Mar 26, 2018

স্বাধীনতার মাস: আমরা তোমাদের ভুলিনি

২৬ মার্চ, আমাদের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে অগণিত নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষকে হানাদার পাকিস্তানিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে, যার থেকে সূচনা হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের, যে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। প্রতিবারের মতো এবারও দিনটি আমরা উদ্যাপন করব নানা আয়োজন-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। বস্তুত, আজ পুরো বিষয়টিই যেন নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। অনেকে দিনটির মর্মার্থ যেন ভুলে গেছেন। ভুলে গেছেন কেন বা কী উদ্দেশ্যে মানুষ নিঃসংকোচে প্রাণ দিয়েছিল।

প্রবল জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের প্রায় নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত এক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে, যে স্বপ্ন আমাদের সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সেই স্বপ্ন হলো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, যাতে ‘সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার’-এর নিশ্চয়তা থাকে।



এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে অনেকেই করেছে চরম আত্মত্যাগ, যাদের কথা স্মৃতির পর্দায় মূর্তমান। মনে পড়ে এ টি এম জাফর আলমের কথা। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে চিশতী হেলালুর রহমানের ছবি। আরও মনে পড়ে শামসুল আলম চৌধুরীর কথা। জাফর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানের ছাত্র। চিশতী পড়ত সাংবাদিকতা বিভাগে। শামসু ছিল চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র। জাফর ও চিশতী মারা যায় ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সময় পুরোনো রাইফেল নিয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে। আর শামসু মারা যায় ১০ ডিসেম্বর রাউজানের গহিরায় হানাদারদের সঙ্গে একটি সম্মুখযুদ্ধে।

জাফর আর চিশতী থাকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে। তারা ছিল আমার অনুজ সমতুল্য এবং অতি ঘনিষ্ঠ। ১৯৬৭-৬৮ সালে প্রথমবারের মতো ইকবাল হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের পুরো প্যানেল জয়ী হয়। সেই প্যানেলে আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক, জাফর ছিল সাহিত্য সম্পাদক। আর চিশতী ছিল পাঠাগার সম্পাদক। তাদের কঠোর প্রচেষ্টার ফলেই আমাদের পুরো প্যানেল জয়ী হয়েছিল। সেই প্যানেলে ডাকসুর প্রতিনিধি হিসেবে আরও ছিলেন আমাদের বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, যিনি পরবর্তী সময়ে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ছয় দফা ও এগারো দফা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ইকবাল হল এবং আমরা ছিলাম সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে।

শহীদ জাফর ও চিশতীকে নিয়ে আমার বহু স্মৃতি আছে। জাফর ছিল অত্যন্ত সাহসী ও দৃঢ়চেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরে ভীষণ আঘাত পেয়ে অনেক দিন হাসপাতালে কাটায়। পিএসসি পরীক্ষায় পাস করে এসডিও হিসেবে নিয়োগ পেলেও সে চাকরিতে যোগ না দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পাকিস্তানিদের রুখতেই নিজেকে নিবেদিত রাখে। আরও মনে পড়ে, সে একটি মেয়েকে ভালোবাসত। জানি না, তার অকালমৃত্যুর পর মেয়েটির কী হয়েছিল।

জাফরকে নিয়ে আরেকটি স্মৃতি, যা ভোলার নয়। তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্রনেতা রেজা আমাদের হলে এসে আস্তানা গাড়ে এবং অনেক ধরনের বাড়াবাড়ি শুরু করে। সে ক্যাফেটেরিয়া ও ডাইনিং হলে বিনা পয়সায় জবরদস্তি করে খেত, কিন্তু পয়সা দিত না। জাফর ও আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হই এবং শেষ পর্যন্ত আমরা তাকে হল থেকে বিতাড়িত করি। পরে অবশ্য রেজা ঢাকা হলে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং আইউব-মোনায়েমের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ‘এনএসএফে’ যোগ দেয়।

জাফরের বাড়ি ছিল কক্সবাজারের উখিয়ায়। সে ছিল পিতৃহীন নয় ভাইবোনের পরিবারের বড় ছেলে। তার অকালমৃত্যুতে পুরো পরিবার ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়ে। তবে মেধা, সততা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে তার কয়েক ভাই সেই সংকট কাটিয়ে উঠে সফল হতে পেরেছে। তারই ছোট ভাই এখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। 
চিশতী হেলালুর রহমান ছিল একজন আমুদে ধরনের ছেলে। আমার মনে পড়ে, নির্বাচনের আগে আমাদের মিছিল করার সময় সে একধরনের অস্বাভাবিক কাজ করত। সে পেট্রল মুখে নিয়ে মশালের মধ্যে ফুঁ দিয়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বালিয়ে দিত। কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও এতে অনেকেই মজা পেত। লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগেই চিশতী তখনকার দৈনিক আজাদ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করে। পরে সে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক হয়।

