Dec 16, 2017

সীমানা পুনর্নির্ধারণে জটিলতা হতে পারে

বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন, ১৯৭৬ অনুযায়ী সর্বশেষ আদমশুমারির পর এবং প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের অন্যতম লক্ষ্য হলো নির্বাচনী এলাকাসমূহের মধ্যে ভোটার সংখ্যায় যতটুকু সম্ভব সমতা আনা, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়াটি আইনে পরিণত হলে নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রহিত হবে এবং আগামী সংসদ নির্বাচন ২০১৩ সালের নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। কাকতালীয়ভাবে ১৮ অক্টোবর ২০১৭ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আর সীমানা পুনর্নির্ধারণ না করার প্রস্তাব দিয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, ২০১৩ সালের পুনর্নির্ধারিত সীমানা নিয়ে অনেকগুলো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, যা আগামী সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বাধ্য।

উদাহরণস্বরূপ ৩১ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া তালিকা প্রকাশের পর খোদ সরকারি দলের একাধিক সাংসদ বিগত রকিবউদ্দীন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ করা হয় যে একজন প্রতিমন্ত্রীর মৌখিক অনুরোধে তাঁর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়। এ পুনর্বিন্যাস করতে গিয়ে ঢাকার অন্য ১৫টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে এবং ঢাকার আটজন সাংসদ এর বিরুদ্ধে কমিশনে আপত্তি জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত সীমানা পুনর্বিন্যাস সম্পর্কে ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের সরকারের প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রীর স্বার্থরক্ষা করে ঢাকার আসনের সীমানা বিন্যাসের প্রস্তাব করেছে। একজনের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ১৫ জনের স্বার্থহানি করাটা অন্যায়’ (প্রথম আলো, ৩১ মার্চ ২০১৩)।

সরকারদলীয় আরেকজন সাংসদ জাকির হোসেন এক নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বার্থে ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কুড়িগ্রাম জেলার নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজে পক্ষপাতদুষ্ট হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। কমিশনের শুনানিকালে তিনি দাবি করেন, ‘কমিশন সচিবালয়ের নিচতলায় বসে কুড়িগ্রামের আসন তছনছ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। একজন নির্বাচন কমিশনারের ছেলে ও জামাতা কুড়িগ্রাম থেকে নির্বাচন করতে চাইছেন। তাঁদের জন্য পছন্দসই সীমানা সাজাতে কুড়িগ্রামের আসনগুলোতে হাত দিয়েছেন এই নির্বাচন কমিশনার।’ প্রায় একই অভিযোগ করেন এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাপা নেতা গোলাম হাবিব ও চিত্রপরিচালক বাদল খন্দকার (কালের কণ্ঠ, ২৪ এপ্রিল ২০১৩)।

এ ছাড়া ভোটার সংখ্যার যতটুকু সম্ভব সমতা আনা নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণে অন্যতম মানদণ্ড হলেও ২০১৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণে তা মানা হয়নি। ফলে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৩ সালের সংসদীয় এলাকাগুলোর ভোটার সংখ্যায় পার্থক্য আরও বেড়েছে। তাই ২০১৩ সালের নির্ধারিত সীমানার ভিত্তিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না হয়ে পারে না।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একাদশ নির্বাচনের আগে আর সীমানা পুনর্নির্ধারণ না করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো একটি জটিল কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যেসব আইনানুগ পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে, তা সময়স্বল্পতার কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া দলটি দাবি করে যে নতুন আদমশুমারি ছাড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হলে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু আমরা মনে করি, কমিশন চাইলে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে পারে, যা অতীতে করা হয়েছিল। বিদ্যমান ও খসড়া উভয় আইনেই এমন সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আমরা আইনগত জটিলতারও কোনো কারণ দেখি না, কারণ সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিধান বিদ্যমান আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই সীমানা পুনর্নির্ধারণে দরকার কমিশনের সদিচ্ছা ও সরকারের সহযোগিতা।

আমরা মনে করি, ২০১৩ সালের নির্ধারিত সীমানা নিয়ে যেহেতু বিতর্ক রয়েছে, তাই নতুন করে কয়েকটি সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো হলো: নিরপেক্ষতা (Impartiality), প্রতিনিধিত্ব (Representativeness), ভোটার সংখ্যার সমতা (Equality of voting strength), বৈষম্যহীনতা (Non-discrimination) ও স্বচ্ছতা (Transparency)। এসব মানদণ্ডের মধ্যে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় যত দূর সম্ভব সমতা আনা। উল্লেখ্য, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে যে সীমানা পুনর্নির্ধারিত ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় ভোটার সংখ্যায় অসমতা বৃদ্ধি শুধু আমাদের বিদ্যমান আইনেরই নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেরও লঙ্ঘন। তাই সঠিকভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণের দিকে কমিশনের মনোযোগ দিতে হবে। প্রসঙ্গত, আমরা ঢাকা মহানগরসহ অন্য বড় মহানগরগুলোর জন্য আসন সীমিত করার পক্ষে।

পরিশেষে নির্বাচন কমিশন অগাধ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। উদাহরণস্বরূপ বিদ্যমান সীমানা নির্ধারণ আইনে কমিশনকে নিজস্ব কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী কমিশনের সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার জন্য অন্য কোনো আপিল কর্তৃপক্ষও নেই। তাই কোনোরূপ পক্ষপাতদুষ্ট কাজ করলে কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো পদ্ধতি নেই। কোনো বিধান নেই কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার। তাই আইনটি সংশোধন করে সীমানা নির্ধারণের জন্য ভারতের মতো একটি স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠনের বিষয়টি আজ গভীরভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০১৭

No comments:

Post a Comment