Aug 29, 2017

সিইসির একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংবিধান পরিপন্থী

নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ উপলক্ষে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে, যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বক্তব্য দেন। প্রথম আলোর (১৬ জুলাই ২০১৭) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনে অন্য কমিশনারদের না জানিয়ে সিইসি ও সচিব মিলে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল হুদা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এটা তো তালুকদার (নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার) সাহেব জানেন। এটা তালুকদার সাহেবের প্রোডাক্ট।’ সিইসি দাবি করেন, কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। এখানে কমিশনারদের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো কমিশনারের জানারও দরকার নেই।


সিইসির বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে সাম্প্রতিক কালে কমিশনের কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশনে একটি প্রবল মতদ্বৈধতা বিরাজ করছে, যা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। আরও অনাকাঙ্ক্ষিত যে সিইসি দাবি করছেন, কর্মকর্তা বদলির ব্যাপারে অন্য কমিশনারদের জানারও অধিকার নেই। আমরা মনে করি, সিইসির এ দাবি বিদ্যমান আইন, এমনকি আমাদের সংবিধানের সঙ্গেও অসংগতিপূর্ণ।

প্রসঙ্গত, মাননীয় সিইসি প্রকাশ্যে যে ভাষায় (তালুকদার সাহেবের প্রোডাক্ট) একজন সহকর্মীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। আমি নুরুল হুদাকে বহুদিন থেকেই চিনি। বিএনপি সরকার তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করলেও তিনি একজন সৎ ও সজ্জন ব্যক্তি। এ ছাড়া তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তালুকদার সাহেবের মতো একজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্যের প্রতি এমন আচরণ তাঁর জন্য বেমানান বলে আমি মনে করি।

আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের নির্দেশনা দেওয়া আছে। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে কমিশনকে চারটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেগুলো হলো ১. রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান, ২. জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান, ৩. ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ ও ৪. নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য কমিশনকে অগাধ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিধিবিধান অনুপস্থিত বা অস্পষ্ট, সেখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের খাতিরে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে আইনি বিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করার অধিকারও দিয়েছেন [আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাসেম মামলায় ৪৫ ডিএলআর (এডি) (১৯৯৩)]।

অনেকেরই মনে আছে যে অতীতে নির্বাচন কমিশনের কোনো স্বতন্ত্র সচিবালয় ছিল না, কমিশনের সচিবালয় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের অনেকের বহুদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কমিশনকে সহায়তার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯-এর মাধ্যমে কমিশনের একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনের প্রস্তাবনায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এটি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উহার জন্য একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন’।

আর এই স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একজন সচিবসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে। অনেকের আরও স্মরণ থাকার কথা যে কমিশন যাতে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে, সে লক্ষ্যে অনেকের পক্ষ থেকেই কমিশনের জনবল বৃদ্ধির দাবি ওঠে এবং সে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড. হুদা কমিশনের আমলে কমিশনে বেশ কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ পান। এসব নিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা। বস্তুত, কমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বই হলো কমিশনকে সহায়তা প্রদান। তাই তাঁদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির এখতিয়ার কমিশনের হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, কমিশনেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। কমিশনের সচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তার ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি। অর্থাৎ কমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘বস’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন।

তবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনের ৫(১) ধারা অনুযায়ী ‘সচিব নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হইবেন’। আইনের ৪(১৩) (খ) উপধারা অনুযায়ী সচিবের দায়িত্ব ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা’। এ ছাড়া আইনের ৪(১৩) (ছ) উপধারাতে সচিবকে ‘মাঠপর্যায়ের অফিসারসমূহের প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণে’র দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। আর সচিবের এসব দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্য হলো সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনকে সহায়তা প্রদান। আইনের ৪(১) ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সকল সাচিবিক দায়িত্ব পালন করিবে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক উহার উপর অর্পিত অন্যান্য যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করিবে।’ অর্থাৎ সচিবেরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি কমিশনের কাছে দায়বদ্ধ।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনে নির্বাচন কমিশনের কাছে এ দায়বদ্ধতার কথা আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। আইনের ১৪(১) ধারা অনুযায়ী, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সচিব প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিকট দায়ী থাকিবেন।’ অর্থাৎ আইনে সচিবকে সুস্পষ্টভাবে কমিশনের কাছে দায়বদ্ধ করা হয়েছে, যদিও সিইসির মাধ্যমে। তাই সিইসির অন্য কমিশনারদের পাশ কাটিয়ে সচিবকে নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার নেই, কারণ কমিশন একটি যৌথ সত্তাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান [জাতীয় পার্টি বনাম ইলেকশন কমিশন {৫৩ ডিএলআর (এডি) (২০০১)}]।

