Aug 29, 2017

সমালোচকেরা কি রায়টি পড়েছেন?

আমাদের সমাজে চিলে কান নিয়ে যাওয়ার গল্পটি বহুল প্রচলিত। গল্পটিতে চিলে কান নিয়ে গেছে—এ কল্পনায় কানের মালিক হা-হুতাশ করতে থাকে, কিন্তু আসলেই কি চিল কান নিয়ে গেছে, তা হাত দিয়ে একবার পরীক্ষা করেও দেখে না। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় নিয়েও যেন তেমনটিই ঘটছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের সর্বস্তরের অনেক নেতা-কর্মী এবং তাদের একদল সুবিধাভোগী সমর্থক যেন উঠেপড়ে লেগে গেছেন এটি প্রতিষ্ঠা করতে যে মামলার রায়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে খাটো করে দেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি আমাদের মহান জাতীয় সংসদকে অবমাননা করেছেন। আমার আশঙ্কা যে এসব ব্যক্তি যেন চিলে কান নেওয়ার গল্পই ফাঁদছেন।


কারণ, তাঁরা হয়তো রায়টি পড়েই দেখেননি অথবা মনোযোগ দিয়ে পড়েননি।

শঙ্কার বিষয় হলো যে রায়ের এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েই তাঁদের অনেকেই ক্ষান্ত হননি, তাঁরা রায় বাতিল, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ, এমনকি তাঁকে অপসারণের দাবি করছেন। এ দাবিতে তাঁরা আন্দোলনের হুমকিও দিচ্ছেন। এসব ঘটনা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করে দেখার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে রায়ের সমালোচনাকারীরা ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায় (প্রধান বিচারপতির লেখা ৩৯৫ পৃষ্ঠা) থেকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে মাত্র দুটি ক্ষুদ্র বাক্যের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। রায়ের প্রাসঙ্গিক অংশটি হলো: ‘No nation-no country is made of or by one person. If we want to truly live up to the dream of Sonar Bangla advocated by our Father of the nation, we must keep ourselves free from this suicidal ambition and addiction of ‘I’ness. That only one person or one man did all this etc.’ (কোনো জাতি বা দেশ কোনো এক ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, কিংবা এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়েও ওঠে না। আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের আমিত্বের আত্মঘাতী উচ্চাশা ও আসক্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। (এমন আসক্তি) যে এক ব্যক্তি এত সব করেছে ইত্যাদি। (পৃ. ৫৪)

মনোযোগী পাঠক লক্ষ করবেন যে মোট ২৩ (১১ + ১২) শব্দের প্রথম এবং তৃতীয় বাক্যের মাধ্যমে একটি ‘রেটরিক্যাল জেনারেল স্টেটমেন্ট’ বা আলংকারিক সাধারণ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, গুগলের অভিধান অনুযায়ী, রেটরিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুনরাবৃত্তি (repetition is a common rhetorical device)। লক্ষণীয় যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাঁর তৃতীয় বাক্যে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং দ্বিতীয় বাক্য থেকে পুনরাবৃত্তি না করলে তৃতীয় বাক্যটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

