Apr 13, 2017

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন: বল এখন রাষ্ট্রপতির কোর্টে

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে নানা দাবির মুখে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করছেন। গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি সংলাপের শুভ সূচনা করেছেন। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সব দলের সঙ্গে তিনি সংলাপে বসেছেন।
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বাইরেও সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ধরনের সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। সংবিধান সংশোধনও সংস্কার প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রায় সবাই আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগও সংসদে আইন পাস অথবা অধ্যাদেশ জারির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যদিও তারা সময়ের স্বল্পতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। বিএনপি সুস্পষ্টভাবে আইন প্রণয়নের দাবি না করলেও তারা এর বিরোধিতা করেনি।

সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি সব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির কাছে করেছে। সব দলই এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির ওপর আস্থা প্রদর্শন করেছে। আওয়ামী লীগ সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির এবং তারা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন: ‘রাষ্ট্রপতির প্রতি আমাদের আস্থা, বিশ্বাস ও সম্মান আছে। তিনি যা যথার্থ ও সঠিক মনে করবেন, সংবিধান অনুযায়ী যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটি আমাদের বিরুদ্ধে গেলেও আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে’ (প্রথম আলো, ১৫ জানুয়ারি ২০১৭)। তাই বল এখন নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রপতির কোর্টে। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতি এখন কীভাবে বলটি খেলবেন। অর্থাৎ এমতাবস্থায় আমরা কী আশা করতে পারি?
আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে সুখকর নয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে আমাদের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও ২০১১ সালের ডিসেম্বর ও ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। সংলাপের পর তিনি সরকারকে আইন প্রণয়ন অথবা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিপরিষদের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়, যার কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে তখনই দলপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, সেই অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে রকিবউদ্দীন কমিশনের মতো একটি কমিশন আমরা পেয়েছি, যাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপরই আজ জনগণের ব্যাপক আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ স্বাধীন নন। আমাদের সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। তবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর ওপর কিছু শর্ত আরোপ করা আছে। তাঁকে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে কমিশনে নিয়োগ দিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রপতিও আইনের ঊর্ধ্বে নন। আর আইন প্রণয়ন না করে আবারও কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হলে, নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির ওপর আরেকটি শর্ত আরোপ করেছে আমাদের সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ, যাতে শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক কাজ করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য। তাই রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দিলেও কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর। অর্থাৎ নাটাই মূলত প্রধানমন্ত্রীরই হাতে। এই নাটাই ব্যবহার করার ক্ষমতা কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিসর্জন দিয়েছেন?
১১ জানুয়ারি শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করতে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে। তবে শেখ হাসিনার দুটো সত্তা রয়েছে। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের সভাপতিই নন, একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীও। তিনি দলীয় প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন এবং সে সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও কি তাঁর একই অবস্থান? অর্থাৎ সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্তও কি তিনি নিয়েছেন? যদি তা–ই করে থাকেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ব্যাপারে তিনি বড় ধরনের একটি ছাড় দিয়েছেন, যার জন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিষয়টি পরিষ্কার করলে তিনি অনেকের কাছ থেকেই প্রশংসিত হবেন। আশা করি, এ বিষয়ে তিনি একটি ঘোষণা দেবেন।
যদি প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে স্বাধীন। তবে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি আমরা আমাদের দেশে দেখেছি। স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তো রাষ্ট্রপতি পদ থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল। তাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এই ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি কী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মতো একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দিতে পারেন, যে কমিটির সুপারিশে তিনি কমিশনে নিয়োগ দেবেন। এ ধরনের একটি কমিটি গঠনের সংবাদ, রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের বরাত দিয়ে, ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে একটি যথাযথ কমিশন পাওয়ার বিষয়ে যেমন নিশ্চিত হওয়া যাবে না, তেমনি এর মাধ্যমে দেওয়া নিয়োগ বিতর্কমুক্ত হবে না বলেই আমাদের ধারণা।
আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে একদিকে নিজের জন্য ঝুঁকিহীন, অন্যদিকে এটি নিয়ে বিতর্ক এড়াতে রাষ্ট্রপতি বলটি রাজনীতিবিদদের কোর্টে দিয়ে দিতে পারেন। তিনি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে, বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসার এবং নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছার আহ্বান জানাতে পারেন। রাজনীতিবিদেরা একমত হলেই আগামী কয়েক সপ্তাহে একটি যুগোপযোগী আইনও প্রণয়ন করা সম্ভব হবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য কমিশনও গঠন করা যাবে। আশা করি, রাষ্ট্রপতি রাজনীতিবিদদের বোঝাতে সক্ষম হবেন যে রাজনীতির মূল কথা হলো সমঝোতা ও সমস্যার সমাধান। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পরামর্শও নিতে পারেন।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি ২০১৭

No comments:

Post a Comment