Aug 28, 2017

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের উত্থান

বাংলাদেশের ইতিহাসে সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থানের সর্ববৃহৎ আলামত দৃশ্যমান হয় ২০০৫ সালে জেএমবির ৬১টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। গত ১২ বছরে সারা দেশে ছোট-বড় আরও অনেক সশস্ত্র জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনা ঘটে গত বছরের ১ জুলাইয়ে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয়। সেখানে ৫ জঙ্গিসহ ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। গত কয়েক মাসে সিলেটের আতিয়া মহলসহ আরও কয়েকটি স্থানে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে, যাতে বহু ব্যক্তি হতাহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।

বিস্মিত হওয়ার কারণ হলো, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি।
অনেকের ধারণা, জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বাউল লালন যে দেশের মানুষের মানস গড়ে তুলেছেন, রবীন্দ্র-নজরুল যাদের প্রেরণার উৎস এবং সুফিবাদ যাদের বিশ্বাসের অংশ, তাদের পক্ষে উগ্রবাদের পথে হাঁটা অসম্ভব। অনেকের মতে, বাঙালির মনন-মানসেই সহনশীলতা ও প্রগতিশীলতার বীজ লুক্কায়িত আছে, জঙ্গিবাদ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যদিও বহুলাংশে আমাদের ‘মুসলিম আইডেনটিটি’ বা মুসলিম পরিচিতির ভিত্তিতে পাকিস্তানের সৃষ্টি, কিন্তু পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের মুসলিম পরিচিতি ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়েছে। বস্তুত, ষাটের দশকে মুসলিমের পরিবর্তে বাঙালি পরিচিতিই এ দেশের মানুষের জন্য মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমাদের পরিচিতিতে এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনই বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের ফলেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল স্তম্ভের একটি হলো অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা, যাকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছি। এই স্বীকৃতির পেছনে আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যকার পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন ও বিদ্বেষের তথা সাম্প্রদায়িকতার চিরতরে অবসান ঘটানো। আশা করা হয়েছিল, এর অবসান ঘটলেই আমরা ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগত পরিচিতি–নির্বিশেষে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারব।

আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় ছিল যে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি এবং একই সঙ্গে বহু গর্বের বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের বাঙালি পরিচিতির প্রতি যেকোনো ধরনের হুমকি ঠেকাতে সক্ষম হবে। এই বিশ্বাস থেকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের লক্ষণগুলোকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখিনি। আমাদের ধারণা হয়েছে, উদার অসাম্প্রদায়িকতার, রূপক অর্থে, একটি ‘টাইটানিক: দ্য আনসিঙ্ক্যাবল’ আমরা তৈরি করে ফেলেছি, যা যেকোনো ধর্মান্ধতার আগ্রাসনের ধাক্কা থেকে আমাদের রক্ষা করবে। তবে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে যেন আমাদের মনমানসিকতায় এক বিরাট পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। আমরা ক্রমাগতভাবে ধর্মাশ্রয়ী হয়ে পড়তে থাকি। ফলে বাঙালি পরিচিতির পরিবর্তে আবারও আমাদের জন্য মুসলিম পরিচিতি মুখ্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, পাকিস্তান আমলে যদিও বাঙালি পরিচিতি ছিল আমাদের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে মুসলিম পরিচিতি হয়ে পড়েছে ক্রমেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক জরিপে এ পরিবর্তন ধরা পড়েছে। প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক কালে বিশ্বব্যাপী ধর্মাশ্রয়ী মানসিকতার যে উন্মেষ ঘটেছে, আমাদের এই পরিবর্তিত ধর্মভিত্তিক পরিচিতি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।

আমাদের পরিচিতিতে এ ধরনের বিরাট পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরপরই আমাদের মুসলিম পরিচিতিতে প্রথম সামনে আসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন সৃষ্টি ও ওআইসির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের মুসলিম পরিচিতিকে মুখ্য করে তোলার আরও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তুলে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এই সময়ে আমাদের দেশে মাদ্রাসাশিক্ষার, বিশেষত কওমি মাদ্রাসার ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের প্রসারমান মুসলিম পরিচিতি ও ধর্মান্ধতা সৃষ্টিতে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আশির দশকে আফগানিস্তানে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ মুজাহিদিনের সৃষ্টি করা হয়, যারা সোভিয়েত দখলদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশিও এ যুদ্ধে অংশ নেয়। আফগানিস্তান–ফেরত এসব বাঙালি যোদ্ধা ইসলামের উগ্র জেহাদি ব্যাখ্যা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। তারাই প্রথম স্লোগান তোলে ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। এরাই গড়ে তোলে হুজির মতো সংগঠন। এসব সংগঠন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি, বিশেষত এরশাদ সরকারের সমর্থন ও আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে থাকে।

