Apr 13, 2017

নিরপেক্ষতা: চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন?

গত ৮ ফেব্রুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। নবগঠিত কমিশন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেগুলোর কার্যকরভাবে মোকাবিলা তাঁদের সফল করবে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো: 
কমিশনারদের সংখ্যা: রকিবউদ্দীন কমিশনের আগে কোনো কমিশনেই তিনজনের বেশি সদস্য ছিলেন না এবং তিনজনও অনেক সময় একত্রে কাজ করতে পারেননি। তিনজনের মধ্যে সমন্বয় করা যত সহজ, পাঁচজনের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি দুরূহ। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আশা করি নবগঠিত কমিশন এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে।

কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা: ২০০৮ সালে কমিশনের সচিবালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিযুক্ত করা হয়। আমাদের সংবিধানেও কমিশনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে আইনি বিধানের মাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না। কমিশন নিরপেক্ষ হলেই সব দলের জন্য নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে, কমিশন জনগণের আস্থা অর্জন করবে এবং সবাই নির্বাচনে অংশ নেবে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন না হলে এবং ভোটারদের সামনে বিকল্প না থাকলে তাকে নির্বাচন বলা যায় না। কারণ, ‘নির্বাচন’ মানেই বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া। এ ছাড়া, কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব শুধু নির্বাচন করাই নয়, বরং যথাসময়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান।
প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ: নির্বাচন কমিশন নিয়োগ বিধিমালায় কমিশনের সচিব থেকে শুরু করে জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা পদে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে বদলি করার বিধান রয়েছে। আর প্রেষণের মাধ্যমে সরকার পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের কমিশনের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে, যা অতীতে ঘটেছে। তাই কমিশনের জন্য নতুন ক্যাডার সৃষ্টি করা আবশ্যক।
সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা: শামসুল হুদা কমিশনের নেতৃত্বে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়েছিল, যেগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুজন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছিল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রণীত ‘দিনবদলের সনদে’ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী সংস্কার–প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছিল। রকিবউদ্দীন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। নবগঠিত কমিশনের সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন: সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হলে আইনি কাঠামোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন: (১) ‘না-ভোট’-এর বিধানের পুনঃপ্রবর্তন; (২) মনোনয়নপত্র অনলাইনে দাখিলের বিধান; (৩) সংসদের সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা ও আয়কর বিবরণী দাখিলের বিধান; (৪) স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে প্রদান; (৫) রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্যদের নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদ করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি ইত্যাদি।
আইনের প্রয়োগ: সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিধিবিধানের সংস্কার করলেই হবে না, সেগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগও করতে হবে। যেমন, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য তৃণমূল থেকে প্যানেল তৈরির বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতা প্রায় সব দলই উপেক্ষা করে আসছে। নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করার বিধানের প্রতিও দলগুলো ভ্রুক্ষেপ করছে না। এ ছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দলগুলো মানছে না। প্রার্থী ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকেরা মানছেন না নির্বাচনী আচরণবিধিও। কমিশন প্রায় সব ক্ষেত্রেই নির্বিকার।
ভোটার তালিকা: নির্ভুল ভোটার তালিকা সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। ২০০৮ সালে তৈরি ভোটার তালিকায় পুরুষের তুলনায় ১৪ লাখের বেশি নারী ভোটার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পরে তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ‘জেন্ডার-গ্যাপ’ দেখা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ হালনাগাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ লাখ নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার কথা, যার মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ জেন্ডার-গ্যাপ ২০ শতাংশ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৩ জানুয়ারি ২০১৭)। প্রসঙ্গত, প্রায় ৪৭ লাখ নতুন ভোটার ২০১৪ সালের হালনাগাদে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন এবং তখন জেন্ডার-গ্যাপ ছিল ১২ শতাংশ। আমাদের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের হার প্রায় সমান সমান। আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, যাঁদের প্রায় সবাই পুরুষ এবং অধিকাংশই ভোটার নন। তাই এটি সুস্পষ্ট যে হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় অনেক যোগ্য নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ: নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের একটি বড় লক্ষ্য হলো সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় যতটা সম্ভব সমতা আনা। দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর ফলে ভোটার সংখ্যায় অসমতা আরও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর ২০০৮ সালে যেখানে গড় ভোটার সংখ্যার ২১ শতাংশের মধ্যকার আসনসংখ্যা ছিল ৮৩, সেখানে ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০২টিতে।