শহীদ শামসু ছিল সম্পর্কে আমার ফুফাতো ভাই ও সহপাঠী। সে ছিল পরিবারের বড় ছেলে। আমার ফুফা একটি বিদেশি কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি করতেন। শামসুরা থাকত চট্টগ্রামে। আমি থাকতাম গ্রামে। সে যখন মাঝে মাঝে গ্রামে আসত, তখন আমরা একত্রে সময় কাটাতাম। খেলাধুলা করতাম। শামসুর ছিল একটি সচ্ছল সুখের পরিবার। কিন্তু তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার তছনছ হয়ে যায়। চট্টগ্রামে তাদের বাড়ি একাধিকবার লুট হয় এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তার ছোট ভাইকে কুখ্যাত ডালিম হোটেলে রেখে দুই সপ্তাহ ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ছেলেহারা আমার ফুফু প্রায় পাগলের মতো হয়ে যান। তাঁর পরিবারও হয় আগ্রাসনের শিকার। এমনকি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে তাদের চট্টগ্রামে প্রাপ্ত প্লট কারসাজির মাধ্যমে দখলের চেষ্টাও হয়। তবু তার এক মেধাবী ছোট ভাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েছিল।

জাফর, চিশতী আর শামসুর মতো অগণিত মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের কারণে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু ৪৭ বছর ধরে যাঁরা বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় ছিলেন এবং আছেন, তাঁরা কে সেই বীর সেনানীদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ও মর্মার্থ অনুধাবন করতে পেরেছেন? তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়েছেন? নাকি বিভক্তির রাজনীতির মাধ্যমে তাঁরা আমাদের একটি বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করেছেন?

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে ‘ডেমোক্রেটিক ডিসিসির’ বা গণতন্ত্রের ঘাটতির কোনো অবকাশ নেই। অবকাশ নেই ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের; রাজনীতিকে ব্যবসায়ে পরিণত করার রাজনীতিতে হানাহানি; মারামারি ও সহিংসতার; উগ্রবাদের পৃষ্ঠপোষকতার। অবকাশ নেই সংখ্যালঘুদের প্রতি বিরূপ আচরণের; নাগরিকের অধিকার সংকোচনের; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার। অবকাশ নেই দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটের; গুম-অপহরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের। অবকাশ নেই ‘কালচার অব ইম্পিউনিটি’ বা অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়া সংস্কৃতির। কিন্তু বিরাজমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখতে পাই এসব অনাচারই সর্বত্র জেঁকে বসেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব শহীদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে চলে গেছেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষ, নতুন প্রজন্মের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের ভোলেনি; ভোলেনি তাঁদের চরম ত্যাগের কথা। তারা এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। তাদেরই একজন ছিল আমার প্রিয় সহকর্মী সানজিদা হক বিপাশা, যে আমাদের সঙ্গে ১৩ বছর ধরে ছায়ার মতো ছিল। স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সম্প্রতি নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে বিপাশা। যে আমৃত্যু ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর সমন্বয়কারী হিসেবে কার্যকর গণতন্ত্র, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেছে। এটিই ছিল তার জীবনের ব্রত এবং এ কাজকে ঘিরেই তার জীবন আবর্তিত হয়েছিল। বস্তুত আমার কন্যাতুল্য ৩৭ বছরের এই মেয়েটি যেন ছিল মুক্তিযোদ্ধাদেরই নতুন প্রজন্ম-মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করতেই যেন তার জন্ম হয়েছিল এবং সে কাজেই ছিল সার্বক্ষণিকভাবে নিবেদিত।

আমাদের রাজনীতিবিদেরা ভুলে গেলেও বিপাশার মতো আরও অনেকে এখনো আছে, যাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন আজও অম্লান।

শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা এখনো অকুতোভয়। তাদের প্রতি, বিশেষত বিপাশার মতো প্রয়াতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কি এগিয়ে আসবেন একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে? একটি গণতান্ত্রিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত ও সুশাসন কায়েম করতে?

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২৫ মার্চ ২০১৮

No comments:

Post a Comment