ওপরে উল্লেখিত বাক্য দুটি যে নিতান্তই সাধারণ আলংকারিক বক্তব্য এবং কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার জন্য লিখিত নয়, তা এর মাঝখানের বাক্যটি থেকে সুস্পষ্ট, যে বাক্যে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের পরবর্তী অংশের বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে প্রধান বিচারপতির মতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো আমিত্বের অহমিকা। প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে যে কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলার চেষ্টা করেছেন, তা হলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ‘আমিত্বের’ পরিবর্তে ‘আমাদের’ সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করা হয়েছে বলে অতি উত্সাহীরা যে ধুয়া তোলার জন্য উপরিউক্ত দুটি আলংকারিক বাক্যের অপব্যবহার করছেন, তা রায়ের অন্যান্য অংশ পড়লেই বোঝা যায়। যেমন প্রধান বিচারপতি রায়ের ২৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ‘...ইয়াহিয়া খান অবশেষে নির্বাচন দিতে বাধ্য হলেন, যে নির্বাচন ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, তা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কল্পনারও বাইরে...ইয়াহিয়া খান শেষ পর্যন্ত সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি। বরং নিরস্ত্র, নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত গণহত্যা ঘটান। তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেন এবং বাংলাদেশের অসহায় জনগণকে নির্বিচারে হত্যায় মেতে ওঠেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ বঙ্গবন্ধুর একজন সামান্য গুণগ্রাহী হিসেবে, আমি তো এখানে তাঁকে খাটো করে দেখার কোনো কিছুই খুঁজে পাই না।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণাকারী ও জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিপরীতে প্রধান বিচারপতি আমাদের ইতিহাসের দুজন সামরিক শাসককে বলপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। রায়ের ২২৬ পৃষ্ঠায় প্রধান বিচারপতি বলেন যে ‘স্বাধীনতার পরে ক্ষমতালিপ্সু অশুভ চক্র দুবার এ দেশকে একটি ব্যানানা রিপাবলিকে পরিণত করেন, যেখানে জনগণকে পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাঁরা জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন এবং তাঁদের সস্তা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁদের অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগকে বৈধ করার লক্ষ্যে।’

এবার সংসদ অবমাননার কথায় আসা যাক। প্রধান বিচারপতি সংসদের মর্যাদাহানি তো করেনই নাই, বরং সাংসদদের মর্যাদা সমুন্নত করার লক্ষ্যে হাইকোর্টের বিচারপতিদের তিনি ভর্ৎসনা করেছেন। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে হাইকোর্ট সাংসদদের ‘ক্রিমিনাল রেকর্ডের’ কথা উল্লেখ করা হয়। রায়ে আরও বলা হয় যে বর্তমানে সাংসদেরা আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত সংসদীয় বিতর্কে কম আগ্রহী। ফলে বর্তমানে সংসদে যেসব আইন প্রণীত হয়, সেগুলো ত্রুটিযুক্ত ও নিম্নমানের। এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘The above observations by the High Court Division regarding the members of Parliament are totally uncalled for and we do not endorse this view at all.’ (হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক সাংসদদের এমন সমালোচনা সম্পূর্ণরূপে অবাঞ্ছিত এবং আমরা তা সমর্থন করি না।)

তবে হাইকোর্ট কর্তৃক ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর মাননীয় সাংসদদের এ বিষয়ে অসংসদীয় ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রকে এখনো অপরিপক্ব বলে মন্তব্য করেন। লক্ষণীয় যে তিনি আমাদের বর্তমান সংসদকে নয়, বরং গত ৪৬ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে সংসদীয় গণতন্ত্রকে অপরিপক্ব বলেছেন। প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সাংসদদের নিরঙ্কুশভাবে বাক্স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যদিও এটি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলামের মতে, বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, ২০১২)। এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে (ধারা: ৫৩, ৬৩, ১৩৩) রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতিদের সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা করার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর অনেক সাংসদ বিচারকদের নিয়ে সংসদে অনেক অশালীন বক্তব্য দেন।

পুরো রায়টি পড়লে পাঠকের কাছে এটি সুস্পষ্ট হবে যে যুক্তির দিক থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থাপনা ছিল অনেকটা দুর্বল, যা তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য ও আক্রমণাত্মক আচরণ দিয়ে কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এমনি প্রেক্ষাপটেই প্রধান বিচারপতির রায়ে অনেক রাজনৈতিক বিষয় এসেছে। প্রসঙ্গত, একজন অ্যামিকাস কিউরির বিচারকদের জন্য মর্যাদাহানিকর বক্তব্যে এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো কোনো অ্যামিকাস কিউরির প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশে রায়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়।

পরিশেষে আশঙ্কা যে আমরা অহেতুক একটি সাংবিধানিক সংকটের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যা কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। বিচার বিভাগ, সংসদ ও নির্বাহী বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করালে তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক নষ্ট হবে, যা সব বিভাগকেই দুর্বল করবে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। আর রাষ্ট্র দুর্বল হলে নাগরিকের স্বার্থহানি নয়। তাই এই আত্মঘাতী পথ থেকে আমাদের সবাইকে বিরত থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২৭ আগস্ট ২০১৭

No comments:

Post a Comment