Mar 26, 2018

রংপুর সিটি নির্বাচন কী বার্তা দিল

রংপুর সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সাইকেল শুরু হলো, যা শেষ হবে আগামী বছরের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয়ে গেলে মাঝখানে ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচনসহ আরও ছয়টি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই চলমান নির্বাচনী সাইকেলের সূচনা করার এবং প্রথমবারের মতো মেয়র পদে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে রংপুর সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কেমন হলো রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন? এই নির্বাচন কী বার্তা বহন করে আনল আমাদের রাজনীতির জন্য? এর প্রভাবই বা কী হবে আগামী নির্বাচনগুলোর ওপর?


সব পর্যবেক্ষকের মতেই রংপুরে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তার সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পেরেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন তথা সরকার দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও সদাচরণ করেছে।

একই সঙ্গে এই নির্বাচনে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ ব্যাপক সক্রিয়তা প্রদর্শন করেছে। যেমন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও পিস অ্যাম্বাসেডরদের উদ্যোগে রংপুরে মেয়র পদপ্রার্থীদের এবং অন্য ১৫টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নিয়ে ‘ভোটার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার ভোটার অংশ নিয়েছেন। এসব অনুষ্ঠানে হলফনামায় প্রদত্ত প্রার্থীদের শিক্ষা, পেশা, আয়, সম্পদ, দায়দেনা, মামলা, আয়কর ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্যের তুলনামূলক চিত্র তৈরি করে বিতরণ করা হয়, যাতে ভোটাররা তথ্যের দ্বারা ক্ষমতায়িত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এসব অনুষ্ঠানে প্রার্থীরা নির্বাচনে কারচুপি, টাকার খেলা এবং পেশিশক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার লিখিতভাবে করেন। পাশাপাশি উপস্থিত ভোটাররাও সৎ, যোগ্য, জনকল্যাণে নিবেদিত এবং সহিংসতায় লিপ্ত নন, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার শপথ গ্রহণ করেন। এ ছাড়া সুজনের একটি স্বেচ্ছাব্রতী সাংস্কৃতিক দল নগরের আনাচে-কানাচে ভোটারদের সচেতন করে। এই নির্বাচনে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেও (facebook.com/shujan.bd) ভোটারদের মধ্যে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা হয়। আর নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ইতিবাচক ভূমিকার সুফলই আমরা পেয়েছি রংপুর সিটি নির্বাচনে।

নিঃসন্দেহে রংপুর সিটি নির্বাচন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। রংপুরের গত দুটি সিটি নির্বাচনই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দুটি নির্বাচনে তিনটি প্রধান দলই—আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি অংশ নিয়েছিল। দলগুলোর প্রতিটির বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীও ছিলেন একই ব্যক্তি। ২০১২-এর সঙ্গে ২০১৭ সালের নির্বাচনের একমাত্র পার্থক্য হলো দলীয় প্রতীকের ব্যবহার। অর্থাৎ একই এলাকায়, একই প্রার্থী এবং একই দলের মধ্যকার নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল দলীয় প্রতীকের ব্যবহার। তিনটি ক্ষেত্রে—স্থান, প্রার্থী ও দলের—অভিন্নতার কারণে রংপুরের নির্বাচন ছিল মূলত তিনটি মার্কার মধ্যে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। ২০১২ ও ২০১৭ সালের উভয় নির্বাচনের ফলাফল থেকেই দেখা যায় যে রংপুরে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। ২০১২ সালে জাতীয় পার্টির দুজন প্রার্থী—মোস্তাফিজার রহমান ও আবদুর রউফের সম্মিলিত ভোট ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩টি, যা ছিল তখনকার বিজয়ী মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদের পাওয়া ভোট থেকে ৮ হাজার ৭৫৮টি বেশি। এবার জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট, যা সরফুদ্দীন আহমেদ থেকে ৯৮ হাজার ৮৯ ভোট বেশি। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই জাতীয় পার্টির জনসমর্থন সর্বাধিক। তাই এবারের নির্বাচনে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা হয়েছিল মূলত নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের মধ্যে।

