Apr 13, 2017

বাংলাদেশ ও রাজনীতি: আন্তদলীয় ও অন্তর্দলীয় সহিংসতার বিপদ

রাজনীতিতে মতদ্বৈধতা, বিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকবেই। এমনকি রাজনীতির গতি-প্রকৃতি যেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয় এবং মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্য বিরাজ করে, সেখানেও দ্বন্দ্ব-বিরোধ থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সহিংসতায় রূপ নেয়, যা নাগরিকদের জন্য চরম অকল্যাণ বয়ে আনে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ব্যাপকভাবে বিরাজমান এবং অনেক ক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব সহিংসতায় রূপ নেয়। আমাদের দেশে এমনকি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাজনৈতিক ঐক্য অনুপস্থিত (যদিও বারবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির লক্ষ্য, তাদের আচার-আচরণ ও কার্যক্রমে অনেক মিল রয়েছে), যার কারণেও দলগুলোর মধ্যে আন্তদলীয় সহিংসতা বিরাজমান।
শুধু এক দলের সঙ্গে অন্য দলের নয়, দ্বন্দ্ব-হানাহানি অব্যাহত রয়েছে দলগুলোর, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরেও। আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-হানাহানি আমাদের আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে এবং এটি অব্যাহত থাকলে আমরা ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারি। তাই রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটানো আজ আমাদের জন্য জরুরি। তবে সহিংসতার অবসান ঘটাতে হলে এর স্বরূপ, ধরন ও কারণ উদ্ঘাটন করা আবশ্যক।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব ভয়ানক হানাহানিতে রূপ নেয় এবং ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। এরপর ২০১৫ সালেও পেট্রলবোমা হামলাসহ সহিংসতার কারণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও গত তিন বছরে বহু ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে, আহত হয়েছে এবং অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার প্রায় সবই ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। উদাহরণস্বরূপ গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকালে প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে, যাঁদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের মধ্যকার অন্তর্দলীয় মারামারিতে আরও অনেক প্রাণ অকালে এবং অহেতুকভাবে ঝরে পড়েছে। কেন এত সহিংসতা?
আমাদের অব্যাহত ‘ডেমোক্রেটিক ডেফিসিট’ বা গণতন্ত্রের ঘাটতি এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। গণতান্ত্রিক শাসনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয় একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। তবে একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় না। কারণ, ‘নির্বাচন’ মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন, যেখানে ভোটারদের সামনে সত্যিকারের বিকল্প প্রার্থী থাকেন। আজ আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নাগরিকদের কতগুলো অধিকারের নিশ্চয়তা থাকে, যেগুলো তাঁরা উপভোগ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য কতগুলো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। যেমন বাক্স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকার ইত্যাদি। আমাদের দেশে এই সব স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে ভয়াবহভাবে।
তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক শাসনে থাকে ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’ বা ক্ষমতার বিভাজন। আরও থাকে বিরুদ্ধ মত ও কণ্ঠ। বস্তুত বিরোধী দল ও প্রতিবাদী নাগরিক সমাজের অস্তিত্ব ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে বর্তমানে কোনো কার্যকর বিরোধী দল নেই। আমাদের সংসদের বিরোধী দলে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতারা মন্ত্রিসভারও সদস্য, যা এক অভিনব ও সম্পূর্ণ অকার্যকর ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। আর সরকারের নানামুখী দমনপীড়ন এবং নিজেদের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও এখন অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায়। এ ছাড়া নানা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে প্রতিবাদী নাগরিক সমাজও আজ অস্তিত্বের সংকটে।
চতুর্থত, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো দায়বদ্ধতা। দায়বদ্ধতাও আবার দুই ধরনের হয়: নির্বাচনী দায়বদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষে ভোটারদের মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর কতগুলো ক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বিশেষ করে কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান হতে পারে সাংবিধানিক, বিধিবদ্ধ বা রাষ্ট্রবহির্ভূত। আমাদের দেশে এসব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আজ অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে এবং তারা রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পঞ্চমত, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, বিশেষত যেখানে ওয়েস্ট মিনস্টার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, বিরোধী দলও সরকারের