Aug 28, 2017

কেন প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদের প্রয়োজন আজ সর্বাধিক?

গত ২২ মে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী অতিবাহিত হয়েছে। নাগরিক সমাজের এই সিপাহসালারের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গণমাধ্যমে টু শব্দটিও লক্ষ করিনি। জীবদ্দশায় তিনি যেসব সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দু একটি ছাড়া সেগুলোর পক্ষে তাঁকে স্মরণ করার উদ্যোগ আমরা দেখিনি। আমরা যেন তাঁকে ভুলেই গিয়েছি। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান ক্রান্তিকালে এই অসীম সাহসী মানুষটির প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি।  

একটি রাষ্ট্রে নাগরিক সমাজ তার যথার্থ ভূমিকার রাখতে সক্ষম কিনা তা নির্ভর করে নাগরিক সমাজের নেতৃত্ব, বিশেষ করে তাদের সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতার ওপর।
এছাড়া প্রতিকূল এবং ভয়-ভীতিকর কোনো পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণে তাদের অনীহা ও নিরপেক্ষতার ওপরও নাগরিক সমাজের কার্যকারিতা নির্ভর করে। আর যেসব দেশে নাগরিক সমাজ সক্রিয়, সোচ্চার ও সংগঠিত, সেসব দেশেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর এবং নাগরিকের অধিকার নিরাপদ। সেসব দেশেই মানবাধিকার সংরক্ষিত হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তো নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্রের ‘পঞ্চম পিলার’ হিসেবে দেখা হয়-- অন্য চারটি পিলার হলো: নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম। সংগঠিত নাগরিক সমাজই ‘পিপল পাওয়ার’ বা জনতার শক্তির স্ফূরণ ঘটিয়ে নাগরিকের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে।

কিন্তু বর্তমান সময় বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের কাজের জন্য অনুকূল নয়। প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে বড় বেশি করে মনে পড়ছে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের কথা। তিনি শুধু নির্লোভ ও অকুতোভয়ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় ও সোচ্চার নাগরিক। যেথানেই অন্যায় দেখতেন সেখানেই তিনি প্রতিবাদী হতেন। বস্তুত তাঁর সাহসিকতা কল্পনাকেও হার মানায়। তিনি ছিলেন নাগরিক সমাজের অবিসংবাদিত নেতা। ছিলেন সবগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সোচ্চার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি ছিলেন ‘টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, ‘বাপা’র সভাপতি এবং ‘সুজন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনা দখল করে ছিল তাঁর জীবনের অনেকটা সময়জুড়ে। 

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সাহসিকতার বহু দৃষ্টান্ত আমি নিজের চোখে দেখেছি। সাহসিকতার ও নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েও প্রতিবাদ করার একটি বড় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন তিনি ১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ড. ওসমান গনি ছিলেন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং উপাচার্য ড. গনির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত ‘এনএসএফ’ সেসময় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. আবু আহমদের ওপর আক্রমণ করে, যে অন্যায়ের প্রতিবাদে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করেন। এ সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি নিজ জীবিকা বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের অদম্য সাহসিকতার দৃষ্টান্ত আরেকবার আমরা দেখতে পাই ১৯৯৮ সালে। সেই সময় সরকারি দলের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্র নামের কিছু দুর্বৃত্ত জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল। তাদের হাতে একের পর এক ছাত্রী ধর্ষিত হচ্ছিল। এরা এত বেপরোয়া ছিল যে, তাদের একজন, জসিমউদ্দিন মানিক, ঘটা করে তার শততম ধর্ষণ উদ্যাপন করে। এধরনের অশ্লীলতা ও অরাজকতা আগে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এই জঘন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল এব্যাপারে প্রায় সম্পূর্ণ নিরব। আমাদের বুদ্ধিজীবি সমাজও এব্যাপারে ছিলেন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফ্র আহমদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বুকে-পিঠে প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার লাগিয়ে এককভাবে একটি চেয়ারে বসে থেকে এর প্রতিবাদ করেছিলেন। আরও কয়েকজন তাঁর সঙ্গে এ প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তাঁরা তা করেননি। একমাত্র অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদই সাহসিকতা প্রদর্শন করে প্রতিবাদী হয়েছিলেন।

