Jun 21, 2018

তা হলে বুলেটেই মূলত ভরসা!

মাদক বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর ব্যবহার বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে, বিশেষত আমাদের তরুণদের মধ্যে। এর চোরাচালান একটি বিরাট ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। অনেকে এটিকে জীবন-জীবিকার উৎস হিসেবেও নিয়ে নিয়েছে। ফলে মাদক সমস্যার সমাধান আজ আমাদের জন্য অতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’কে আমরা নীতিগতভাবে সাধুবাদ জানাই। তবে এ যুদ্ধে বুলেটকেই মূলত ভরসা করার আমরা তীব্র বিরোধিতা করি।

যে কোনো রোগের চিকিৎসা করতে হলে রোগের কারণ চিহ্নিত করতে হয়। মাদকের ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে হলেও আমাদের এর পেছনের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। তা না হলে আমরা রোগের পরিবর্তে রোগের উপসর্গ নিয়েই নিজেদের ব্যস্ত রাখব।


মাদক সমস্যার দুটি দিক রয়েছে : সরবরাহ ও চাহিদা। মাদকের সরবরাহ আসে মূলত দেশের বাইরে থেকে। অতীতে আমাদের প্রধান সমস্যা ছিল ফেনসিডিল, যার সরবরাহের উৎস ছিল প্রতিবেশী ভারত। বর্তমানে আমাদের মূল সমস্যা হলো ইয়াবা, যা আসে মূলত মিয়ানমার থেকে। অনেককেই বলতে শোনা যায়, মিয়ানমার শুধু আমাদের দেশে দুর্ভাগা রোহিঙ্গাদেরই পাঠায়নি, তারা একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণে ইয়াবাও পাঠিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত অনেক রোহিঙ্গা এর বাহকে পরিণত হয়েছে।

শোনা যায়, আমাদের দেশের অভ্যন্তরেও ইয়াবা উৎপাদন হয়। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত ইয়াবা অনেক ক্ষেত্রে নকল। কয়েক সপ্তাহ আগে আমাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা একবার অনেকগুলো জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য এক সময়ে ব্যবহৃত ‘মায়া বড়ি’র চালান উদ্ধার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানতে পারেন যে, মায়া বড়ির ওপরে লাল রঙ লাগিয়ে এগুলোকে ইয়াবায় পরিণত করাই ছিল চালানের উদ্দেশ্য।
ইয়াবা মিয়ানমার থেকে এনে তা স্থানীয় বিতরণকারীদের মাধ্যমে সারাদেশে সেবনকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। মিয়ানমার থেকে বড় চালানের ইয়াবা আনার কাজে বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী তথা রাঘববোয়ালরা জড়িত। এদের সহায়তা করে কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিশেষত যারা আমাদের সীমান্ত রক্ষায় জড়িত।
সারাদেশে মাদকদ্রব্য বিতরণের ক্ষেত্রেও কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য জড়িত। বস্তুত স্থানীয়ভাবে তাদের নিয়মিত মাসোয়ারা না দিলে মাদকের ব্যবসা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। বস্তুত মাদক শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের জন্যই নয়, একদল অসৎ কর্মকর্তার জন্য একটি লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। অনেক রাজনীতিবিদও এখন এ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। এসব গর্হিত কাজের জন্য কঠোর শাস্তির অভাবেই অনেক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ এতে জড়িত হয়ে পড়েছেন।

মাদক মামলার শাস্তির হারও কম। সমকাল-এর (২ জুন ২০১৮) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘২০১১-২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে মাদকদ্রব্য নিযন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০ হাজার ৩৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি করেন দেশের বিভিন্ন আদালত। এসব মামলার আসামি ছিল ২২ হাজার ৩৫১ জন। এর মধ্যে সাজা হয়েছে ১০ হাজার ৭১৭ জনের। ৯ হাজার ৯৫২টি মামলায় ১১ হাজার ৬৩৪ জন আসামি খালাস পেয়েছে, যা মোট মামলার ৫২ ভাগ আসামি। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকার আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া ৩২৪টি মামলার মধ্যে ১৯৯টির ২২২ আসামি খালাস পেয়েছে।’ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্যায় করে পার পেয়ে গেলে অন্যায় কাজ উৎসাহিতই হয়।