এমনকি ১৯৯০ সালের এরশাদের পতন এবং গণতান্ত্রিক শাসনের পুনঃপ্রবর্তনের পরও উগ্রবাদী শক্তির প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন অব্যাহত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এই শতকের শুরুর দিকে রাজশাহী অঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান ঘটেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। এমনকি দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান প্রবক্তা আওয়ামী লীগও ২০০৬ সালে ধর্মাশ্রয়ী খেলাফত মজলিসের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন ও আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করতে হতো। উল্লেখ্য, ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে ওই চুক্তি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট সরকার ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করার সময়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি বহাল রাখে। একই সংশোধনীতে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাও পুনর্বহাল করা হয়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে কোনো বিশেষ ধর্মকে আলাদা মর্যাদা বা পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান অসংগত হলেও সরকার বিভিন্নভাবে তা করে আসছে। সৌদি সরকারের সহায়তায় দেশের জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক ঘোষণা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে সরকারের নতজানু নীতিও এ ব্যাপারে আরেকটি দৃষ্টান্ত।

আমাদের ধর্মভিত্তিক পরিচিতি বিস্তারের পেছনে সরকারি ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও কাজ করেছে। কোনো কোনো সম্প্রচারমাধ্যমে এমন বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে ও হচ্ছে, যেগুলো অনেক সময় সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়াতে ভূমিকা পালন করছে। ব্যবসায়ীরা সাবান বিক্রির ক্ষেত্রেও তা হালাল কি না, সেটা আলাদা করে ঘোষণা করছেন। অন্যদিকে বন্ধ হয়েছে যাত্রাপালা, নাটকের মতো সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার অনুষ্ঠান। উপরন্তু, অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি হেয় মনোভাব আমাদের অনেক শিশু যেন তাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যায়, যা তাদের জন্য পরিণত বয়সে জঙ্গিবাদের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অকার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, দমন-পীড়ন, অপশাসন ও জনসাধারণের বঞ্চনাও ‘রাজনৈতিক ইসলামে’র প্রতি একশ্রেণির ধর্মাশ্রয়ীর আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। এ সবই আমাদের ধর্মভিত্তিক পরিচিতি বিস্তারের পালে আরও হাওয়া জুগিয়েছে, যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক কালে পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ, সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারের মাধ্যমে।

ধর্মীয় উন্মাদনার প্রতি বহুমুখী পৃষ্ঠপোষকতার কারণে উগ্র ধর্মাশ্রয়িতার একটি ‘আইসবার্গ’ বা হিমশৈল যেন আজ আমাদের সামনে তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, পানির ওপরে থাকা হিমশৈলের ক্ষুদ্র অংশই দৃশ্যমান। উগ্র ধর্মাশ্রয়িতার যে অংশ আমরা দেখতে পাই, তা হলো হলি আর্টিজানের মতো ঘটনায় তার উগ্র ও সহিংস প্রকাশ। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা একে ‘নিরাপত্তা ইস্যু’ হিসেবে বলপ্রয়োগের কৌশলের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন। যদিও বলপ্রয়োগ কৌশল নয়, কৌশলের অংশমাত্র। কিন্তু ক্রমবর্ধমান পৃষ্ঠপোষকতার কারণে হিমশৈলের পানির নিচের অংশ ক্রমাগতভাবেই যেন বেড়ে চলেছে। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষের বিস্তারে এবং সারা দেশে বছরজুড়ে সংঘটিত ‘লো-লেভেল’ বা অপেক্ষাকৃত কম নৃশংস সহিংসতার বিস্তারে, যার বড় অংশই হয়তো এখন আর সংবাদমূল্য বহন করে না।

কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা নিরসনে আমাদের নীতিনির্ধারকদের যেন কোনো মনোযোগ নেই, যদিও বহুমুখী, বিশেষত আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডার কারণে হিমশৈলের নিচের অংশ, অর্থাৎ উগ্র ধর্মাশ্রয়িতা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। এটা আমাদের ধর্মীয় উগ্রবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার প্রতিভূ হিসেবে সৃষ্ট অসাম্প্রদায়িকতার টাইটানিকে সজোরে ধাক্কা মারতে শুরু করেছে। এ ধাক্কার ফলে আমাদের টাইটানিক এখনো ডুবে না গেলেও এতে মনে হয় যেন ফুটো সৃষ্টি হয়েছে এবং পানি উঠতে শুরু করেছে। তাই এখনো মোহভঙ্গ না হলে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না হলে এবং জরুরি ভিত্তিতে উদারনৈতিক ইসলামের পক্ষে ও ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে আমাদের ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৪ মে ২০১৭

No comments:

Post a Comment