Apr 13, 2017

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ: এ রোগের চিকিৎসা জরুরি

আমাদের স্বাধীনতার মাস, মার্চ মাসের শেষ দুই সপ্তাহে সারা দেশে অনেকগুলো নৃশংস জঙ্গিবাদী ঘটনা ঘটে গিয়েছে। গত ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে টানা ১৯ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নারীসহ চার জঙ্গি এবং এক শিশু নিহত হয়। ১৮ মার্চ ঢাকায় র্যাবের সদর দপ্তরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন এবং সেখান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আরেকজন পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা হেফাজতে মারা যায়। ১৮ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁওয়ে র্যাবের নিরাপত্তাচৌকিতে হামলায় এক আত্মঘাতী জঙ্গির মৃত্যু ঘটে। ২৪ মার্চ বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা তল্লাশিতে আত্মঘাতী হামলায় আরেকজন জঙ্গি প্রাণ হারায়।

এ মাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে ২৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১১১ ঘণ্টাব্যাপী সিলেটের আতিয়া মহলে। সেখানে সেনাবাহিনী কমান্ডোসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর দীর্ঘতম অভিযানকালে ১১ জনের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে রয়েছে র্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল আজাদ ও দুজন পুলিশ কর্মকর্তা। এই অভিযানে আহত প্রায় ৪০ জন। এরপর ৩০ মার্চ মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় এক জঙ্গি আস্তানায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মুখে তিন শিশুসহ সাতজন জঙ্গি আত্মঘাতী হয়। পরবর্তী সময়ে ৩১ মার্চ কুমিল্লার কোটবাড়ীর অদূরে জঙ্গি আস্তানায় কেউ হতাহত না হলেও সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে গ্রেনেড, বোমা ও সুইসাইডাল ভেস্ট। এসব ঘটনা থেকে আশঙ্কা হয় যে সারা দেশে জঙ্গি আস্তানা ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করে বিজয়ী হই। কিন্তু আজ আরেকটি অপশক্তির মুখোমুখি হয়ে আমাদের প্রধান দুটি দল একে অন্যকে দোষারোপে ব্যস্ত। সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানা উদ্ঘাটনের পর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপিই জঙ্গিবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পক্ষান্তরে বিএনপির মহাসচিবের মতে, আওয়ামী লীগই জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়ে তা থেকে ফায়দা লুটছে।
জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের অবশ্য বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে জঙ্গিবাদ কঠোর হাতে দমন করা হবে। কিন্তু তাতে আমরা আশ্বস্ত হতে পারছি না, কারণ এমন আশ্বাস ও নিরাপত্তা বাহিনীর সব ধরনের কঠোরতা সত্ত্বেও জঙ্গি তৎপরতা চলছেই। আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে যেন ‘হিমশৈল’-এর মতো আমরা জঙ্গিবাদের শুধু ওপর অংশই দেখতে পাচ্ছি। আশঙ্কা হয় যে জঙ্গিবাদের সমস্যা যে কত ব্যাপক ও বিস্তৃত, তা হয়তো আমরা উপলব্ধিই করতে পারছি না। প্রসঙ্গত, হিমশৈল বা সমুদ্রে ভাসমান বরফের টুকরার শুধু ক্ষুদ্র অংশই দৃশ্যমান।
আমাদের আশ্বস্ত হতে না পারার একটি বড় কারণ হলো জঙ্গিবাদের ভয়ানক নৃশংসতা থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার অপচেষ্টা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই চিরাচরিত ‘ব্লেম গেম’ চালিয়েই যাচ্ছে। তবে বিএনপি তা করে পার পেয়ে গেলেও, আওয়ামী লীগ তা পারবে না। কারণ আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় এবং জঙ্গি দমন ক্ষমতাসীনদেরই দায়িত্ব।
নাগরিক হিসেবে আমাদের আশ্বস্ত হতে না পারার প্রধান কারণ হলো আমরা জঙ্গিবাদ দমনের ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর কৌশল দেখতে পাই না। আমাদের কাছে মনে হয়, আমাদের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিবাদকে যেন নিতান্তই একটি ‘নিরাপত্তা’ ইস্যু হিসেবে দেখছে। তাই তারা শুধু বল প্রয়োগের মাধ্যমেই এর সমাধানের চেষ্টা করছে। এটি এখন সুস্পষ্ট যে শুধু বল প্রয়োগের কৌশল কাজ করছে না, যদিও বহু দিন থেকেই জঙ্গিবাদ দমনের একমাত্র কৌশল হিসেবে এর সীমাবদ্ধতার কথা আমরা বলে আসছি।
আমেরিকানরাই প্রথম প্রমাণ করেছে যে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে শুধু বল প্রয়োগ অকার্যকর। তারা পৃথিবীর সর্বাধিক শক্তিশালী সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে পারেনি। বরং এর মাধ্যমে জঙ্গিবাদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এর ভয়াবহ থাবাই যেন আজ আমাদের ওপর এসে পড়েছে।
আমরা অনেক দিন থেকেই বলে আসছি যে জঙ্গিবাদের মূল উৎপাটন করতে হলে আমাদের একটি সুচিন্তিত বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে, যার একটি হবে শক্তি প্রয়োগ। যারা মানুষ হত্যা করে কিংবা ভয়ানক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং নির্মূল করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে সহিংসতা জঙ্গিবাদের উপসর্গমাত্র, এর কারণ নয়।