অংশ। কিন্তু আমাদের দেশে একটি ‘উইনার-টেক-অল’ বা রাষ্ট্রের সবকিছুই জয়ীদের করায়ত্ত—এমন এক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে। এ ধরনের ব্যবস্থা ‘পার্টিয়ার্কি’ বা দলীয় আনুগত্যের প্রতি সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রাধান্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে শুধু বঞ্চিতই হন না, এমনকি দমনপীড়নের কারণে তাঁরা চরম নিরাপত্তার ঝুঁকিতেও কালাতিপাত করেন। এমন পরিস্থিতিও আমাদের দেশে বিরোধী দলগুলোর দুর্বল অবস্থানের অন্যতম কারণ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এসব ঘাটতির কারণে আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-বিরোধ ক্রমাগতভাবে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিরোধী দলকে ক্রমাগত বঞ্চনা করা, তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর নানা ধরনের চাপ, অসম্মান ও নিপীড়ন আমাদের রাজনীতিতে একধরনের ঘৃণার আবহ সৃষ্টি করে, যা সুযোগ পেলেই সহিংসতায় রূপ নেয়। অর্থাৎ সহিংসতাই আমাদের বিরাজমান ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, মাঝেমধ্যে যার বিস্ফোরণ ঘটে। তবে বর্তমানে একধরনের শান্তি—বলতে গেলে চাপানো শান্তি—বিরাজ করলেও পরিস্থিতি অনেকটা বিস্ফোরণোন্মুখ। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমরা যেন একটি বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, যা এক ভয়াবহ সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
দলের অভ্যন্তরে বিরাজমান দ্বন্দ্ব-বিরোধও আমাদের দেশে ব্যাপক, দিন দিন যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এর একটি কারণ হলো ক্ষমতাধরদের ‘রেন্ট’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপরি আয়ের বিকেন্দ্রীকরণ। আমাদের দেশে অতীতে, বিশেষত সামরিক স্বৈরাচারের আমলে, সব ধরনের রেন্ট ছিল কেন্দ্রীভূত। কিন্তু ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে তা বিকেন্দ্রীকৃত হতে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে ফায়দাতন্ত্র বা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত বা তাদের প্রতি অনুগতদের মধ্যে ফায়দা প্রদানের বৈধ-অবৈধ সুযোগ-সুবিধা বিতরণের চর্চা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় দলের পদ-পদবি কিংবা দলের মনোনয়নে নির্বাচিত পদ পাওয়ার এক অশুভ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় এবং সহিংসতার জন্ম দেয়, যা বর্তমানে বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রসঙ্গত, ফায়দা প্রদানের এ সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে ভয়াবহ নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি করছে। গত কয়েক দশকে ব্যাপক ফায়দাপ্রাপ্তির মাধ্যমে আমাদের দেশে বহু অবাঞ্ছিত ব্যক্তি অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এখন জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত পদ হয় দখল করে নিচ্ছেন কিংবা টাকার বিনিময়ে ‘কিনে’ নিচ্ছেন। এভাবে আজ আমাদের দেশে রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ ও ব্যবসায়ের রাজনৈতিকীকরণ হয়ে গেছে। আমাদের প্রায় সব নির্বাচিত পদ এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত হয়ে পড়েছে, যার ফলে আজ রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হয় জনস্বার্থের পরিবর্তে বহুলাংশে ব্যবসায়িক স্বার্থে এবং ফায়দা প্রদানের লক্ষ্যে। ফায়দাতন্ত্রের কল্যাণে সৃষ্ট নেতৃত্বের একটি বড় অংশ আজ ‘পাবলিক সার্ভিস’ বা জনসেবায় মনোনিবেশ করার পরিবর্তে তাদের পদ-পদবি ব্যবহার করে আরও অধিক অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। এ ছাড়া তঁাদের অনেকের ধারণাই নেই একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে আন্তদলীয় এবং অন্তর্দলীয়, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে সৃষ্ট চাপা ও দৃশ্যমান বিরোধ, দ্বন্দ্ব, ঘৃণা ও হানাহানি আমাদের সমাজকে ক্রমাগতভাবে সহিংস জনপদে পরিণত করছে। আমাদের দুর্বল ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব দ্বন্দ্ব-হানাহানির মীমাংসা করতে পারছে না, যা ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ানক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আর এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, যারা বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক উগ্র রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বিরাজমান পরিস্থিতি তাদের ধর্ম ও বর্ণকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদ বিস্তারের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিচ্ছে। সমাজে ক্রমবর্ধমান ধর্মান্ধতা ও পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষও এতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক হয়রানি ও ক্ষেত্রবিশেষে পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি সহানুভূতিও এতে সহায়তা করছে। তাই সমাজে উগ্রবাদের বিস্তার রোধ করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আমাদের রাজনৈতিক বিরোধ নিরসন করতে এবং ফায়দাতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যা একটি সত্যিকারের ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো,  ১৩ মার্চ ২০১৭

No comments:

Post a Comment