Jan 11, 2017

নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা কী বার্তা দিয়েছেন?

২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে প্রায় ৭৯ হাজার ভোটে পরাজিত করেছেন। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। এই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের জনগণ ‘স্পোক লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার’। তাঁরা ভোটের মাধ্যমে তাঁদের মতামত জোরালো ও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাঁরা আসলে কী বার্তা দিয়েছেন? নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন থেকে শিক্ষণীয়ই বা কী রয়েছে?
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী ফলাফল থেকে আওয়ামী লীগ অবশ্যই উৎফুল্ল। আইভীর বিরাট বিজয় থেকে তাদের এই উপসংহারে পৌঁছাই স্বাভাবিক যে, তাদের দল ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। তাদের উন্নয়ন–প্রচেষ্টা জনগণকে কাঙ্ক্ষিতভাবে প্রভাবিত করেছে। বস্তুত, তারা এ নির্বাচনকে একটি ‘টেস্ট কেস’ বা জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবেই দেখতে চাচ্ছে, যে পরীক্ষায় তারা ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির জনপ্রিয়তার টেস্ট কেস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, আইভী কোনো সাধারণ প্রার্থী ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘ওয়ান-অব-এ-কাইন্ড’ একজন তারকা প্রার্থী। তাঁর সঙ্গে নিকট অতীতের অন্য কোনো নির্বাচনের অন্য কোনো প্রার্থীর সঙ্গে তুলনা হয় না। তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জের একটি বিশেষ পরিবারের অপরাজনীতির বড় ‘প্রতিষেধক’। তিনি এই বিশেষ পরিবারের সব হুমকির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে শুধু দাঁড়াননি, তিনি নারায়ণগঞ্জে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যকে সফলতার সঙ্গে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছেন। বস্তুত, এই পরিবারের বাড়াবাড়ির রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি নারায়ণগঞ্জের জনমানুষের অবলম্বনে পরিণত হয়েছিলেন। তাই সংগত কারণেই এবং নিজেদের স্বার্থেই নারায়ণগঞ্জবাসী তাঁদের এই অবলম্বনকে বিসর্জন দিতে চাননি।
আইভী এমন তারকা প্রার্থী, যিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নারায়ণগঞ্জের উল্লিখিত পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই করে ২০১১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। বিএনপি অবশ্য তাঁকে সেই নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেছিল। তবু নিঃসন্দেহে বলা যায়, খুনোখুনির রাজনীতির জনপদ নারায়ণগঞ্জের গণমানুষের হৃদয়ে আইভী একটি বড় স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। নারায়ণগঞ্জের ভোটারদের সঙ্গে যাঁরা কথা বলেছেন, তাঁরাই তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
শুধু সাহসিকতা এবং অনমনীয়তাই নয়, আইভীর আরেকটি বৈশিষ্ট্যও নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। কয়েক বছর ধরে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে বহুভাবে হয়রানি করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। তাদের তৎপরতা ছিল আইভীকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা। এ ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়েছে, যা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই চরমভাবে পঙ্কিল ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বিপরীতে আইভী নিজেকে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ।
আইভীর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ছিলেন দুর্বল বিকল্প। বস্তুত, তৈমুর আলম খন্দকারের মতো বিএনপির নামীদামি প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সম্ভবত আইভীর জনপ্রিয়তার কারণে অনীহার ফলেই অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তাই বিকল্প হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত বিএনপির তৃতীয় কি চতুর্থ বিকল্প প্রার্থী ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত সাত খুন মামলার আইনজীবী হিসেবে ব্যাপক সুনাম লাভ করলেও নির্বাচনী অঙ্গনে তিনি নিতান্তই একজন নবাগত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মতেও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত ছিলেন একজন দুর্বল প্রার্থী। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতির হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বরা তাঁদের প্রার্থীর বিজয়ের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করেননি।
