Aug 29, 2017

এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!

১০ আগস্টের প্রথম আলোর প্রধান শিরোনামটি পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছি। শিরোনামটি ছিল ‘জনগণের নয়, বিচারকদের প্রজাতন্ত্রে বাস করছি’। এটি আমাদের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় সম্পর্কে একটি সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রদত্ত বক্তব্যের সারাংশ।

বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্য থেকে আমি যা বুঝেছি তা হলো, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ পরিচালিত হওয়ার কথা জনগণের সম্মতিতে, তাঁদের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে। কিন্তু আমাদের দেশে এর উল্টোটা চলছে, বিচারপতিদের নির্দেশেই বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর এ বক্তব্য পড়তে গিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্যের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি আমার মনে পড়ে যায়, এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!


স্মরণ করা যেতে পারে যে বিচারপতি খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত পূর্বে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলায় একটি সংক্ষিপ্ত, বিভক্ত আদেশ দেন। এর মাধ্যমে আপিল বিভাগের বিচারকদের ৪:৩-এর সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পরে অবসর গ্রহণের প্রায় ১৫ মাস পর তিনি ৭৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।

আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে আপিল নিষ্পত্তির সময় আদালত ‘অ্যামিকাস কিউরি’ বা আদালতের বন্ধু হিসেবে আটজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর বক্তব্য শোনেন। আটজন বিশেষজ্ঞের মধ্যে সাতজনই, আজমালুল হোসেন ব্যতীত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বৈধ এবং তা অব্যাহত রাখার পক্ষে মতামত দেন।

লিখিত বক্তব্যে আমাদের দেশের অন্যতম প্রথিতযশা সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘...দেশের সকল রাজনৈতিক দল ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাসকৃত ত্রয়োদশ সংশোধনী গ্রহণ করিয়াছে; ইহার বিধানের অনুসরণে একাদিক্রমে অনুষ্ঠিত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে দেশের জনগণ অংশগ্রহণ করিয়াছে। সুতরাং ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের যোগ্যতা বা কার্যকারিতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপন করা বাতুলতামাত্র’ (বিচারপতি খায়রুল হকের রায়, পৃ. ৪৩)। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল একটি মীমাংসিত বিষয়।

মৃত্যুর আগে রায়টি নিয়ে জনাব ইসলামের সঙ্গে বর্তমান লেখকের কথা হয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি ছিল একটি ‘পলিটিক্যাল/ কোশ্চেন’/ বা রাজনৈতিক বিষয় এবং বিষয়টি নিয়ে আদালতের জড়িত হওয়া ঠিক হয়নি। প্রসঙ্গত, সাংবিধানিক আইনে পলিটিক্যাল/ কোশ্চেন/ বলে একটি ‘ডকট্রিন’ বা মতবাদ রয়েছে, যা এসেছে মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে [লুথার বনাম বোর্ডেন (১৮৪৯)]। এর তাৎপর্য হলো, কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে আদালতের মাথা না ঘামানোই শ্রেয়।

পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর যুগপৎ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এবং জনদাবির মুখে বিএনপি ষষ্ঠ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করে। তাই এটির ব্যাপারে শুধু একটি রাজনৈতিক মতৈক্যই ছিল না, এর পক্ষে ব্যাপক জনমতও বিরাজ করছিল। উল্লেখ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে সারা দেশে এখনো ব্যাপক জনমত বিরাজ করছে, যা একাধিক জরিপে উঠে এসেছে। তা সত্ত্বেও বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের একটি বিভক্ত রায়ের মাধ্যমে এটি বাতিল হয়ে যায়। তাই ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মাধ্যমে যদি, বিচারপতি খায়রুল হকের ভাষায়, ‘জনগণের নয়, বিচারপতিদের প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক মতৈক্য উপেক্ষা করে এবং জনমতের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে বিচারপতি হকের দেওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলকে আমরা কী বলব?

বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর বাংলাদেশে যেসব ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সবারই জানা। নবম সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বেগম সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির, যে কমিটিতে আওয়ামী লীগ ও জোট সরকারের সকল জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রেখেই সংবিধান সংশোধন করার সর্বসম্মত প্রাথমিক সুপারিশ উপেক্ষা করে, চূড়ান্ত রায় লেখার আগেই, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়। সংসদের এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপতি খায়রুল হকের সংক্ষিপ্ত আদেশকেই অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়।

প্রসঙ্গত, এরপর যা ঘটেছে, তার সম্ভাবনাও মাহমুদুল ইসলাম অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলেছেন। তিনি এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলে বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের কথা বলেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রেখে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার কথাও বলেছেন। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর এবং অন্যান্য অ্যামিকাস কিউরির প্রজ্ঞাবান পরামর্শ উপেক্ষা করার বিয়োগান্ত পরিণতি আমরা সবাই পরে সচক্ষে দেখেছি!

সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি খায়রুল হক আরও কিছু কথা বলেছেন, যা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। যেমন তিনি ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে রায়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রায়টি ছিল পূর্বধারণাপ্রসূত। তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের গণতান্ত্রিকতার কথায় আসা যাক। এটি ছিল আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির সর্বসম্মত রায়। জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞদের নিয়ে গঠিত অ্যামিকাস কিউরিদের একজন বাদে সবাই এটি বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন। পক্ষান্তরে বিচারপতি খায়রুল হকের রায়টি ছিল বিভক্ত। শুধু তা-ই নয়, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলাটিতে হাইকোর্ট বিভাগের পাঁচজন বিচারপতির আরও দুটি বেঞ্চও সর্বসম্মতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের যে ১২ জন বিচারপতি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে রায় দিয়েছেন, তাঁদের আটজনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ ছাড়া আগেই বলা হয়েছে যে বিচারপতি খায়রুল হকের সংক্ষিপ্ত আদেশ প্রদানের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে শুধু রাজনৈতিক মতৈক্যই ছিল না, এটির পক্ষে ব্যাপক জনমতও বিরাজ করছিল। এমনি প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন থেকে যায়, খায়রুল হকের রায়টি কি ‘গণতান্ত্রিক’ ছিল?

এ কথা সত্য যে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতিগণ বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যা কারও কারও মতে অপ্রাসঙ্গিক, এমনকি বিদ্বেষপ্রসূত। বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপতিরা তাঁদের পর্যবেক্ষণ দেন, এটি একটি বিচারিক ট্র্যাডিশন। এমনকি বিচারপতি খায়রুল হকও তাঁর চূড়ান্ত রায়ে ১৬টি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যার মধ্যে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়টি পূর্বধারণাপ্রসূত, বিচারপতি খায়রুল হকের এ বক্তব্যও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তিনি কী বলতে চাইছেন, আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতি বর্তমান সরকারের প্রতি বিদ্বেষাত্মক পূর্বধারণা পোষণ করেন? তাঁর এ ধারণার কোনো ভিত্তি আমরা খুঁজে পাই না। কারণ, মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উচ্চ আদালতে নিয়োগ পেয়েছেন। সরকার কি জেনেশুনেই তাহলে বিদ্বেষাত্মক পূর্বধারণা পোষণকারীদের সর্বোচ্চ আদালতে নিয়োগ দিয়েছে?

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সম্পর্কে বিচারপতি খায়রুল হকের সমালোচনা আমার কাছে উদ্ভট মনে হয়েছে। কারণ, আমার জানামতে, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মামলার রায়ে বিচারপতি খায়রুল হকই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল-ব্যবস্থাকে ‘মার্জনা’ করে তা রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাই প্রশ্ন জাগে, কী কারণে তাঁর এই মত পরিবর্তন!

পরিশেষে, আমি বিভ্রান্তিতে ভুগছি: বিচারপতি খায়রুল হক কি বর্তমান সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ‘বিচারপতিদের গণপ্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগের ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’র বা বিচারিক ক্ষমতা বিলুপ্তির প্রস্তাব করছেন? আমাদের সংবিধানে সংসদকে আইন প্রণয়নের, নির্বাহী বিভাগকে আইন বাস্তবায়নের এবং বিচার বিভাগকে বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ কিন্তু সংবিধান একটি ‘সেল্প এক্সিকিউটিং’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়নযোগ্য দলিল নয়। তাই সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধান নিজের হেফাজতকারীর দায়িত্ব দিয়েছে। এ অবস্থায় উচ্চ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা রহিত, এমনকি খর্ব করা হলেও আমরা এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হতে পারি। বিচারপতি খায়রুল হক কি তা চান?

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট ২০১৭

No comments:

Post a Comment