Nov 25, 2016

‘অথর্ব’ জেলা পরিষদ গঠনে আবার আইন কেন?

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ জেলা পরিষদ আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে, যা শিগগিরই অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা হবে। মনে হচ্ছে যে সরকার আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০০ সালে পাস করা জেলা পরিষদ আইনকেই সংশোধন করে পুনঃপ্রচলন করবে, যেমনিভাবে ২০০৯ সালে তারা ১৯৯৮ সালের উপজেলা আইনকে সংশোধন ও পুনঃপ্রচলন করেছিল। প্রসঙ্গত, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাবেক সচিব ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি—বর্তমান লেখকও যার সদস্য ছিলেন—পল্লি এলাকার স্থানীয় সরকারের জন্য একটি সমন্বিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছিল, যে খসড়াটি সরকার ২০০৯ সালে পুরোপুরি অনুমোদন করেনি।
আইনের পুনঃপ্রচলন দোষের কিছু নয়, সেই আইন যদি যুগোপযোগী হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আগের জেলা পরিষদ আইনটি ছিল ধারণাগতভাবে পশ্চাৎপদ এবং মূলত মান্ধাতার আমলের চিন্তা-চেতনার সন্নিবেশ। এটি ছিল অনেকটা আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের আদতে গড়া। আমাদের অর্থমন্ত্রী, তাঁর জেলায় জেলায় সরকার (ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০২) গ্রন্থে আইনটির কঠোর সমালোচনা করেছেন: ‘২০০০ সালের জুলাই মাসে যে জেলা পরিষদ আইন পাস হয়েছে, তাতে একটি অথর্ব জেলা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রায় দেড় শ জন নির্বাচক নিয়ে হয়েছে জেলার নির্বাচকমণ্ডলী এবং তাঁরা ২১ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্য, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের সব চেয়ারম্যান/ মেয়র ও কমিশনাররা এবং উপজেলার চেয়ারম্যানরা ভোট দিয়ে নির্বাচন করবেন জেলা চেয়ারম্যান, পাঁচজন মহিলা সদস্য ও ১৫ জন অন্যান্য সদস্য। পরোক্ষ নির্বাচনের চূড়ান্ত আর কাকে বলে। এই যে জেলা পরিষদ হবে তার না থাকবে কোনো সম্পদ, না থাকবে কোনো দায়িত্ব ও ক্ষমতা, অর্থ বা জনবল। এই আইন এতই অর্থহীন যে এটি কোনো দিন কার্যকর হবে বলে ধারণা করা যায় না।’ (পৃ. ৫১)। তাঁর মতে, জেলা পরিষদ ‘আইনটি রহিত করে নতুন করে আইন প্রণয়ন হবে নতুন জাতীয় সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য’। (পৃ. ২৫৯)। প্রসঙ্গত, এবারকার সংশোধিত আইনেও একই বিভাজনের একই সংখ্যক প্রতিনিধির একইভাবে নির্বাচনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে অবশ্য উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানদ্বয়কে নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এ সংযোজন সত্ত্বেও নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না, যা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’, যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘শাসন’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহরে নির্বাচিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নিজ নিজ এলাকায় শাসনকাজ পরিচালনা করবে। কিন্তু এত অল্পসংখ্যক নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা জেলা পরিষদ পরিচালিত হলে তাকে গণতান্ত্রিক বলা দুরূহ।

সংশোধিত আইনের অধীনে নির্বাচিত সদস্যরা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এলাকা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলা পরিষদকে ১৫টি ভাগ করা হবে। প্রত্যেককে একটি করে এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হবে। তবে নারী সদস্যরা একেকজন তিনটি করে এলাকার দায়িত্ব পাবেন।’ (যুগান্তর, ৩০ আগস্ট ২০১৬)

সংশোধিত আইনের এমন বিধানের পরিবর্তে প্রতিটি জেলাকে ভোটারসংখ্যার ভিত্তিতে ২১টি নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করে প্রতিটি এলাকার জন্য একজন প্রতিনিধি নির্বাচনের বিধান করা যেত। একই সঙ্গে বিধান করা যেত ২১টি আসনের মধ্য থেকে ‘ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে’ এক-তৃতীয়াংশ বা সাতটি (এমনকি ৪০ শতাংশ) আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করার। এরপর ২১ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে চেয়ারম্যান/ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করা যেত। এমন পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে চেয়ারম্যান/ ভাইস চেয়ারম্যান হওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। ফলে পুরো পরিষদের মানের উন্নয়ন ঘটত।

