Mar 26, 2018

এসডিজি: কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা দরকার

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করেছে মূলত মানুষের সৃজনশীল উদ্যোগ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে। স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত উপায়ে ও স্বল্প খরচে অনেকগুলো সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এতে সহায়তা করেছে। এতে সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

কিন্তু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) তুলনামূলকভাবে উচ্চাভিলাষী এবং এর অর্জন হবে অনেক দুরূহ কাজ। উপরন্তু বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সংঘাতময় রাজনীতি ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতাসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই গতানুগতিক পদ্ধতিতে এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে না।


 এসডিজির স্থানীয়করণে স্থানীয় সরকার

যদিও এসডিজি প্রণীত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, তবু এর অভীষ্টগুলো অর্জিত হতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে, স্থানীয় জনগণ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের সচেষ্ট ও কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে। প্রসঙ্গত, আমাদের সংবিধানে [অনুচ্ছেদ ৫৯ (২) (গ)] জনকল্যাণমূলক সরকারি সেবা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সম্পর্কিত সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকারকে, বিশেষত জনগণের দোরগোড়ার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদকে।

এসডিজির অন্তত ১২টি অভীষ্টই অর্জিত হতে হবে স্থানীয়ভাবে এবং সমন্বিত উদ্যোগে। স্থানীয় সরকারের মালিকানায় ও নেতৃত্বে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে। তাই বাংলাদেশকে এসডিজি অর্জন করতে হলে এর স্থানীয়করণের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন হবে একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর কর্মসূচি, যাতে সাংবিধানিক নির্দেশনা কার্যকর হয়, জনগণ তাদের প্রাপ্য সব সেবা সহজে পায়। এ জন্য আরও প্রয়োজন হবে তৃণমূলের নাগরিক সমাজের সহায়তায় অধিক ও মানসম্মত সেবা পাওয়ার লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত ও সোচ্চার করা। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার, যাতে তারা এসডিজির অভীষ্টসমূহ অর্জনের লক্ষ্যে  স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ করতে পারে।

 অভীষ্ট ১৬-এর আলোকে এসডিজি অর্জন

‘অভীষ্ট ১৬’ এসডিজির শিরোমণি, এর আলোকে অন্য অভীষ্টগুলো অর্জন করতে হবে। এসডিজির অভীষ্ট ১৬-এর বক্তব্য হলো: ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা, সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ।’

অভীষ্ট ১৬-এর আলোকে ‘কমিউনিটি-চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র মধ্য দিয়ে এমডিজি/এসডিজি ইউনিয়ন গড়ার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে দুটি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের চারটি জেলার ৬১টি ইউনিয়নে যৌথভাবে কাজ শুরু করে। এই কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল মূলত গতানুগতিক মানসিকতার পরিবর্তন, ইউনিয়ন পরিষদের সামর্থ্য বিকাশ ও জনগণকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে একটি সমন্বিত ‘কমিউনিটি-চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র প্রবর্তন, যা বর্তমানে ‘এসডিজি ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ নামে পরিচিত।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে একদল স্বেচ্ছাব্রতী সৃষ্টি হয়েছে, যারা ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে নিয়মিত ও গঠনমূলক অংশীদারি তৈরি করছে। একই সঙ্গে তারা স্থানীয় সচেতন ও সংগঠিত নাগরিকদের অংশগ্রহণে ‘তৃণমূলের নাগরিক সমাজ’ গড়ে তুলেছে। এসডিজির অভীষ্টসমূহ অর্জনের লক্ষ্যে ১. স্থানীয় জনগণ, ২. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ৩. তৃণমূলের নাগরিক সমাজ এবং ৪. জনগণের জন্য সরকারি সেবাদানকারী বিভাগের অংশীদারি একটি ‘কমিউনিটি চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র সূচনা হয়েছে।

 জনগণের ভূমিকা

কমিউনিটি-চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউনিয়নের জনগণ, বিশেষত নারী ও তরুণদের উজ্জীবিত, অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করে সচেতন জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যারা এসডিজি ইউনিয়ন গড়ে তোলার দায়িত্ব নেয়।

‘প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম’ বিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে এসডিজি ইউনিয়ন গড়ে তোলার প্রত্যাশা জাগ্রত করা হয়, যাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে চার দিনের রূপান্তরকারী ‘উজ্জীবক’ প্রশিক্ষণে অংশ নেয় এবং নাগরিকদের সক্রিয় করে কমিউনিটিতে গণজাগরণ সৃষ্টিতে অনুঘটকের ভূমিকা রাখে।

নারী উজ্জীবক ও কমিউনিটির অন্য নারীদের নিয়ে তিন দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একদল ‘নারী নেতৃত্ব’ সৃষ্টি হয়।

