Aug 28, 2017

এ যেন এক গোঁজামিলের বাজেট!

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার একটি মেগা বাজেট উত্থাপন করেছেন, যার মধ্যে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। এই বরাদ্দের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা, যার ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বা জিডিপির ৫ শতাংশ। আর এই ঘাটতি পূরণ হবে ব্যাংকঋণ থেকে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ থেকে ৩২ হাজার ১৪৯ কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ঋণ থেকে আসবে। উল্লেখ্য, এডিপির একটি বড় অংশ ব্যয় হবে ছয়টি অগ্রাধিকার প্রকল্পে।


যেকোনো বাজেটের তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকে। প্রথমত, বাজেট একটি বার্ষিক সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের খতিয়ান। দ্বিতীয়ত, এটি সরকারের খাতওয়ারি অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। তৃতীয়ত, বাজেট ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ার। শেষ দুটি বৈশিষ্ট্য বাজেটের একটি দার্শনিক ভিত তৈরি করে।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট নিঃসন্দেহে আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের একটি তালিকা। তবে এতে কোনো বিশেষ খাতের প্রতি সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে বলে মনে হয় না। যেমন, আমাদের জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ, যা আমাদের জন্য একধরনের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ তৈরি করেছে এবং যা চিরস্থায়ী হবে না। আর এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আমরা আমাদের তরুণদের জন্য উন্নতমানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ বিনিয়োগের প্রতি অগ্রাধিকার দিতে পারতাম। অর্থাৎ আমরা আমাদের তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ তৈরি না করে, তাদেরই ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করার প্রতি অগ্রাধিকার দিতে পারতাম। ফলে তারাই বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের কর্মসংস্থান করতে পারত, যে কর্মসংস্থানের সমস্যা আমাদের জন্য দারুণ সংকটের সৃষ্টি করেছে। প্রসঙ্গত, প্রস্তাবিত বাজেটে আমরা কর্মসংস্থানের প্রতিও বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে পারতাম।

এ ছাড়া বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলে আমরা বিশেষত রপ্তানি খাতে অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব এবং বিশ্ব পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছে, যার জন্য এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের সম্ভাব্য ‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে এবং ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে হবে। বিখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুম্পেটার বহু বছর আগে বলে গিয়েছেন যে শিল্পোন্নয়ন একটি ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’ বা ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ায় কম সম্ভাবনাময় খাত থেকে বেশি সম্ভাবনাময় খাতে সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটে থাকে। তাই বাজেটকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে সাহসিকতার সঙ্গে এর অগ্রাধিকার এবং প্রণোদনা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করা আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাজেট প্রণয়নপ্রক্রিয়া যেন একটি বাঁধাধরা ছকের মধ্যে আটকে গেছে। এই ছকের মধ্যে আবদ্ধ থেকেই প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো-কমানো হয়। ফলে আমাদের বাজেট যেন অনেকটা অটো-পাইলট।

প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘সংকট মোচন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে’র লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২০২১ সালের জন্য আটটি অগ্রাধিকারসংবলিত একটি রূপকল্প ঘোষণা করা হয়, যেগুলো হলো, ‘১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদ; ২. রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণ-অংশায়ন; ৩. সুশাসনের জন্য আইনের শাসন ও দলীয়করণ প্রতিরোধ; ৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন; ৫. দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন; ৬. নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা; ৭. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উদ্যোগ; এবং ৮. বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ।’ অর্থাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্ষমতাসীন দল উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন কায়েম করার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু উন্নয়নের প্রতি অগ্রাধিকার অব্যাহত থাকলেও গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতাই আমরা লক্ষ করছি। বর্তমান বাজেটেও এ ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না।