নারায়ণগঞ্জের মেয়র পদে নির্বাচনের ফলাফল যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির জনপ্রিয়তার টেস্ট কেস ছিল না, তার প্রমাণ মেলে কাউন্সিলর নির্বাচনের ফলাফল থেকে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, মোট ২৭টি সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলরের মধ্যে বিএনপি ১২টিতে বিজয়ী হয়েছে। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে ১৩টিতে (প্রথম আলো, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬)। অর্থাৎ মেয়র পদে বিরাট ব্যবধান সত্ত্বেও কাউন্সিলর পদে বিএনপির প্রার্থীরা অপেক্ষাকৃত ভালো করেছেন।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের পরাজয়ের আরেকটি কারণ হলো, গত কয়েক বছরে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁদের পদ হারিয়েছেন। অনেকে জেলে পর্যন্ত গিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের ভোটারদের অনেকের মনে এমন প্রশ্নও ছিল যে, নির্বাচনে জিতলেও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হয়তো মেয়র পদে থাকতে পারবেন কি না। আমরা সুজন-এর উদ্যোগে যে ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠান করেছি, তাতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত একজন ভোটারের কাছ থেকে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন থেকে একটি বড় শিক্ষণীয় হলো, একটি অতি দুর্বল, পক্ষপাতদুষ্ট এবং মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনের অধীনেও একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব, যদি সরকার তা চায়। মামলা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বর্তমানে বিএনপি একটি কোমরভাঙা দল। তাই আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির পক্ষ থেকে সহিংসতা ও কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করা প্রায় অসম্ভব।
বস্তুত, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত সব কটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাই জালভোট দেওয়া থেকে শুরু করে কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী অপরাধে লিপ্ত হয়েছিলেন। আর এসব নির্বাচনী অপরাধ ঘটেছিল অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং কর্মকর্তারাও—যাঁরা সরকারের অংশ—এসব অপকর্মে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এবার সরকার চায়নি বলেই সরকারি কর্মকর্তা এবং সরকারি দলের নেতা-কর্মীরাও নির্বাচনী অপরাধ থেকে বিরত থেকেছেন। যার ফলে সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে দাবি করা সম্ভব হয়েছে যে, ‘যেকোনো মূল্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে ওয়াদা করেছিলাম, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।’ তাই এটি সুস্পষ্ট যে, আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে সংসদের বিরোধী দল সরকারের অংশ, প্রধান বিরোধী দল চরমভাবে আতঙ্কিত, মিডিয়া বহুলাংশে পক্ষপাতদুষ্ট এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতাসীনদের অনুগত—সেখানে কেবল সরকার চাইলেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কি তাহলে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক? মোটেই তা নয়। বরং সত্যিকারের স্বাধীন, শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ‘নেসেসারি’ বা পূর্বশর্ত, কিন্তু ‘সাফিসিয়েন্ট’ বা যথেষ্ট নয়। কারণ, নির্বাচন কমিশনের হাতে অগাধ ক্ষমতা রয়েছে, যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারা প্রার্থিতা, নির্বাচনী ফলাফল, এমনকি পুরো নির্বাচন বাতিল করতে পারে। এ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীনদের অনেক কারসাজি ভণ্ডুল করে দিতে পারে, যে ক্ষমতা রকিব কমিশন তো ব্যবহার করেইনি, বরং তারা সব বিতর্কিত নির্বাচনের পক্ষে সাফাই গেয়েছে এবং নির্বাচনী অপরাধের শিকার প্রার্থীদের অনেক অভিযোগ অন্যায়ভাবে উপেক্ষা করেছে, যার জন্য কমিশনকে উচ্চ আদালতের কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয়েছে। তবে সরকার যদি নির্বাচনে কারচুপি করতে বদ্ধপরিকর হয়, তাহলে সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও তা প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব। তাই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি।
নারায়ণগঞ্জের মেয়র পদে নির্বাচনী ফলাফল থেকে আরেকটি শিক্ষা হলো, নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্যতা, সততা ও সাহসিকতার কারণেই প্রবল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আইভী বারবার নির্বাচনে জিতে আসছেন। সময় এসেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর এদিকে মনোযোগ দেওয়ার।


তথ্যসূত্র: প্রথম আলো,  ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬ 

No comments:

Post a Comment