এভাবে নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সদস্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করবেন। সংরক্ষিত আসনের নারীরাও একই আয়তনের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব ও একই ধরনের দায়িত্ব পালন করবেন, ভারতের পঞ্চায়েত প্রথায় যা বিরাজমান। ঘূর্ণমান পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে প্রথম নির্বাচনে, উদাহরণস্বরূপ, ১-৭ নির্বাচনী এলাকা, দ্বিতীয় নির্বাচনে ৮-১৪ নির্বাচনী এলাকা, তৃতীয় নির্বাচনে বাকি সাতটি নির্বাচনী এলাকা নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং বাকি আসনগুলো থাকবে উন্মুক্ত। এই পদ্ধতির আকর্ষণ হলো যে এটি নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে বৈষম্যহীন ও অনেক বেশি অর্থবহ। উপরন্তু, এই প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত যোগ্য নারীরা তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদকালে নিজেদের এমন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবেন, যাতে তাঁরা পরবর্তী সময়ে পুরুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসতে সক্ষম হবেন। ফলে নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত থাকলেও ভবিষ্যতে জেলা পরিষদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের হার হবে অনেক বেশি, যার মাধ্যমে নারীর সত্যিকারের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। উদাহরণস্বরূপ, ঘূর্ণমান পদ্ধতির কারণে ২০০২ সালের তুলনায় ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৩৫১-তে।

সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে কয়েকটি নতুন বিধানও সংযোজিত হয়েছে। যেমন এতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণ/পুনর্বহালের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা ২০০০ সালের আইনে ছিল না। একই সঙ্গে পরিষদের নির্বাহী ক্ষমতা প্যানেল চেয়ারম্যান, কোনো সদস্য, এমনকি কর্মকর্তাকে প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। সংশোধনীর মাধ্যমে পরিষদের যেকোনো সম্পত্তি দান, বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা বা বিনিময় বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধিত আইনে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের কাছে অর্পণ ও আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

সংশোধিত আইনেও সাংসদদের জেলা পরিষদের উপদেষ্টা করার বিধান অব্যাহত রয়েছে। আমাদের আশঙ্কা, এ বিধানের ফলে জেলা পরিষদের কাজে তাঁদের অযাচিত হস্তক্ষেপ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা অহেতুক একটি দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাবে।

সংশোধিত আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সংযোজিত হয়নি বলে আমাদের বিশ্বাস। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া প্রতিটি স্থানীয় সরকার আইনে বা নির্বাচনী বিধিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিবরণী, নিজের ও নির্ভরশীলদের সম্পদ, দায়-দেনার বিবরণী এবং ট্যাক্স রিটার্নের কপি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে এই বিধান রাখা হয়নি। আমরা জানি না, কোন যুক্তিতে তা করা হয়নি, তবে এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে জনস্বার্থের পরিপন্থী। কারণ, হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের মাধ্যমে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়ন ঘটে এবং তাঁরা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

আরেকটি দিক থেকেও সংশোধিত আইনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ২০০৯ সালের উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনে কয়েকটি সরকারি বিভাগকে এই দুটি প্রতিষ্ঠানে ন্যস্ত করার বিধান রয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা, সম্পদ ও জনবলের হস্তান্তর, যদিও এটির এখনো যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জেলা পরিষদ আইনে এমন কোনো বিধানই নেই। এ ছাড়া আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য’ সম্পর্কিত দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকা সত্ত্বেও জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও অন্যদের সঙ্গে ডিসি/ এসপিসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কী ধরনের সম্পর্ক হবে—তা এ আইনে কিছুই বলা নেই। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনেই কর্মকর্তারা কাজ করে থাকেন।

পরিশেষে আমরা আনন্দিত যে সরকার জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে অবসান ঘটবে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের, জেলা পরিষদের মতো, জনাব মুহিতের ভাষায়, ‘একটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে’ ‘স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির’ মাধ্যমে নিয়োগের মতো ‘নিতান্তই লজ্জা ও ক্ষোভের’ বিষয়ের। কিন্তু সংশোধিত আইন, আবারও মাননীয় মন্ত্রীর জবানিতে, ‘এমন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করবে, যার কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো জনবল নেই এবং কোনো সম্পদ নেই। প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে যা ঠিক করা হয়েছে, তা অনন্য ও হাস্যাস্পদ।’ (পৃ.৬৩)। আমাদের বোধগম্য নয় সরকার কেন তা করল।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৬

No comments:

Post a Comment