Aug 28, 2017

উন্নয়ন চমক ও এসডিজি যুগে বাংলাদেশ

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির যুগে (২০০০-২০১৫) বাংলাদেশ দারিদ্র্য দূরীকরণ ও মানব উন্নয়নে অসামান্য সফলতা অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এমন সফলতা অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই অবিশ্বাস্য চমক বলে মনে হয়েছে। ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এটিকে  ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’ বলছেন।

আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক সফলতা অনেকের কাছে চমক বলে মনে হয়েছে। কারণ, জাতি হিসেবে আমরা অনেক গুরুতর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন।
প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সম্পদের স্বল্পতা, আয় ও সুযোগের বৈষম্য, ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন—সর্বোপরি সুশাসনের অভাব ইত্যাদি। এসব প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও গত দেড় দশকে বাংলাদেশের জনগণের জীবন-জীবিকায় ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষত আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধির হারের একটি বড় কারণ হলো গত কয়েক দশকে তৈরি পোশাকশিল্পে আমাদের ব্যাপক সফলতা। স্বল্প আয় করলেও তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাঁদের অধিকাংশই নারী, গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করা, তাঁদের পরিবারের আর্থিক সংগতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিদেশে কর্মরত ও হাড়ভাঙা খাটুনিতে নিয়োজিত প্রায় এক কোটি শ্রমিকের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের পল্লি অর্থনীতিতে ব্যাপক গতিশীলতা এনেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে কৃষি ও কৃষকের অবদানও বিরাট। বিরাজমান সুশাসনের অভাব এ তিনটি খাতের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এগুলোর অবদানে তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলেনি। বরং সুশাসনের অভাব তৈরি পোশাক খাত এবং বিদেশি আয়ের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলেই মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক কারখানার বহু মালিক তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক আইনকানুনকে পাশ কাটিয়ে চলতে পেরেছেন। অনেকে আবার ‘আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং’ এবং অন্যান্য দুর্নীতিমূলক কাজে জড়িত হয়েও পার পেয়ে গেছেন। কঠোর নিয়মকানুন ও সেগুলোর নির্মোহ প্রয়োগের অনুপস্থিতির ফলে অনেক শ্রমিক অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে পেরেছেন, যা বিদেশি আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যদিও প্রবাসী আয়ে বর্তমানে ভাটা পড়তে 
শুরু করেছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং তাদের উদ্ভাবিত জনগণের বহু সমস্যার স্বল্প খরচের সৃজনশীল স্থানীয় সমাধানকেই গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামাজিক ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশে বহু সেবা প্রদানকারী এনজিও সমন্বিতভাবে বহু সেবা দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে দিয়ে আসছে, যাতে তাদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এনজিওদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং একই সঙ্গে ডায়রিয়া রোগে মৃত্যু রোধে খাবার স্যালাইন (ওআরটি) ও কৃমি রোধের ক্যাম্পেইন, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং ইউনিসেফের সুপারিশকৃত ব্যয়বহুল পদ্ধতির পরিবর্তে রিং-স্লাব দিয়ে স্বল্প খরচের স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারের কারণে।

সেবা প্রদান করতে গিয়ে এনজিওগুলো নারী ও তাঁদের পরিবারগুলোকে তাদের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারগুলোর ওপর—যেমন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ এবং সন্তানদের স্কুলে প্রেরণ ইত্যাদির ওপর জোর দিয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম ও উদ্যোগগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মাতৃমৃত্যু রোধে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে নারীদের জন্য সন্তান জন্ম পূর্ব-প্রসূতিসেবা বা ‘প্রি-নেটাল কেয়ার’ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব-পূর্ব থেকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকারের পক্ষ থেকে এনজিওগুলোকে সেবা প্রদানমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান না করা হলে অবশ্য এসব অর্জন সম্ভব হতো না।