বর্তমান মাদকবিরোধী অভিযানের মূল হাতিয়ার হল ক্রসফায়ার। মনে হয় যেন এ অভিযানে বুলেটের ওপরই মূল ভরসা করা হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে পরিচালিত অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩০ জনের মতো ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, এদের প্রায় সবাই চুনোপুঁটি। আবার কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের মতো নিহতদের মধ্যে কেউ কেউ সম্পূর্ণ নিরপরাধ। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের প্রাণহানি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত গডফাদাররা অধরাই রয়ে গেছে। দি ডেইলি স্টার-এর (জুন ৩, ২০১৮) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেকনাফ থেকে নির্বাচিত এমপি আবদুর রহমান বদি সৌদি আরব গিয়েছেন, তার চাচাতো/মামাতো ভাই মঙ মঙ সেন গিয়েছেন মিয়ানমার এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের, যাদের নাম বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় ইয়াবা গডফাদার হিসেবে রয়েছে, তারা টেকনাফ ছেড়েছেন।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে যারা মাদক ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগও বর্তমান অভিযানে পরিলক্ষিত হয়নি। লক্ষ করা যায়নি মামলায় দুর্বলতা রোধের কোনো উদ্যোগ। তাই গডফাদারকে অধরা রেখে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান না চালিয়ে এবং মাদক মামলায় শাস্তি প্রাপ্তির হার বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানের সফলতা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে।

অতীতের বুলেটেই ভরসা করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানও সফল হয়নি। অনেকেরই গত বিএনপি সরকারের আমলের ‘অপারেশন ক্লিনহার্টে’র কথা মনে আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী সেই অভিযানে বিচারবহির্ভূতভাবে কথিত ৬০ জন ‘সন্ত্রাসী’কে হত্যা করা হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়নি। বরং সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের আগ্রাসন আমাদের দেশে ক্রমাগতভাবে বেড়েছেই। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৩০ জনের মতো নিহত হওয়া ছাড়াও বর্তমান মাদকবিরোধী অভিযানে দশ হাজারের বেশি ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে। শোনা যায়, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যেও রাঘববোয়ালরা নেই। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, এ বিরাটসংখ্যক ব্যক্তির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসৎ কর্মকর্তাদের জন্য গ্রেপ্তার বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

মাদক সমস্যার অন্যতম দিক হলো এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা। মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর চাহিদা দূর করতে না পারলে মাদক সমস্যার সমাধান অসম্ভব। বস্তুত মাদকের চাহিদা যতদিন থাকবে, কোনো না কোনোভাবে সরবরাহ সৃষ্টি আসবেই- চাহিদাই সরবরাহ সৃষ্টি করবে। উচ্চ হারে লাভ করার সুযোগ থাকলে, মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে মাদক সরবরাহ করবে। তাই মাদকবিরোধী যুদ্ধে সফল হতে হলে চাহিদা দূর করার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। তা না হলে মাদক সমস্যার উপসর্গ নিয়েই আমরা নিজেদের ব্যস্ত রাখব। এ ক্ষেত্রে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন হবে। এ কাজে বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিশেষে চলমান মাদকবিরোধী অভিযান এবং এর মাধ্যমে প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের প্রভাব আমাদের রাজনীতির ওপর পড়তে বাধ্য। জাতি হিসেবে আমরা বর্তমানে নির্বাচনী হাইওয়েতে। কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছাড়াও চলতি বছরের শেষদিকে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ক্রসফায়ার ও গ্রেপ্তার বেশিদিন অব্যাহত থাকলে তা জাতীয় নির্বাচনের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে অনেকের আশঙ্কা।

তথ্যসূত্র: আমাদের সময়, ০৫ জুন ২০১৮

1 comment:

  1. প্রকৃত কারণ জানলেও বলতে পারিনা। ৮০ ভাগ মানুষকে অশিক্ষিত রেখে ২০ ভাগ মধ্যবিত্ত রাজত্ব করলে আর কি হবে?

    ReplyDelete