Apr 13, 2017

নির্বাচন কমিশন: স্বচ্ছতাই উত্তম পথ

গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ২৫টি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ১২৫টি নামের মধ্য থেকে ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেছে। তাদের পরবর্তী সভায় এই তালিকা থেকে আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর সর্বোচ্চ ১০ জনের নাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে। 
আশা করা যায়, রাষ্ট্রপতি এই তালিকা থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেবেন, তা না হলে অনুসন্ধান কমিটির উদ্দেশ্যই ভন্ডুল হয়ে যাবে। আমরা খুশি হতাম যদি কমিটি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নাম প্রস্তাবের সুযোগ দিত। কারণ, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, সব নাগরিকের বিষয়। সব নাগরিকই এতে অংশীজন। 

আমরা জানি না, সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে অনুসন্ধান কমিটি কী কী মানদণ্ড ব্যবহার করেছে। আমন্ত্রিত হয়ে আমরা অনেকেই অনুসন্ধান কমিটিকে নাম বাছাইয়ের জন্য যোগ্যতা-অযোগ্যতার কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলাম। আশা করি, কমিটি তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ব্যবহার করেই বস্তুনিষ্ঠভাবে তাদের বাছাই চূড়ান্ত করবে। 
আমরা অনেকেই অনুসন্ধান কমিটিকে তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশেরও পরামর্শ দিয়েছিলাম। আরও পরামর্শ দিয়েছিলাম তালিকা প্রকাশের আগে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের অনুমতি নিতে, যাতে যাঁরা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী নন, তাঁদের সংবিধান স্বীকৃত গোপনীয়তার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৪৩) যেন ক্ষুণ্ন না হয়। যাঁরা কমিশনে নিয়োগ পেতে আগ্রহী, শুধু তাঁদের নামই প্রকাশ করা আবশ্যক, যাতে নাগরিকেরাও তাঁদের ব্যাপারে মতামত দেওয়ার সুযোগ পান। তবে তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন দল কার নাম প্রস্তাব করেছে, তা চিহ্নিত করা সমীচীন হবে না। 
এটি সুস্পষ্ট যে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকেই অনুসন্ধান কমিটির কাজ সম্পর্কে আস্থাশীল হতে পারছেন না। কারণ, এই ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। যেমন, অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমেই আমরা রকিবউদ্দীন কমিশনের মতো একটি আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন পেয়েছি, যে কমিশন আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনমনে ব্যাপক আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। আরেকটি করুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে। বেশ কয়েক বছর 
আগে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশে মানবাধিকার কমিশনে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁর সম্পর্কে ছাত্রী হয়রানির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, যা একটু খোঁজখবর নিলেই জানা যেত। নিয়োগপ্রাপ্তির অব্যবহিত পরেই অবশ্য সেই ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া হয় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ না করেই, বলতে গেলে অন্যায়ভাবেই। প্রসঙ্গত, তখনকার বিরাজমান বিধান অনুযায়ী শুধু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমেই মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের বাদ দেওয়া যেত। তাই অনেকের মনে এই ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক যে অতীতে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা ছিল অনেকটা লোক দেখানো এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকার অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল ‘আমার কাজ আমি করমু, তোরে শুধু জিগ্গাই লমু’—মানসিকতা থেকে। 
এই আস্থার সংকট দূর করতে হলে অনুসন্ধান কমিটিকে অবশ্যই নাগরিকদের আস্থায় নিতে হবে। এই আস্থায় নেওয়ার একমাত্র পন্থা হলো সংক্ষিপ্ত তালিকার নামগুলো কমিটির চূড়ান্ত বাছাইয়ের আগে প্রকাশ করা এবং গণশুনানির মাধ্যমে অথবা অন্তত একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁদের মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া। আর এর মাধ্যমেই ‘ভোটসর্বস্ব গণতন্ত্র’র পরিবর্তে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিকে আমরা এগিয়ে যাব। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তখনই সুগম হয়, যখন যেসব সিদ্ধান্ত নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে সেগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা অংশ নিতে পারে। আর নিঃসন্দেহে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ভোটসর্বস্ব গণতন্ত্র থেকে উত্তম। কারণ, ভোটসর্বস্ব গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নাগরিকদের ভূমিকা শুধু নির্বাচনের দিনে ভোট প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। 
সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের নাম প্রকাশিত হলে গণমাধ্যমের পক্ষেও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হবে। আর নাম প্রকাশ তথা স্বচ্ছতার সুফল তো বর্তমান কমিটি হাতে হাতেই পেয়েছে। যে পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে অনুসন্ধান কমিটি দ্বিতীয় দফায় মতবিনিময় করতে চেয়েছিল, তাঁদের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই এটি সুস্পষ্ট হয় যে কমিটির সিদ্ধান্তটি সঠিক 
ছিল না এবং একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম তাদের তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই আমেরিকান বিচারপতি লুইস ব্রান্ডাইসের ‘Sunlight is the best disinfectant’ উক্তির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া নাম প্রকাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে দুষ্টলোকেরা এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকবে বা তাদের দূরে রাখা যাবে, যার ফলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কলুষমুক্ত হওয়ার পথ সুগম হবে। তাই স্বচ্ছতাই হলো উত্তম পন্থা। 
শুধু নাম প্রকাশই নয়, অনুসন্ধান কমিটিকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করাও আবশ্যক। যেকোনো চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে, এমনকি ছোট চাকরির ক্ষেত্রেও চাকরিপ্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। বড় চাকরি হলে তো সাধারণত একাধিকবার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। আর অতীতের সাক্ষাৎকার গ্রহণ না করেই নাম সুপারিশের অভিজ্ঞতা আমাদের সুখকর নয়। তাই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা অনুসন্ধান কমিটির ‘অনুসন্ধানের’ অংশ হওয়া উচিত। আর এর মাধ্যমেই কমিটির ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ প্রদর্শিত হবে। ডিউ ডিলিজেন্স একটি আইনি কনসেপ্ট এবং অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ যত্ন ও সতর্কতা প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য যা করা সম্ভব তা করার প্রদর্শনের মাধ্যমেই তা প্রতিভাত হবে। ‘ব্ল্যাক ল ডিকশনারি’তে এর কেতাবি সংজ্ঞা দেওয়া আছে। প্রসঙ্গত, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকপাল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। 
জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য কমিটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা নামগুলোর পাশাপাশি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রকাশ করাও আবশ্যক। প্রতিবেদনে কমিটির বাছাই করা নামগুলো কেন এবং কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে সুপারিশ করা হয়েছে, তা লিপিবদ্ধ থাকবে। আরও থাকবে বিশিষ্টজনদের পরামর্শ কীভাবে এবং কতটুকু কমিটি গ্রহণ করেছে, তার বিবরণ। এ ধরনের স্বচ্ছতার চর্চার মাধ্যমেই গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভাঙবে এবং জনগণের আস্থা অর্জিত হবে। আর জনগণের আস্থা অর্জিত হলেই রাজনৈতিক দলগুলোও কমিটির সুপারিশ এবং রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে। 
পরিশেষে, আশা করি অনুসন্ধান কমিটি কতগুলো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করবে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তা করবে। আর তা করলেই আস্থার সংকট কেটে যাবে এবং পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। তবে এভাবে অনুসন্ধান কমিটির সহায়তায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদান একটি অ্যাডহক পদ্ধতি, এটিকে কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে এবং আমাদের স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। আমাদের বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রদানের জন্য সংবিধানে আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে, যা গত ৪৫ বছরে তা করা হয়নি। তাই সব সাংবিধানিক পদে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কার মতো ‘কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিল’ গঠনের কথা গভীরভাবে ভাবতে হবে, যাতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়। 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

No comments:

Post a Comment