Nov 25, 2016

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: এই ফলাফল কি আসলেই অপ্রত্যাশিত?

১৯৪৮ সালের কথা। তখন সারা পৃথিবীতে সংবাদপত্রই ছিল একমাত্র গণমাধ্যম। সেবারের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনের সন্ধ্যাবেলায় লেখা ‘ডিউই ডিফিটস ট্রুম্যান’ শিরোনামটি ৩ নভেম্বরের শিকাগো ডেইলি ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয়। বাস্তবে ঘটেছিল তার উল্টো—তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানই ৩০৩-১৮৯ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের ব্যবধানে নিউইয়র্কের গভর্নর টমাস ডিউইকে পরাজিত করেন। প্রসঙ্গত, নির্বাচনের পরদিন সংবাদপত্রের শিরোনামটি প্রদর্শন করে ট্রুম্যান কৌতুক করে বলেন, ‘আমি তো এ রকম শুনিনি।’ তাঁর এই তির্যক মন্তব্য সংবাদপত্রটিকে দারুণভাবে অপ্রতিভ করেছিল।
অনেকটা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। এই নির্বাচনের আগে, এমনকি নির্বাচন-পরবর্তী রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত প্রায় সব গণমাধ্যমই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হিলারি ক্লিনটনের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছিল। তবে সব পণ্ডিতকে ভুল প্রমাণিত করে বাস্তবে ট্রাম্পই হিলারিকে ৭২ ইলেকটোরাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই জয়-পরাজয় কি আসলেই অপ্রত্যাশিত?

অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে অপ্রত্যাশিত বলা কঠিন। অনেকে অবশ্য বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন ‘ছিনতাই’ করে নিয়েছেন। এই অভিযোগও ধোপে টেকে না। কারণ, তিনি বন্দুক ধরে কারও ভোট আদায় করেননি। বরং রিপাবলিকান পার্টি প্রায় এক যুগ ধরে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করে আসছে, তাতে ট্রাম্পের মতো একজন ‘আগলি’ বা কুৎসিত আমেরিকানের পক্ষে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাওয়াই ছিল স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত, ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আগলি আমেরিকান নামের একটি উপন্যাস রচিত হয়, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরে ১৯৬৩ সালে উপন্যাসটি একটি সিনেমায় রূপান্তর করা হয়, যাতে বিখ্যাত অভিনেতা মার্লোন ব্রান্ডো অভিনয় করেন। সাধারণত অজ্ঞ-মূর্খ, হই-হুল্লোড়কারী, সৌজন্যবিবর্জিত ও বর্ণবাদী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদেরই কুৎসিত আমেরিকান বলে আখ্যায়িত করা হয়। অনেক আমেরিকানকে এমন আচরণ করতে দেখা যায় সাধারণত দেশের বাইরে, দেশের অভ্যন্তরে নয়। দুর্ভাগ্যবশত ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের অভ্যন্তরেই এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারকালে কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গির গতানুগতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প যুক্ত করেছিলেন বাগাড়ম্বর, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, মিথ্যাচার, হুমকি এবং নারী, ধর্মীয় বিশেষত মুসলিম ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি চরম বিদ্বেষ। উল্লেখ্য, সারা পৃথিবীতে ‘আগলি আমেরিকান’ ভাবমূর্তি বদলাতেই প্রেসিডেন্ট কেনেডি ১৯৬১ সালে ‘পিস কোর প্রোগ্রাম’-এর প্রচলন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রেই ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ‘বাই-পার্টিজান’ বা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুনাম ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে এ সংস্কৃতি ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়েছে। বস্তুত আমেরিকানদের মধ্যে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করতে থাকে নব্বইয়ের শেষ দিকে শুরু হওয়া ‘টি-পার্টি’ মুভমেন্টের মাধ্যমে। এর উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে রক্ষণশীল বা দক্ষিণপন্থী ব্যক্তিদের সংগঠিত করা; তাঁরা ব্যয় ও কর হ্রাসের মাধ্যমে মার্কিন বাজেট ঘাটতি কমাতে চেয়েছিলেন। 
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই আন্দোলন এক কুৎসিত রূপ ধারণ করে ২০০৮ সালে আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামার নির্বাচনের মাধ্যমে। ধর্মান্ধ ও সংখ্যালঘুবিদ্বেষী একদল ব্যক্তির কাছে ওবামার নির্বাচিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তারা ওবামাকে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, মেনে নিলেও মনে নিতে পারেনি। ওই উগ্রপন্থীরা ওবামাকে মুসলমান হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং দাবি করা শুরু করে যে তিনি বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করা এই মেধাবী ব্যক্তিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া এই অযাচিত আন্দোলনটি অত্যন্ত কুৎসিত রূপ ধারণ করে এবং মার্কিন সমাজকে চরমভাবে বিভক্ত করে ফেলে। এই বিভক্তিতে ইন্ধন জোগায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী ‘ইভানজেলিক্যাল রাইটস’ বা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী দক্ষিণপন্থীরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পও ওবামাবিরোধী আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন এবং এবার রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তিনি এর সুফল ভোগ করেন।
মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্প আরও সুফল ভোগ করেন বিশ্বায়ন ও কিছু বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বাড়াবাড়ির কারণে সৃষ্ট কিছু প্রভাব থেকে। বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে আমেরিকার শিল্পকারখানার অপেক্ষাকৃত বেশি মজুরিসম্পন্ন বহু লোক চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে যান। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের স্বল্পশিক্ষিত মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষ। এসব ব্যক্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর্থিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের এবং ট্রাম্পের মতো কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির স্বার্থপরতা ও দায়িত্বহীন ফাটকাবাজির কারণে। এর ফলে সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং ‘হোয়াইট পাওয়ারে’র উত্থান ঘটে। আর স্বল্পশিক্ষিত, বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের ক্ষোভের রোষানল দক্ষিণপন্থী বক্তৃতাবাজদের উসকানিতে গিয়ে পড়ে সংখ্যালঘু ও বৈধ-অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের ওপর, বিশ্বায়নের কারণে যাদের সংখ্যা আমেরিকাতে ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে এই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে পেরেছেন। প্রসঙ্গত, বিশ্বায়নের ফলে অনেক আমেরিকান শিল্পক্ষেত্রে চাকরি হারালেও এর দ্বারা কম লাভবান হয়নি। উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের কারণে তারা একই পণ্য স্বল্প খরচে শুধু ক্রয় করতেই সক্ষম হয়নি, অল্প আয় দিয়ে তারা বেশি পণ্য কিনতে পারছে। এ ছাড়া সারা বিশ্বে মার্কিন ডলার ‘রিজার্ভ কারেন্সি’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ডলার বিলের মতো শুধু কাগজের টুকরার বিনিময়ে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয়েছে, যা আমেরিকানদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনয়নপ্রাপ্তি ও নির্বাচনের পেছনে জঙ্গি সংগঠন আইএসও কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি। কয়েক বছর থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠা ও শরিয়া আইন কায়েমের অপচেষ্টায় সারা বিশ্বে নিরপরাধ ব্যক্তিদের রক্ত নিয়ে যে হোলিখেলা তারা খেলেছে, তা–ও ট্রাম্পের মতো সুযোগসন্ধানীর উত্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী বাক্পটুতা আইএসকেও নতুন সদস্য পেতে সহায়তা করেছে। এখন অনেকের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তাঁর বর্ণবাদী ও মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বর কার্যকর করলে হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনে’র ভবিষ্যদ্বাণীই বাস্তবে পরিণত হবে, যার ফলে ‘ওয়েস্ট ভার্সেস দ্য রেস্ট’-এর সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব সমগ্র পৃথিবীকেই বাসের অযোগ্য করে তুলবে।
এ আশঙ্কার কথা চিন্তা করলেও যেকোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের গা শিউরে উঠতে বাধ্য। আশা করি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প আইএসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘বন্ধুতে’ পরিণত হবেন না এবং মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, নভেম্বর ২২, ২০১৬

No comments:

Post a Comment