এই প্রতিযোগিতায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও বিদায়ী মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদ ২০১২ সালে ১ লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট পেলেও ২০১৭ সালে তা নেমে এসেছে ৬২ হাজার ৪০০–তে। অর্থাৎ নৌকা প্রতীকের ভোট কমেছে ৪১ শতাংশ, যদিও গত পঁাচ বছরে রংপুর সিটি করপোরেশনে ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ ছাড়া রংপুরে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার, যা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কাওছার জামান ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৩৫ ভোট পেলেও এবার পেয়েছেন ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট। অর্থাৎ ধানের শীষ প্রতীকের ভোট বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, নবনির্বাচিত মেয়র মোস্তাফিজার রহমান ২০১২ সালে পেয়েছিলেন ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। এবার পেয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯, যা গতবারের চেয়ে ১০৬ শতাংশ বেশি।

প্রসঙ্গত, রংপুরে বিএনপির অবস্থান বরাবরই ছিল দুর্বল। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর শহর নিয়ে গঠিত সদর রংপুর-৩ আসনে ধানের শীষের ভোটপ্রাপ্তির হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৮ সালে তা এসে দঁাড়ায় ৭ দশমিক ২৪ শতাংশে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরফুদ্দীন আহমেদের পরাজয় এবং মোট ভোটার ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘু ভোট প্রায় ৩০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও নৌকা প্রতীকের ৪১ শতাংশ ভোট হ্রাস আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় বিপর্যয় 
বলা চলে। এই বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডলের দাবি অনুযায়ী, সরফুদ্দীন আহমেদ যে ভোট পেয়েছেন, সেটা আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। সাধারণ মানুষের ভোট তিনি পাননি (প্রথম আলো, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭)।

সুশাসন বিবর্জিত এবং ফায়দাতন্ত্রভিত্তিক উন্নয়নের রাজনীতিতে বিভোর আওয়ামী লীগের জন্য রংপুর মহানগরের নির্বাচনী ফলাফল তাই একটি অতি ভয়াবহ বার্তা তথা অশনিসংকেত বহন করে আনছে বলেই অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা। বস্তুত মনে হয়, যেন রংপুর সিটির ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়েছেন।

রংপুরের আরেকটি উপেক্ষিত বার্তা হলো যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী এ টি এম গোলাম মোস্তফা ২০১২ সালে ১৫ হাজার ৬৮১ ভোট পেলেও এবার পেয়েছেন ২৪ হাজার ৬ ভোট। অর্থাৎ ধর্মাশ্রয়ী দলটির ভোট বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক।

রংপুর সিটির সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন কি আগামী নির্বাচনগুলোর সঠিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয়? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। অনেকেরই স্মরণ আছে, ২০১৪ সালের একতরফা ও চরম বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে, ২০১৩ সালে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই পঁাচটি নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়েছিল রকিবউদ্দীন কমিশনের অধীনে গ্রহণযোগ্যভাবে এবং এর সব কটিতেই বিএনপি ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল। তা সত্ত্বেও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ছিল একটি অতি লজ্জাকর অভিজ্ঞতা। তাই রংপুরের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই আগামী নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না।

প্রসংগত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না, যদিও এর জন্য কমিশনের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এর জন্য আরও প্রয়োজন সরকার তথা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা।

বস্তুত, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য হলেও যথেষ্ট নয়। এর জন্য আরও প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট অন্য সবার সদিচ্ছা ও অবদান। তাই রংপুরের নির্বাচন মানুষের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করলেও তা থেকে আগামী নির্বাচনগুলো কেমন হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তবে রংপুরের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে, বিশেষত সংসদ নির্বাচনে—যে নির্বাচনের সঙ্গে ক্ষমতার বদল জড়িত—সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক দলীয়করণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭

No comments:

Post a Comment