অকুতোভয় অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সাহসিকতার আরেকবার পরিচয় পাই ২০০১ সালে নির্বাচিত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে। সেসময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির সূচক নিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিবাদ করা হয়। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেন। প্রতিবাদ এমনকি হুমকির পর্যায়ে পৌঁছে। প্রতিরোধের হুমকির মুখে অনেকেই অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে নিরব থাকার পরামর্শ দেন। তিনি এসব পরামর্শ অগ্রাহ্য করে সাহসিকতার সঙ্গে হুমকির মোকাবিলা করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর আবারও আমরা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের অসীম সাহসিকতার পরিচয় পাই। নির্বাচনের পর আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলাম। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি শেখ হাসিনাকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে রজু করা সকল ফৌজদারি মামলা নিষ্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। অভূতপূর্ব জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত দলের নেতার প্রতি এমন আহ্বান জানানোকে সমাজের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘দৃষ্টতা’ হিসেবে দেখেন এবং প্রকাশ্যভাবে খবরের কাগজে বিবৃতি দিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের কাছে এটি ছিল নীতি-নৈতিকতার বিষয়, তাই বিশিষ্টজনদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। প্রসঙ্গত, সেই সংবাদ সম্মেলনেই আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছিলাম এবং আওয়ামী লীগের টিকেটে একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর নির্বাচিত হবার তথ্য প্রকাশ করেছিলাম। এরজন্য পরবর্তীতে অবশ্য আমরা উকিল নোটিশও পেয়েছিলাম, যা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম, যদিও বিষয়টি অভিযুক্তের অনাগ্রহের কারণে আদালত পর্যন্ত গড়ায়নি।   

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে নিয়ে আরেকটি স্মৃতি Ñ যা ছিল বাংলাদেশে ভূমিদস্যূদের দখলদারিত্ব বন্ধের একটি অসাধারণ হারানো সুযোগ Ñ আমার মনে আজও অম্লান। সময়টা ছিল নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, ঢাকার আশেপাশে ডেভেলাপারদের দৌরাত্ম তখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। আমি ছিলাম তখন ‘বাপা’র আইন বিষয়ক কমিটির দায়িত্বে এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের একজন অন্যতম পুরোধা। তিনি আর আমি তখন গিয়েছিলাম আমাদের দেশের একজন প্রথম সারির আইনজীবীর কাছে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করতে। এলক্ষ্যে আইনজীবীর একজন জুনিয়র রিটের একটি খসড়াও তৈরি করেন। কিন্তু রিটটি দাখিল করার আগের দিন সিনিয়র আইনজীবী হঠাৎ করে আমাদেরকে বলে বসেন যে, তিনি মামলাটি দাখিল করতে পারবেন না, কারণ এক্ষেত্রে তাঁর স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তিনি রিটের আবেদনের একটি কপিও আমাদেরকে দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এরপর বহু আইনজীবীর দ্বারে দ্বারে আমরা ধর্ণা দিয়েও কাউকে দিয়ে ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি রিট দাখিল করাতে পারিনি। দু একজন আইনজীবী জনস্বার্থে এ রিটটি দাখিল করতে আমাদের কাছে মোটা অঙ্কের ফি-ও দাবি করেন। আমার ধারণা যে, নব্বইয়ের দশকেসে রিটটি উচ্চ আদালতে দাখিল করা গেলে বাংলাদেশে ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্বের সমস্যা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা যেত।

এটি সুস্পষ্ট যে, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ছিলেন তাঁর জীবদ্দশায় বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের একজন সত্যিকারের অকুতোভয় সোচ্চার কণ্ঠ। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন ও অদম্য। তিনি ছিলেন সদা সক্রিয়। তিনি দলমত নির্বিশেষে সকল সরকারের আমলেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েছিলেন। কোনোরূপ হুমকি-ধামকি ও ভয়-ভীতি তাঁকে তাঁর নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। 

২০১২ সালের ২২ মে কীর্ত্তিমান এই মানুষটি আমাদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে পরলোকগমন করেন। পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

তথ্যসূত্র: সমকাল, ০১ জুন ২০১৭


No comments:

Post a Comment