Jan 11, 2017

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের মন্ত্রিসভা নাগরিকত্ব আইন ২০১৬-এর একটি খসড়া অনুমোদন করেছে, যা সংসদে পাস হওয়ার অপেক্ষায় আছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায় যে সংসদে খসড়াটি কণ্ঠভোটেই পাস হবে। কিন্তু এই খসড়াটি অপরিপক্ব এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর তুলনায় অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। সর্বোপরি এটি আমাদের সংবিধান ও সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ (ইউডিএইচআর) এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অনসিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’-এর (আইসিসিপিআর) মতো আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যে চুক্তিতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে।
খসড়া আইনের ৪ ধারায় জন্মসূত্রে অর্জিত নাগরিকত্বের শর্তাবলি বিবৃত হয়েছে। অন্যদিকে ধারা ৫ (বংশসূত্রে নাগরিকত্ব), ৬ (প্রবাসীদের নাগরিকত্ব), ৮ (দ্বৈত নাগরিকত্ব), ৯ (সম্মানসূচক নাগরিকত্ব), ১০ (দেশীয়করণ সূত্রে নাগরিকত্ব), ১১ (বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্ব) এবং ১২-তে (ভূখণ্ড সংযোজন সূত্রে নাগরিকত্ব) ইচ্ছাসূত্রে নাগরিক হওয়ার বিধান আছে। ৬ ধারা অনুযায়ী, ‘বিদেশে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি ও শর্তে সরকারের নিকট তাহার আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করিতে পারিবেন, যদি তাঁহার পিতা বা মাতা বা পিতামহ বা মাতামহ তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের পূর্বে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া থাকেন।’ অর্থাৎ খসড়া আইনটিতে নাগরিকদের মধ্যে শ্রেণি বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে।
খসড়া আইনে শুধু নাগরিকদের মধ্যে শ্রেণি বিভাজনই করা হয়নি, শ্রেণি বিভাজনের ভিত্তিতে নাগরিকদের অধিকারে ভিন্নতাও সৃষ্টি করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৬ ধারার অধীনে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ জাতীয় সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হতে পারবেন না। তাঁরা স্থানীয় সরকারের কোনো পদে নির্বাচন এবং কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও করতে পারবেন না (ধারা ৭)। নাগরিক অধিকারের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে বংশসূত্রে, দ্বৈত, সম্মানসূচক, দেশীয়করণ সূত্রে ও বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও (ধারা ১৩)। অর্থাৎ, খসড়া আইনে জন্মসূত্রে ও ভূখণ্ড সংযোজন সূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকদের ছাড়া অন্য সবাইকেই মূলত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য এবং তাঁদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক এবং আমাদের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। কারণ, সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ এ ছাড়া খসড়াটি সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদেরও পরিপন্থী, যেখানে নাগরিকদের পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এটি আইনের দৃষ্টিতে সমতা-সম্পর্কিত সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ, সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা–সম্পর্কিত ২৯ অনুচ্ছেদ এবং সংগঠন করার অধিকার–সম্পর্কিত ৩৮ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
একইভাবে খসড়া আইনটি ইউডিএইচআরের ২, ৭, ২০ ও ২৩(১) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেমন ইউডিএইচআরের ২ ধারায় জন্মনির্বিশেষে সবারই সমান অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু খসড়া আইনের ৬, ৭ ও ১৩ ধারা আইসিসিপিআরের ২, ২৫ ও ২৬ ধারার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, আইসিসিপিআরের ২৬ ধারা অনুযায়ী, সবাই আইনের চেখে সমান এবং রাষ্ট্রীয় আইন সব ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করবে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে সমান ও কার্যকর সুরক্ষা প্রদান করবে।


ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত আমাদের বিদ্যমান নাগরিকত্ব আইনের সংস্কার আজ জরুরি। তবে আইনের যে খসড়াটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে তা দুর্ভাগ্যবশত সুচিন্তিত ও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য নয় কিছু ব্যক্তিকে নাগরিক হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা, যা আমাদের সংবিধানেরও পরিপন্থী
খসড়া আইনের ২০ ধারায় নাগরিকত্ব বাতিলের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জন্মসূত্রে নাগরিক ছাড়া অন্য সব শ্রেণির নাগরিকের ক্ষেত্রেই, কিছু শর্তসাপেক্ষে, নাগরিকত্ব বাতিলের বিধান এতে রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিকদের মধ্যে জন্মস্থানের ভিন্নতার কারণে বৈষম্য করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া খসড়া আইনের ২০ ধারা ইউডিএইচআর ও আইসিসিপিআরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। যেমন ইউডিএইচআরের ১৫ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তিরই একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে এবং কাউকেই যথেচ্ছভাবে তাঁর জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আইসিসিপিআরের ২৪(৩) ধারায়ও প্রত্যেক শিশুর জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা এসডিজির গোল ১৬(৯)-এ প্রত্যেককে আইনগত পরিচয় প্রদানের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১ এবং বাংলাদেশ নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ, ১৯৭২ আমাদের দেশে নাগরিকত্ব–সম্পর্কিত বিদ্যমান আইন। বিদ্যমান আইনের ইতিবাচক দিক হলো যে এতে শ্রেণি বিভাজনের ভিত্তিতে নাগরিকের অধিকারের ভিন্নতা অনুপস্থিত। একই সঙ্গে এতে নাগরিকত্ব বাতিলের কোনো বিধানও নেই। দুর্ভাগ্যবশত প্রস্তাবিত খসড়ায় দুটি বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে পশ্চাৎপদতারই প্রতিফলন।
খসড়ার ধারা ৩, যাতে প্রস্তাবিত আইনকে আদালতের রায় ও ডিক্রির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিশেষভাবে জটিলতা সৃষ্টি করতে বাধ্য। কারণ, এর ফলে আদালতের ওপর আইনসভার প্রাধান্য বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দেবে, যা সংবিধানসম্মত হবে না। এ ছাড়া আদালতের রায় সব কর্তৃপক্ষের জন্য মানা বাধ্যতামূলক। প্রসঙ্গত, পিইউসিএল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় [(২০০৩)৪ এসসিসি] ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে আদালতের নির্দেশ অমান্য করার এখতিয়ার আইনসভার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নেই।
খসড়াটি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলে ভবিষ্যতে জাতি হিসেবে আমাদের স্বার্থহানি হবে বলেও অনেকেরই ধারণা। এশিয়ান টাইগারদের দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সেই সব দেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রবাসীদের বিনিয়োগ। চীনের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। এমনকি ভারতও প্রবাসী ভারতীয়দের বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজি ও প্রযুক্তি আকর্ষণের লক্ষ্যে সফলতা প্রদর্শন করছে। দ্রুত সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে আমাদেরও তা-ই করতে হবে। তবে প্রস্তাবিত আইন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলে মনে হয় না।
প্রস্তাবিত আইনটি যে প্রবাসী বিনিয়োগবান্ধব হবে না, তার ইঙ্গিত মেলে এর উপধারা ৫(২) (ক)-এর বিধান থেকে। এই উপধারায় বংশসূত্রে নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য জন্মের দুই বছর বা আইনটি বলবৎ হওয়ার দুই বছরের মধ্যে, যা পরে ঘটে, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে জন্মনিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর দ্বারা তৃতীয় প্রজন্মের, এমনকি দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও নাগরিক হওয়ার পথ, যদি তাঁদের অভিভাবকেরা নিজেরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিবন্ধিত না হয়ে থাকেন, রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলাফল ইতিবাচক হবে না। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বিরাট অংশই তৃতীয় প্রজন্মের, যাঁদের অনেকেই এই আইন বলবৎ হলে বংশসূত্রে নাগরিক হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদিও তাঁদের অধিকাংশই বাংলাদেশে আসতে ও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
প্রস্তাবিত খসড়ার আরেকটি দুর্বলতা হলো, এটি দুটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রণীত হয়েছে। যেমন বেআইনি অভিবাসন–সংক্রান্ত উপধারা ১১(গ) ও ১৮(গ) মূলত বিহারিদের এবং পূর্বপুরুষের বিদেশি শত্রু বাহিনীর সদস্য থাকা সম্পর্কিত উপধারা ১১(ঘ) ও ১৮(ঘ) রোহিঙ্গাদের বেলায় প্রযোজ্য হবে, যা কাঙ্ক্ষিত নয়। এ ছাড়া আমরা চাই না এমন ধরনের বিধান প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেলায় প্রযোজ্য হোক। উপরন্তু পূর্বপুরুষের বিরুদ্ধে বিদেশি শত্রু বাহিনীর সদস্য থাকার অভিযোগে বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্ব প্রদান না করা হলে পিতার অপরাধে পুত্রকে শাস্তি দেওয়ার সমতুল্য হবে, যা ন্যাচারাল জাস্টিস বা ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কোনো রাষ্ট্র বেআইনি অভিবাসী হিসেবে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বৈধ করার ব্যাপারে একই যুক্তি দিতে পারে।
ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত আমাদের বিদ্যমান নাগরিকত্ব আইনের সংস্কার আজ জরুরি। তবে আইনের যে খসড়াটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে, তা দুর্ভাগ্যবশত সুচিন্তিত ও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য নয় কিছু ব্যক্তিকে নাগরিক হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা, যা আমাদের সংবিধানেরও পরিপন্থী। তাই সংসদে পাসের আগে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে খসড়াটি পুনর্বিন্যাস করার জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, জানুয়ারি ০৭, ২০১৭

No comments:

Post a Comment