Nov 25, 2016

নির্বাচন কমিশন: অনুসন্ধান কমিটি হোক গ্রহণযোগ্য

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। সংবিধান অনুযায়ী, একজন নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ছাড়া বাকি চারজনের কাউকেই পুনর্নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তবে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী সব নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার ব্যাপারে তাঁদের চরম ব্যর্থতার কারণে, কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের কারোরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ অতি ক্ষীণ। তাই এই সম্ভাবনাই প্রবল যে, নতুন পাঁচজন ব্যক্তি কমিশনে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। ফলে কমিশনের পুনর্গঠন নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
রকিবউদ্দীন কমিশন নিয়োগ পেয়েছে একটি অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে। আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, এবারও আগের মতোই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাই আমাদের জানা দরকার, আগেরবার কীভাবে অনুসন্ধান কমিটি গঠিত ও কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।


২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা দূরীকরণের লক্ষ্যে একটি আইন অথবা প্রজ্ঞাপন জারির সুপারিশ করেন। রাষ্ট্রপতির সুপারিশে প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারপতি, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে অন্তর্ভুক্ত করে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, যদিও মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশ উপেক্ষা করে, ২১ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক আহমেদ আতাউল হাকিম এবং সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এ টি এম আহমেদুল হক চৌধুরীকে নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। অনুসন্ধান কমিটিকে তাদের কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই লেখক প্রথম আলোয় প্রকাশিত (৩০ জানুয়ারি ২০১২) একটি উপসম্পাদকীয়তে ঘোষিত অনুসন্ধান কমিটিতে সরষের মধ্যেই ভূত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে উপসম্পাদকীয়টিতে অনুসন্ধান কমিটিকে স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব সম্পাদনের অনুরোধ করা হয়। এ ছাড়া কমিশনে নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে সংবিধান অমান্য করে আইন প্রণয়নের পরিবর্তে প্রজ্ঞাপন জারি করার ব্যাপারেও এতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে ‘আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান’ করার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। তা সত্ত্বেও সংবিধান প্রণয়নের ৪৪ বছর পরেও প্রতিটি সরকার কমিশনে এ লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়ন না করে ক্রমাগতভাবে সংবিধান অমান্য করে আসছে। এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো কমিশনের সদস্যদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া। তাই আইন প্রণয়ন না করে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সম্প্রতি একটি আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, যিনি আমাদের সংবিধান–প্রণেতাদের একজন, এ ধরনের নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সুতরাং, এ ব্যাপারে সব সন্দেহের অবসানের লক্ষ্যে সংসদের বর্তমান অধিবেশনেই একটি আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে বিনীত সুপারিশ করছি।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারের অনীহার কারণ আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। এটি কোনো জটিল আইন হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের আইনের একটি খসড়া হুদা কমিশন তাদের মেয়াদ শেষের আগে তৈরি করে রেখে গেছে। সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খসড়াটি চূড়ান্ত করে সংসদের আগামী অধিবেশনেই এটিকে সহজেই আইনে পরিণত করা যায়। আশা করি, সরকার, বিশেষ করে আমাদের আইনমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। কারণ, এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারিত করে দিলে অতীতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে।
একই সঙ্গে আশা করি, আইনমন্ত্রী অনুসন্ধান কমিটি গঠনের বিষয়েও নতুন করে ভাববেন। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হলেই দুর্ভাগ্যবশত কোনো ব্যক্তি সৎ ও সাধু হয়ে যান না। বস্তুত, আমাদের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের বিরুদ্ধেই দলপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য ইতিবাচক নয়। তাই নির্বাচন কমিশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে, মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার স্বার্থে আমরা অনুসন্ধান কমিটিকেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার ওপর জোর দিচ্ছি এবং এটিকে নতুন আঙ্গিকে গঠন করার অনুরোধ করছি। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রস্তাব হবে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটের প্রতিনিধি, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের একজন প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের। তবে লক্ষ রাখতে হবে যে অনুসন্ধান কমিটির সদস্যদের কারও বিরুদ্ধেই যেন অসততা ও দলপ্রীতির কোনো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ না থাকে।
নতুন আঙ্গিকে গঠিত অনুসন্ধান কমিটির কাছে আমাদের নিবেদন থাকবে স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার। পশ্চিমের অনেক দেশেই ‘সানশাইন ল’ রয়েছে। এমন আইনের ফলে, সীমিত কিছু বিষয় ছাড়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সব সিদ্ধান্তই প্রকাশ্য সভায় গ্রহণ করতে হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তাই অনুসন্ধান কমিটির কাছে কমিটির সভাগুলো উন্মুক্ত করার জন্য আমরা অনুরোধ করছি; যাতে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এগুলোতে উপস্থিত থাকতে পারেন।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আরেকটি পন্থা হতে পারে অনুসন্ধান কমিটির বিবেচনাধীন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা নামগুলো সুপারিশের পেছনের যুক্তিসহ প্রকাশ করা। তা করা হলে বিবেচনাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কারও কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকে, তা প্রকাশ পাবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগের পথ সুগম হবে। এ লক্ষ্যে কমিটি পাবলিক হিয়ারিংয়ের বা গণশুনানিরও ব্যবস্থা করতে পারে। কমিটির যেহেতু নিজ কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের এখতিয়ার রয়েছে, তাই কমিটি চাইলেই তার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবে।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং সৎ ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের কোনো বিকল্প নেই। তবে সবচেয়ে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন না করে। রকিবউদ্দীন কমিশনের পক্ষে ২০১২-১৩ সালের সব নির্বাচন গ্রহণযোগ্যভাবে করা সম্ভব হলেও, ২০১৪ সালের শুরু থেকে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি মূলত প্রজাতন্ত্রের অধিকাংশ ‘কর্মচারীর’ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণেই।
পরিশেষে, আমাদের অতীতের সরকারগুলো নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে, এমনকি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ করতে গিয়েও ‘আমার কাজ আমি করমু, তোরে শুধু জিগ্গাই লমু’ এমন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাই আজ বহুলাংশে ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের মানসিকতার পরিবর্তন আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। তাহলেই সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ আইন প্রণীত হবে, সঠিক অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হবে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়োগ হবে, যা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করবে। এর মাধ্যমে সংবিধানও মানা হবে এবং আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি আবারও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট থেকে রক্ষা করবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, অক্টোবর ০২, ২০১৬ 

No comments:

Post a Comment