Aug 29, 2017

নির্বাচন কমিশনের যা করা উচিত

আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুসরণে অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ শুরু করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনকে সাধুবাদ জানাই। গত ৯ মে কমিশনের কাছে আমরা সুজনের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ দিয়েছি। আমাদের সুপারিশকৃত বিষয়গুলোর কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধনসহ আবারও তুলে ধরছি। আশা করি, সংলাপগুলো নিতান্তই লোকদেখানো হবে না এবং কমিশন আমাদের দেওয়া এবং সংলাপ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়টির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে।

নির্বাচনে সেনা মোতায়েন
বাংলাদেশের সব নির্বাচনেই সেনাবাহিনী ভূমিকা রেখেছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, যে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছিল, সেনাবাহিনী আইনগতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই এবারও সেনাবাহিনীর সে ভূমিকা পালনে কারও আপত্তি করা যৌক্তিক হবে না।
এ ছাড়া অতীতে আমরা দেখেছি যে চরম দলীয়করণে দুষ্ট আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণই নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা। আরেকটি বাস্তবতা হলো যে বারবার জনমত জরিপে দেখা গিয়েছে, সেনাবাহিনী জন-আস্থার দিক থেকে সবার ওপরে। উপরন্তু নির্বাচনী কর্মকর্তারাও, যাঁরা নির্বাচন পরিচালনা করবেন, সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের সময়ে মাঠে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

আইনি কাঠামো
সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনি কাঠামোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন ১. ‘না-ভোটে’র বিধান পুনঃপ্রবর্তন; ২. মনোনয়নপত্র অনলাইনে দাখিলের বিধান; ৩. জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা ও আয়কর বিবরণী দাখিলের বিধান এবং ৪. রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্যদের নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত আপডেট করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘না-ভোটে’র বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যদিও আইনটি সংসদে অনুমোদনের সময় তা বাদ দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ভারতের নির্বাচনে ‘না-ভোটে’র বিধান প্রচলিত হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের নির্বাচনী কর্মকর্তারাও এটি পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে সুপারিশ করেছেন।

ভোটার তালিকা
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তৈরি সর্বাধিক সঠিক ভোটার তালিকায় পুরুষের তুলনায় ১৪ লাখের বেশি নারী ভোটার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এর কারণ হলো, বিদেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির প্রায় সবাই পুরুষ এবং অধিকাংশই ভোটার নন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভোটার তালিকায় হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ‘জেন্ডার-গ্যাপ’ বা নারী-পুরুষের সংখ্যায় অসমতা দেখা দেয়। ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ
নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কয়েকটি সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হয়, যার একটি হলো সংসদীয় আসনগুলোতে জনসংখ্যায় যত দূর সম্ভব সমতা আনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে যে ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোতে ভোটারসংখ্যায় অসমতা আরও বেড়েছে, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উভয়েরই লঙ্ঘন (যুগান্তর, ২১ মে ২০১৩)। তাই সঠিকভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণের দিকে কমিশনের মনোযোগ দিতে হবে। আমরা ঢাকা মহানগরের জন্য আসন সীমিত করার পক্ষে।

মনোনয়নের লক্ষ্যে তৃণমূল থেকে প্যানেল তৈরির বিধানের প্রয়োগ
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য একটি প্যানেল তৈরি করার এবং সেটি থেকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দেওয়ার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সংসদে আরপিওর অনুমোদনের সময় বিধানটিতে পরিবর্তন আনা হয়। এতে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হচ্ছে এবং মনোনয়ন-বাণিজ্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। আমরা মনে করি, তৃণমূল থেকে প্যানেল তৈরির এ আইনি বিধানকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা আবশ্যক।

দলের কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব
রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখারও বিধান রয়েছে। আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনের এটি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

নির্বাচনী বিরোধ
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত মীমাংসা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশে তা মীমাংসা করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী মামলা সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও নিষ্পত্তি হয় না। এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা নির্বাচনী অপরাধকেই উৎসাহিত করে। নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর কমিশনের আর কিছুই করার থাকে না বলে অনেকে যে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তা সঠিক নয়। নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের উচ্চ আদালতের অনেকগুলো সুস্পষ্ট রায় রয়েছে। নূর হোসেন বনাম মো. নজরুল ইসলাম মামলার [৪৫ বিএলসি (এডি) (২০০০)] রায়ে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন: ‘আমরা এ কথা পুনর্ব্যক্ত না করে পারি না যে নির্বাচন চলাকালে গোলযোগের, ব্যালট পেপার কারচুপির (rigging) বা নির্বাচন সঠিক (just), সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে রিপোর্ট বা অভিযোগ উত্থাপিত হলে, উক্ত রিপোর্ট বা অভিযোগের সত্যতা যাচাইপূর্বক কমিশনের ফলাফল বাতিল ও পুনঃ নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক।’

হলফনামা যাচাই-বাছাই ও ছকে পরিবর্তন
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত হলফনামায় অনেক প্রার্থীই মিথ্যা তথ্য দেন বা তথ্য গোপন করেন, যে কারণে তাঁদের মনোনয়নপত্র এবং নির্বাচিত হলে নির্বাচন বাতিল হওয়ার কথা। এ কাজটি কঠোরভাব বাস্তবায়িত হওয়া উচিত। তাতে অনেক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা এবং রাজনীতি বহুলাংশে কলুষমুক্ত করা সম্ভব হবে। হলফনামার ছকটিতে যে অসম্পূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। যেমন বর্তমানে অনেকে আয়ের উৎসের বিস্তারিত বিবরণ দেন না। কারা প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীল, সে তথ্যও হলফনামা থেকে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া প্রার্থীর বয়স এবং তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব-সম্পর্কিত তথ্যও হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।

কমিশনে নিয়োগ আইন
নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠনের বিষয়ে কমিশনকে একটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। আমরা মনে করি, ভবিষ্যতে কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিতর্ক এড়াতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানের আলোকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন জরুরি।

নির্বাচনী সহিংসতা রোধ
ড. শামসুল হুদা কমিশনের সময় নির্বাচনী সহিংসতা ছিল না বললেই চলে। সেই কমিশনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরাও আইনকানুন মানা শুরু করেছিলেন। বিগত রকিবউদ্দীন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী সহিংসতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

নির্বাচনী ব্যয়সীমা
নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বিগত কমিশন এ ব্যয়সীমা ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার থাকলেও তাঁরা প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর আমাদের জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছে কোটিপতিদের ক্লাবে। তাই কমিশনকে নির্বাচনী ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা কমাতে হবে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থীদের পোস্টার ছাপানো ও প্রচার এবং সব প্রার্থীকে এক মঞ্চে এনে ‘প্রজেকশন মিটিং’ আয়োজনের মধ্য দিয়েও নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন ও বৈদেশিক শাখা
আরপিওর ৯০(গ) ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা থাকা বেআইনি, যা রাজনৈতিক দলগুলো অমান্য করেই চলেছে। এ ছাড়া নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো ভ্রুক্ষেপও করছে না, যদিও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাণ্ডব সৃষ্টি করেই চলেছে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আইনকানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন
আমরা মনে করি, সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি, যাতে ভুয়া ও অসত্য সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করা যায়। কারণ, অসত্য সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৯ আগস্ট ২০১৭

No comments:

Post a Comment