উপসর্গের চিকিৎসা করলে যেমন রোগমুক্তি হয় না, তেমনিভাবে শুধু জঙ্গিবাদের উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। যেমন জ্বর হলে প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর একেবারে না সারলে বুঝতে হবে যে জ্বরের পেছনে টাইফয়েড বা ম্যালেরিয়ার মতো অন্য কোনো জটিল রোগ রয়েছে, জ্বর যার উপসর্গমাত্র। রোগী কোন রোগে আক্রান্ত
তা নিরূপণ করতে হলে চিকৎসককে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে। তাই রোগীকে রোগমুক্ত করতে হলে জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্যারাসিটামল দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিতে হবে।
তেমনিভাবে জঙ্গিবাদ দমন করতে হলেও তার ‘রুট কজ’ বা মূল কারণ চিহ্নিত করতে হবে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে জঙ্গিরা একটি ‘আদর্শ’ দ্বারা চালিত। তারা ধর্মভিত্তিক ভিন্ন ধরনের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং তা করার জন্য তারা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। প্রাণ দেওয়ার আকর্ষণ হলো পরকালে প্রাপ্ত প্রতিদান, ইহকালে নয়। আমাদের আরও স্বীকার করতে হবে যে শুধু দারিদ্র্য ও মাদ্রাসায় পড়ুয়ারাই এর সঙ্গে যুক্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। নারীরাও এতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে গিয়েছেন। আমাদের পুরো ‘ইন্টারনেট জেনারেশন’, যা দিন দিন দ্রুতগতিতে বাড়ছে, এর ঝুঁকিতে রয়েছে। আরও ঝুঁকিতে রয়েছে, সেসব তরুণ বাল্যকাল থেকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষের মনোভাব নিয়ে বড় হয়।
ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি আমাদের জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করতে হবে। বুঝতে হবে কী ধরনের মানসিকতা ও হতাশা তাদের জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত করছে। তবে জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক কিছু ঘটছে, যা জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল পরিস্থিতি, আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান ইত্যাদি মুসলিম বিশ্বে জঙ্গিবাদ বিস্তারের অন্যতম চালিকাশক্তি। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের
মতো পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নেতার মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বরও অনেককে জঙ্গিবাদের দিকে আকৃষ্ট করছে। দুর্ভাগ্যবশত
জঙ্গিবাদ বিস্তারে এসব বাহ্যিক প্রভাবের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
তবে আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমরা অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই যে দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান আর্থসামাজিক অবস্থা জঙ্গিবাদ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, সারা চেইস নামক এক সাংবাদিক, যিনি বর্তমানে মার্কিন থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট অব পিসে’ কর্মরত, তাঁর বহুল আলোচিত থিবস অব স্টেট গ্রন্থে দাবি করেছেন যে আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থানের পেছনে রয়েছে, সৃষ্টিতে নয়, কারচুপির নির্বাচন, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং পদে পদে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা। দুর্ভাগ্যবশত এমন পরিস্থিতি আমাদের দেশেও বিরাজমান, যা জঙ্গিবাদ বিস্তারের জন্য উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছে।
এ ছাড়া উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা, হয়রানি ও উগ্রবাদের পৃষ্ঠপোষকতা। দুর্ভাগ্যবশত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বহু ব্যক্তির জীবন ও জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে তারা জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনেরা বরাবরই উগ্রবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়েই জেএমবি তার তাণ্ডব চালিয়েছে। বর্তমানেও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি সরকারের আপসমূলক মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অতীতে এসবের পরিণতি মঙ্গলজনক হয়নি, ভবিষ্যতেও তা হবে না। তাই আজ আমাদের জন্য জঙ্গিবাদের উপসর্গের চিকিৎসা ও পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে রোগের চিকিৎসাও জরুরি হয়ে পড়েছে। আরও জরুরি হয়ে পড়েছে বল প্রয়োগের পাশাপাশি একটি উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশে সবাইকে নিয়ে সামাজিকভাবে এদের প্রতিরোধ করা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ০৫ এপ্রিল ২০১৭

No comments:

Post a Comment