এমনকি অন্য কমিশনারদের বাদ দিয়ে সিইসি এককভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নিতে পারেন না। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ধারা ৪ অনুযায়ী ‘কমিশন উহার চেয়ারম্যান বা উহার কোনো কর্মকর্তাকে এই আদেশের অধীন উহার সকল বা যে কোনো কর্তব্য বা দায়িত্ব পালন করিবার জন্য ক্ষমতা অর্পণ করিতে পারিবে’। অর্থাৎ পুরো কমিশন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব না দিলে তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। জাতীয় পার্টি বনাম ইলেকশন কমিশন মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অধীনে যেকোনো দায়িত্ব পালন বা ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অবশ্যই কমিশন থেকে ক্ষমতা প্রাপ্ত হতে হবে, অন্যথায় তাঁর কার্যক্রম এখতিয়ার–বহির্ভূত হবে’।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি বিখ্যাত রায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতার পরিধি আরও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে। পাঠকদের কারও কারও হয়তো জানা আছে যে ভারতের স্বনামধন্য সিইসি টি এন সেশন একসময় সিইসি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র কমিশনার ছিলেন। ভারত সরকার ১৯৯৩ সালে আরও দুজনকে কমিশনে নিয়োগ দেয়, যা জনাব সেশন মেনে নেননি। ফলে কমিশনে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং সিইসি নিজে একাধিক উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট একটি প্রাথমিক আদেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিইসির একক ক্ষমতার এবং কমিশনের কর্মকর্তাদের এককভাবে নির্দেশনা দেওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি দিলেও চূড়ান্ত রায়ে তা খারিজ করে দেন। আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেন যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কমিশনের সভাপতি এবং ‘...সভাপতির দায়িত্ব হবে সভায় সভাপতিত্ব করা, নিয়মকানুন বজায় রাখা, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা, সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও লিপিবদ্ধকরণ নিশ্চিত করা এবং এর কার্যক্রম নির্ঝঞ্ঝাটভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে যা কিছু প্রয়োজন তা করা। ...তাঁর দায়িত্ব হলো সভায় এমনভাবে আচরণ করা, যাতে তিনি তাঁর সহকর্মীদের আস্থা ও সম্মতি অর্জন করতে পারেন। একজন সভাপতি এটি অর্জন করতে সক্ষম হবেন না, যদি তিনি কমিশনের অন্য সদস্যদের তার অধস্তন মনে করেন...যদি সিইসিকে ঊর্ধ্বতন হিসেবে ধরে নেওয়া হয় এই অর্থে যে তাঁর কথাই চূড়ান্ত, তাহলে তিনি পুরো কমিশনকেই অকার্যকর ও আলংকারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন।’ প্রসঙ্গত, নির্বাচন–সংক্রান্ত ভারতীয় ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধান—যথাক্রমে অনুচ্ছেদ ৩২৪ এবং ১১৯ (১)—প্রায় একই রকম।

পরিশেষে, যেহেতু আমাদের নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তাই কমিশনকে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে হয় না। কমিশনের জবাবদিহি মূলত এ দেশের জনগণের কাছে এবং দায়িত্ব জনগণের পক্ষে এবং স্বার্থে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। সুতরাং, কমিশনকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের কমিশন থেকে তা-ই আশা করি।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০১৭

No comments:

Post a Comment