নেই। ফলে আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগ যে জিডিপির ২৩ শতাংশের মধ্যে আটকা পড়ে গিয়েছে, যা থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা বর্তমানে দেখা যায় না। বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে অনিশ্চিয়তা দেখা যাচ্ছে তা বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচার আরও বৃদ্ধি করতে এবং বিনিয়োগ পরিন্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। আর বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে ব্যবসায়ী এবং কর্মসংস্থান প্রত্যাশী জনগণ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এর ফলে বর্তমানের কর্মসংস্থানহীন জিডিপি পরিস্থিতির কোনোরূপ ইতিবাচক পরিবর্তন হবে বলেও মনে হয় না।

সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশেজ্ঞদের নানা প্রশ্ন। প্রস্তাবিত বাজেটে দশটি মেগা প্রজেক্টের জন্য ৩২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ রাখা হয়েছে, যা এডিবির প্রায় ১৮ শতাংশ। বর্তমান সরকার অবকাঠমো খাতে এসব মেগা প্রজেক্টগুলোকেই তাদের উন্নয়নের সাফল্য হিসেবে প্রচার করে আসছে। তবে উন্নয়ন মানে মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন -- তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পয়নিষ্কাশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবর্তন, আর অবকাঠামোর উন্নয়ন এর সহায়কমাত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অবকাঠামো খাতে বিরাট পরিমানের বিনিয়োগের প্রস্তাব করাহলেও, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মত সামাজিক খাতে আমাদের বিনিয়োগ মোট বাজেটের শতাংশ হিসেবে ক্রমাগতভাবে কমছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০-১১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজটে শিক্ষাখাতের বরাদ্ধ যেখানে ছিল ১৪.৩ শতাংশ, তা বিদায়ী অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে মোট বরাদ্ধের ১২.৬ শতাংশ এবং আগত অর্থবছরে ১১.৪১ শতাংশ। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে গত অর্থবছরের মোট বরাদ্ধের ৫.৩৯ শতাংশের তূলনায় বর্তমান বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশে। তাই বর্তমান বাজেট নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের কল্যাণের অনুকূলে নয়।

এছাড়াও মেগা প্রজেক্টেগুলোর প্রক্কলিত ব্যয় দিন বেড়েই যাচ্ছে। যেমন, পদ্মা সেতুর জন্য আরও এক হাজার ৪০০ কোটি অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তার সম্প্রতি একনেকে পাশ হয়েছে। তাই অনেকের মতে এসব মেগা প্রজেক্ট স্বার্থন্মেষীদেরকে মেগা ফায়দা প্রদান তথা মেগা দুর্নীতির সুযোগ করে দিচ্ছে। উপরন্তু এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি বা যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আরও প্রশ্ন রয়েছে প্রকৃতিক পরিবেশের ওপর এগুলোর প্রভাব নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, কয়লাভিত্তিক রামপালের মত বিদ্যুৎ প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দেশের মাঝখানে স্থাপিত রূপপুর পরমানবিক বিদুৎ কেন্দ্রআমাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। 

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সরকারও খুব একটা স্বস্থিতে আছে বলে মনে হয় না। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের হার ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজট বাস্তবায়নের হার ৯৩ শতাংশ হলেও গত অর্থবছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশে, যা সরকারের দক্ষতা ও সক্ষমতা হ্রাসেরই লক্ষ। আর এর ফলে বাজেটের, বিশেষত উন্নয়ন বাজেটের আকার প্রক্কলনের তূলনায় ছোট হয়েছে, সার্বিক অর্থনীতির ওপর যার প্রভাব নিঃসন্দেহে নেতিবাচক।

আরেকটি কারণেও সরকার অস্বস্থিতে আছে। বিদায়ী অর্থবছরে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা ধরা হলেও, তা সংশোধন করে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটিতে আনা হয়। কিন্তু গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মূল লক্ষ্যমাত্রার ৭২ ও সংশোধিত লক্ষমাত্রার ৮০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে, যার ফলে এনবিআরকে অর্থ বছরের শেষমাসে ৪৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে হবে।এমনি প্রেক্ষাপটে গত অর্থবছরের তূলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের আকাঙ্খা নিয়ে বর্তমান বছরের জন্য মোট দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিরাট লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের মধ্যে অস্বস্থি থাকাই স্বাভাবিক।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়ে সরকার নিঃসন্দেহে অস্বস্থিতে আছে। ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগ নিয়ে খ্বু একটা স্বস্থিকর পরিস্থিতিতে নেই। এ অস্বস্থি আরও প্রকট হতে পারে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসলে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এবং এর পরিণতিতে কিছু ব্যাংকের দেওলিয়া হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে। সাধারণ জনগণ, বিশেষত তরুণরা বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনোরূপ জোরপ্রচেষ্টা না থাকায় উদ্বিঘ্ন না হয়ে পারে না। এছাড়াও কর প্রদানের সীমা আড়াই লাখ থেকে না বাড়িয়ে সরকার নি¤œ/মধ্যবিত্তের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টির কারণ হয়েছে।আর সবাই চিন্তিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আগামী নির্বাচন নিয়ে। তাই মনে হয় যেন ২০১৮-১৯ সালের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট সবার অস্বস্তিরই কারণ।

তথ্যসূত্র: আমাদের সময়, ২৬ জুন ২০১৮

No comments:

Post a Comment