‘গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের ঘাটতি’ সত্ত্বেও বাংলাদেশে কি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজির যুগে (২০১৬-২০৩০) তার ‘বাংলাদেশে চমক’ অব্যাহত রাখতে পারবে? অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশসংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলোর অবিভাজ্যতা, পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ততার কারণে এগুলোর অর্জন হবে অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া এমডিজির ক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা, কিন্তু এসডিজির লক্ষ্য হলো এগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। এ ছাড়া এমডিজির লক্ষ্য ছিল যেমন শিক্ষার ক্ষেত্রে এর বিস্তার ঘটানো, কিন্তু এসডিজির ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো শিক্ষার মানোন্নয়ন, যা অর্জন করা হবে অনেক দুরূহ। উপরন্তু, এসডিজির সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক লক্ষ্য হলো কেউ যেন বাদ না পড়ে এবং সবচেয়ে দরিদ্রতম ব্যক্তিও যেন এতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা অর্জনের জন্য আরও দুরূহ প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে হলে ভবিষ্যতে এমন এক ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন হবে, যা ‘নিশ্চিত করবে সর্বস্তরে সংবেদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিনিধিত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ (এসডিজি ১৬.৭)। এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সব স্তরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এ কারণেই এসডিজি-১৬ কে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের অংশ, বস্তুত ‘শিরোমণি’ করা হয়েছে, যা অর্জনের ওপর অন্য অভীষ্টগুলোর অর্জন নির্ভর করবে।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে এনজিওগুলোর সচেতনতা সৃষ্টিমূলক কার্যক্রম ও বিভিন্ন সমস্যার স্বল্পব্যয়ের সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের সুবিধা প্রায় পুরোপুরি ভোগ করে ফেলেছে। ভবিষ্যতে এসডিজি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই ত্বরান্বিত করতে এবং জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য বরাদ্দই বাড়াতে হবে না, প্রদত্ত সেবার মানেও ব্যাপক উৎকর্ষ ঘটাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে নাগরিকদের স্বল্প খরচে বেশি, মানসম্মত ও দুর্নীতিমুক্ত সেবাপ্রাপ্তির জন্য সোচ্চার ভূমিকা। আর এর জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে ‘সিটিজেন অ্যাকটিভিজম’ বা নাগরিকদের সক্রিয়তা। এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে সম্মিলিত কার্যক্রম  গ্রহণের লক্ষ্যে এনজিওদের দ্বারা জনগণের মধ্যে নাগরিকত্ববোধ সৃষ্টি এবং নাগরিক অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে তাদের জাগিয়ে তোলা ও সংগঠিত করা। গতানুগতিক ডেভেলপমেন্ট এনজিওগুলোর এ ধরনের ভূমিকা পালনে হয় দক্ষতার অভাব রয়েছে, না হয় রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে তারা এতে আগ্রহী নয়। তাই এসডিজি অর্জনের জন্য প্রয়োজন হবে ডেভেলপমেন্ট এনজিওর পাশাপাশি অ্যাডভোকেসি এনজিওর, যারা রাইট বেইসড পদ্ধতিতে কাজ করবে এবং সত্যিকারের নাগরিক সমাজের ভূমিকা পালন করবে।

এসডিজি অর্জন করতে হলে আরও প্রয়োজন এর স্থানীয়করণ। স্থানীয়করণ হলো এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সব অংশীজন ক্ষমতায়িত হয়, যাতে টেকসই উন্নয়ন প্রচেষ্টা স্থানীয় প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি আরও সংবেদনশীল ও প্রাসঙ্গিক হয়। উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো অর্জন তখনই সম্ভব হয়,  যখন স্থানীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শুধু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই নয়, বরং অগ্রাধিকার নির্ণয় ও পরিবীক্ষণেও সম্পৃক্ত হয়। তাই স্থানীয়করণের অর্থ শুধু স্থানীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে শুধু স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়নই নয় বরং এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে অংশগ্রহণ ও পরামর্শ গ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়ন (www.localizingsdgs.org) এ জন্যই এসডিজি-১৬তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অ্যাডভোকেসি এনজিওগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

তাই আমরা মনে করি যে এসডিজির যুগে বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন চমকের পুনরাবৃত্তি করতে হলে আগামী দিনে বহু পরিবর্তন ও সংস্কার করতে হবে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে সুশাসনের ঘাটতি পূরণ।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৮ জুলাই ২০১৭

No comments:

Post a Comment