Mar 26, 2018

রংপুর সিটি নির্বাচন: কেমন প্রার্থী পেলাম?

২১ ডিসেম্বর ২০১৭ রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ আসন থেকে কাউন্সিলর পদে ২১২ জন, সংরক্ষিত আসন থেকে একজন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীসহ ৬৫ জন এবং সর্বমোট ২৮৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসন্ন এই নির্বাচনে আমরা কেমন প্রার্থী পেলাম?

বরাবরের মতো প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার বিবরণী, আয়ের উৎস, সম্পদের বিবরণী, দায়দেনা এবং করসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে তূলনামূলক চিত্র তৈরি করে আমরা সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের উদ্যোগে ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করেছি। 

প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, তিন হেভিওয়েট প্রার্থীই-বিএনপি মনোনীত মো. কাওছার জামান, জাতীয় পার্টি মনোনীত মো. মোস্তাফিজার রহমান এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত সরফুদ্দীন আহম্মেদ-স্নাতক পাস। তবে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে ২৮৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬৭ জনের (৫৮ দশমিক ৮০ শতাংশ) শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে।
সাতজন মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই ব্যবসায়ী। সরফুদ্দীন আহম্মেদের পেশা ‘রাজনীতি’। জাসদ মনোনীত প্রার্থী আবদুল কুদ্দুস পেশার ঘর খালি রেখেছেন। তিনটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবসায়ী।
মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে অতীতে মামলা ছিল চারজনের বিরুদ্ধে, যার মধ্যে তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত, যদিও তাঁদের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। ২১২ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর মধ্যে ৫২ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অতীতে এবং ১৭ জনের বিরুদ্ধে উভয় সময়ে মামলা ছিল বা আছে। ৩০২ ধারায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে বর্তমানে খুনের মামলা রয়েছে এবং চারজনের বিরুদ্ধে অতীতে ছিল।
সাতজন মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে দুজনের আয় বছরে ৫ লাখ টাকার নিচে, তিনজনের আয় বছরে ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে এবং একজনের আয় ২৫ লাখ টাকার অধিক। মো. আবদুল কুদ্দুছ কোনো আয় দেখাননি। বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮০ টাকা আয় করেন বিদায়ী মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা মো. কাওছার জামান এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ১০ লাখ ১২ হজার ২৭২ টাকা মো. মোস্তাফিজার রহমান। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর প্রায় ৯০ শতাংশই স্বল্প (৫ লাখ টাকার নিচে) আয়সম্পন্ন। 
মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ সরফুদ্দীন আহম্মেদের (১ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ১১৮ টাকা) এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন মো. কাওছার জামান (১ কোটি ৫২ লাখ টাকা)। মো. মোস্তাফিজার রহমানের সম্পদের মূল্য মাত্র ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তবে মোট ২৮৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৩০ জনই ৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক, যার সঠিকতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। 
মেয়র পদপ্রার্থীর মধ্যে করের আওতায় পড়েছেন চারজন। সর্বশেষ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৪৬ টাকা কর দিয়েছেন সরফুদ্দীন আহম্মেদ; দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৮৭৫ টাকা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ২৯৫ টাকা মো. মোস্তাফিজার রহমান। অপর প্রার্থী মো. কাওছার জামান ৫ হাজার টাকা কর প্রদান করেছেন। অন্যদিকে ২১২ জন সাধারণ
ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর মধ্যে ১২৫ জন আয়কর প্রদানকারী। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বমোট ২৮৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১৬৫ জন কর প্রদানকারী 
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী পাঁচজন মেয়র পদপ্রার্থী মো. আবদুল কুদ্দুছ, এ টি এম গোলাম মোস্তফা (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী), মো. কাওছার জামান, মো. মোস্তাফিজার রহমান ও সরফুদ্দীন আহম্মেদ ২০১২ সালের নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এই পাঁচজন মেয়র পদপ্রার্থীর দুই নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামার তুলনা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করা যায়। 
দুই হলফনামার তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ২০১২ ও ২০১৭ সালে এ টি এম গোলাম মোস্তফার আয় একই রয়েছে। তবে মো. কাওছার জামানের আয় ১৪৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং বিদায়ী মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদের আয় ৮০৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যে হার সর্বাধিক। ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে মো. মোস্তাফিজার রহমানের বার্ষিক আয় ৭০ দশমিক ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। 
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে মো. আবদুল কুদ্দুছের সম্পদের পরিমাণ ২৯৩০ শতাংশ (৫ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা), মো. কাওছার জামানের ১৯৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, মো. মোস্তাফিজার রহমানের ১০ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং সরফুদ্দীন আহম্মেদের ৬৭৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্পদ বৃদ্ধির এই হার মো. আবদুল কুদ্দুছের সবচেয়ে বেশি (২৯৩০ শতাংশ) হলেও, টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে মো. কাওছার জামানের (১ কোটি ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৯ টাকা)। সরফুদ্দীন আহেম্মেদেরও সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৮০ হাজার১১৮ টাকা। এ টি এম গোলাম মোস্তফার সম্পদ ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। 
আয়কর বিবরণীতে মেয়র পদপ্রার্থীরা ২০১৭ সালের জন্য বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন: মো. আবদুল কুদ্দুস ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, এ টি এম গোলাম মোস্তফা ৮০ হাজার টাকা, মো. কাউসার জামান ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯৮ টাকা, মো. মোস্তাফিজার রহমান ২ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫ টাকা এবং সরফুদ্দীন আহম্মদ ৪ লাখ টাকা। এসব তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। 
আইনি বিধান অনুযায়ী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। তথ্য গোপন করে বা ভুল তথ্য দিয়ে নির্বাচিত হলে নির্বাচন বাতিল হতে পারে। আর এসব তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে প্রার্থী হলফনামায় তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে ভোটার বিভ্রান্ত হন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, যা আইনি বিধানের উদ্দেশ্যকেই ভন্ডুল করে। তাই হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে এর সঠিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। 
আশা করি, কমিশন ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পিছপা হবে না। এ ছাড়া অনেক প্রার্থী আয়কর বিবরণীর পরিবর্তে শুধু আয়কর সনদ জমা দেন এবং অনেকে হলফনামার ঘর খালি রেখে দেন, যা তথ্য গোপনের শামিল। আশা করি কমিশন ভবিষ্যতে এদিকেও নজর দেবে। 
প্রসঙ্গত, আমরা সুজন, পিস প্রেশার গ্রুপ এবং পিস অ্যাম্বাসেডরের উদ্যোগে রংপুরে মেয়র পদপ্রার্থীদের এবং অন্য ১৫টি নির্বাচনী এলাকার কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নিয়ে ‘ভোটারদের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি, যেখানে হাজার হাজার ভোটার অংশ নিয়েছেন। এসব অনুষ্ঠানে প্রার্থীরাও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করতে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন এবং উপস্থিত ভোটাররাও সৎ, যোগ্য এবং সহিংসতায় লিপ্ত নন এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার শপথ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া আমাদের একটি সাংস্কৃতিক দল পিকআপে করে নগরের আনাচে-কানাচে ভোটারদের সচেতন করছে। সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেও (facebook.com/ shujan.bd) কাজটি করা হচ্ছে। আশা করি, রংপুরের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে এবং ভোটাররা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২১ ডিসেম্বর সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭

No comments:

Post a Comment