এ ছাড়া গত নির্বাচনের আগে প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছিল: গণতন্ত্রায়ণ, সুশাসন ও বিকেন্দ্রায়ণ। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান সরকার অনেক আগেই উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে বাদ দিয়েছে। তাই বর্তমান বাজেটেও উন্নয়নের নামে যে অপচয় ও লুটপাট চলছে, তাকে প্রতিহত করার কোনো উদ্যোগ নেই। বরং বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী অন্য দেশেও ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি হয়—বলে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিরাজমান ব্যাপক লুটপাটের পক্ষে সাফাই-ই গেয়েছেন। এ ছাড়া বিকেন্দ্রীকরণের কোনোরূপ দিকনির্দেশনাও প্রস্তাবিত বাজেটে আমরা খুঁজে পাই না। তাই এটি সুস্পষ্ট যে প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না। বরং যা লক্ষ করা যায় তা হলো বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধির একধরনের লাগামহীন প্রবণতা। বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রাক্কলিত বাজেট থেকে ২৩ হাজার টাকা বা ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কাটছাঁট করে সংশোধিত বাজেট তৈরি করা হলেও ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ওই সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৮৩ হাজার ৯২ কোটি বা ২৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এ বৃদ্ধি কোন যুক্তিতে করা হয়েছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। শুধু তা-ই নয়, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় এডিপির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ৪২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যার কোনো যৌক্তিকতাও আমরা খুঁজে পাই না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এমন বিরাট পরিমাণের বৃদ্ধি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কোথা থেকে আসবে, তাও আমাদের জানা নেই।

প্রস্তাবিত মেগা বাজেটের অর্থায়ন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় যে ধরনের টার্গেট নির্ধারণ করেছেন, তাকে আকাশকুসুম কল্পনা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রাক্কলিত রাজস্ব আয় থেকে ২৪ হাজার ২৫২ কোটি টাকা বা ১০ শতাংশ কম রাজস্ব আয় হবে ধরে বাজেট সংশোধন করা হলেও, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ওই সংশোধিত রাজস্ব আয়ের তুলনায় ৬৯ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা বা ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ রাজস্ব আয় বৃদ্ধির টার্গেট নির্ণয় করা হয়েছে। কীভাবে এনবিআর এই বিরাট অঙ্কের রাজস্ব আয়ের জোগান দেবে, তা আমাদের মাথায় আসে না। টাকার মূল্যমান বাড়িয়ে বৈদেশিক আমদানি আরও বৃদ্ধি করা হলেই হয়তো রাজস্ব আয়ের এমন টার্গেট মেটানো সম্ভব হবে, যদিও এর বলি হবে আমাদের রপ্তানি খাত, বিশেষত তৈরি পোশাকশিল্প। একইভাবে প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ২৩ হাজার ১৫৩ কোটি বা ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে ধরা হয়েছে, যদিও বিদায়ী অর্থবছরে তা ৭ হাজার ৫৩৪ কোটি বা ২০ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পাবে ধরে বাজেট সংশোধন করা হয়েছে।

এটি সুস্পষ্ট যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত মেগা বাজেটের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। মনে হয় যেন আমাদের অর্থমন্ত্রী ম্যাজিশিয়ান হ্যারি হুদিনির মতো তাঁর হ্যাট থেকে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি ব্যয়ের অঙ্ক বের করে এনে তার বিপরীতে মনগড়াভাবে রাজস্ব আয়ের উৎস নির্ধারণ করেছেন, যার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজে পাওয়া যায় না বাজেটের কোনোরূপ দার্শনিক ভিত্তিও। বরং লক্ষ করা যায় যেকোনো মূল্যে যেকোনো উৎস থেকে সম্পদ আহরণের এক ভয়াবহ প্রবণতা। তাই প্রস্তাবিত বাজেটকে গোঁজামিলের বাজেট বলাই হয়তো সমীচীন হবে। আর এই গোঁজামিলের মেগা বাজেটের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো কতগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, যা শুধু চলমান দুর্নীতি-অনিয়মের ধারাকেই অব্যাহত রাখবে না, আমাদের পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেও সংকটের দিকে ঠেলে দেবে বলে আমাদের আশঙ্কা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ১৪ জুন ২০১৭ 

No comments:

Post a Comment