মনোনয়ন: ২০০৮ সালে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা আরপিওতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য একটি প্যানেল তৈরি করার এবং সেটি থেকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দেওয়ার বিধান ছিল। নবম সংসদ কর্তৃক অধ্যাদেশটি সংশোধনের ফলে মনোনয়ন বোর্ডকে আর তৃণমূলে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দিতে হবে না, প্যানেলটি বিবেচনায় নিতে হবে মাত্র। তাই সংসদ নির্বাচনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সমস্যা রয়েই গেছে।
হলফনামা: সুজন-এর প্রচেষ্টায় প্রায় সব নির্বাচনেই প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, ফৌজদারি মামলার বিবরণ, সম্পদের হিসাব ইত্যাদি প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে হলফনামার ছকে গুরুতর সীমাবদ্ধতার কারণে প্রার্থীদের তথ্য গোপন করার সুযোগ থেকে গেছে। আর হলফনামার তথ্য কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীর প্রার্থিতা কিংবা তাঁদের নির্বাচন বাতিল করলে অনেক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রেখে আমাদের রাজনীতিকে বহুলাংশে কলুষমুক্ত করা সম্ভব হবে।
নির্বাচনী ব্যয়: নির্বাচনী ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আমাদের নির্বাচনকে এখন টাকার খেলায় পরিণত করেছে এবং আমাদের গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন উত্তম গণতন্ত্র। মনোনয়ন-বাণিজ্য আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আজ অনেকটা প্রহসনে পরিণত করে ফেলেছে। তাই নতুন কমিশনকে এসবের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ সীমা কমাতে হবে, যাতে ভোটাধিকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎস: রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের একটি বড় চালিকাশক্তি হলো রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন। তাই রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী ভারতে এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসা: সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত মীমাংসা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায় নির্বাচনী মামলাই সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিষ্পত্তি হয় না, যা নির্বাচনী অপরাধকেই উৎসাহিত করে। এ লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।
সহিংসতা রোধ: শামসুল হুদা কমিশনের সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশনের মেয়াদকালে নির্বাচনী সহিংসতা বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছায়। যেমন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। তাই নতুন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী সহিংসতা রোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আইন ও বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা: রকিবউদ্দীন কমিশন আইনকানুনের প্রতি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদের ক্ষেত্রে যে কয়েকটি সুস্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার সবগুলোই রকিবউদ্দীন কমিশন অমান্য করেছে (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য তাঁদের উচ্চ আদালতে ক্ষমা প্রার্থনাও করতে হয়েছে। এদিকেও কমিশনের নজর দিতে হবে।
আইন প্রণয়ন: সাংবিধানিক নির্দেশনা সত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগসংক্রান্ত কোনো আইন আমাদের নেই। শামসুল হুদা কমিশন এ লক্ষ্যে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে রেখে গিয়েছে, যেটি সম্পর্কে রকিবউদ্দীন কমিশন কোনো রকম আগ্রহই দেখায়নি। ভবিষ্যতে কমিশনে নিয়োগে বিতর্ক এড়ানোতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে নতুন কমিশনকে আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত এবং এটিকে আইনে পরিণত করতে উদ্যোগী হতে হবে।
সরকারের ও রাজনৈতিক দলের সদাচরণ: সবচেয়ে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও সাহসী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়, যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সদিচ্ছা প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল আচরণ না করে। বস্তুত, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত বা ‘নেসেসারি কন্ডিশন’, কিন্তু যথেষ্ট বা ‘সাফিসিয়েন্ট কন্ডিশন’ নয়। তাই দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি মতৈক্য আজ জরুরি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতে বিতর্কিত নির্বাচন এড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আশা করি, নবগঠিত কমিশন তাদের সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হবে। আর তারা সফল না হলে এর দায় সরকার ও অনুসন্ধান কমিটিকেও নিতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৬ মার্চ ২০১৭

No comments:

Post a Comment