ছাত্র-তরুণদের ‘ইয়ুথ লিডারশিপ’ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যারা ‘সক্রিয় নাগরিক’ হিসেবে নিজ এলাকায় ‘সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্টে’র সূচনা করে।

সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত ও ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্যে একদল ‘গণগবেষক’ গড়ে তোলা হয়, যারা নিজেদের সমস্যা চিহ্নিত করে এবং সমাধানের প্রচেষ্টা চালায়। তারা গড়ে তোলে নিজেদের সংগঠন, যার মধ্য দিয়ে ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়’—এসডিজির এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। ‘নাগরিকত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতি’ কর্মশালার মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে নাগরিকত্ববোধ তৈরি এবং সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়।

তরুণদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত একদলকে ‘তথ্যবন্ধু’ হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হয়, যারা জনগণের তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা গড়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখে। জনগণের সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিটি এসডিজি ইউনিয়নে এই সামাজিক পুঁজির সৃষ্টি হয়, যা কাজে লাগিয়ে সামাজিক গণজাগরণ সৃষ্টির মাধ্যমে অনেক সামাজিক সমস্যা প্রায় বিনা খরচেই স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হয়।

 ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘জনপ্রতিনিধিদের সামর্থ্য বিকাশ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণে অংশ নেন, যার ফলে আইনানুযায়ী পরিষদ পরিচালনায় তাঁদের সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়, তাঁদের মধ্যে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের অবসান ঘটে এবং অনুঘটকসুলভ নেতৃত্বের বিকাশ হয়।

এসডিজি ইউনিয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে ইউনিয়ন পরিষদ একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে, যাতে পরিষদকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়। অঙ্গীকার করা হয় ওয়ার্ডসভা ও উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশন আয়োজন এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থানীয় জনগণের অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করার। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাব্রতীদের অংশগ্রহণে স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয়তা সৃষ্টি কমিউনিটি চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা

এসডিজি অর্জনে উজ্জীবক, নারীনেত্রী, তরুণ নেতৃত্ব এবং গণগবেষকসহ ন্যূনতম ১৫০ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাব্রতীর সমন্বয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে গড়ে ওঠে ‘তৃণমূলের নাগরিক সমাজ’। তারা একদিকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ‘ওয়াচ ডগ’ হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে পরিষদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা করে। এ ছাড়া তারা ইউনিয়নের সাধারণ জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত, অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করে এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে স্থানীয় জনগণের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে সহায়তা করে।

 স্থায়িত্বশীলতা অর্জন

কার্যক্রমের প্রভাব ও এর স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটি চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টায় স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কমিউনিটি নিজেরাই তাদের উন্নয়নের দায়িত্ব নেয়। সংবিধানসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন এসডিজি অর্জনকে অগ্রাধিকারে পরিণত করে। পরিষদের মালিকানায় ও নেতৃত্বে এবং জন-অংশগ্রহণের ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য সরকারি সেবাসমূহ সহজপ্রাপ্য করার মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ব্র্যাক ও হাঙ্গার প্রজেক্টের দ্বারা সূচিত কমিউনিটি-চালিত এই উন্নয়ন প্রচেষ্টা ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, যাতে পরিষদ স্বপ্রণোদিত হয়ে জনগণকে সংগঠিত ও ক্ষমতায়িত করে এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এসডিজি ইউনিয়ন 
গড়ে তোলে। এর লক্ষ্য হলো এসডিজি ইউনিয়ন গড়াকে ইউনিয়ন পরিষদের অগ্রাধিকারে পরিণত করা। এ ছাড়া এর সহায়তায় গড়ে ওঠে স্থানীয় নাগরিক সমাজ, যা উন্নয়নের স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত কলাম্বিয়া, প্রিন্সটন ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা চারটি কেস স্টাডির ভিত্তিতে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘প্রসিডিংস অব দ্য আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশ করেন, যার একটি ছিল ব্র্যাক ও হাঙ্গার প্রজেক্টের যৌথভাবে বাস্তবায়িত ৬১টি এসডিজি ইউনিয়ন। গবেষকদের মতে, অন্যান্য ইউনিয়নের তুলনায় উপরিউক্ত ইউনিয়নগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ‘সামাজিক আস্থা’ অর্জিত হয়েছে, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর সামাজিক আস্থার ভিত্তিতেই সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। তাই গবেষকেরা দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের প্রতি স্বল্প আয়ের কমিউনিটি তথা কমিউনিটি চালিত উন্নয়ন প্রচেষ্টার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছেন।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

No comments:

Post a Comment