Nov 28, 2016

ইউনিয়ন পরিষদ: নির্বাচনের পর এখন যা করণীয়

বেশ কয়েক মাস হলো প্রায় চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্য, সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। উঠেছে নির্বাচন কমিশন, অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। তবে নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্ক সত্ত্বেও নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলের এই স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ‘গঠিত’ হয়েছে, যা জাতির জন্য এক বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ‘গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি’ বা তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে ‘ডেমোক্রেটিক ডেফিসিট’ বা গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা দূর হয়। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেকগুলো অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে। জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিচর্চা, সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিতদের ‘অন্তর্ভুক্তকরণের’ অভাব ইত্যাদি হলো এসব সীমাবদ্ধতার অংশ। একটি শক্তিশালী তথা ক্রিয়াশীল স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এসব সীমাবদ্ধতা কার্যকরভাবে দূর করতে পারে। ফলে যেসব সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনমানে প্রভাব ফেলে, সেগুলোর সমাধানে তারা কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

তৃণমূলের গণতন্ত্র, যাকে সাধারণ জনগণের গণতন্ত্র বলা যায়, গণতন্ত্রকে গভীরতা প্রদান করে। এর মাধ্যমেই গণতন্ত্রের সত্যিকারের ‘গণতন্ত্রায়ণ’ হতে পারে। আর এ কারণেই আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে প্রশাসনের সকল স্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে একটি স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কায়েম করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আর এভাবেই ইউনিয়ন পরিষদকে কার্যকর করার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যা বিরাজমান প্রতিনিধিত্বশীল বিকল্প থেকে নিঃসন্দেহে উন্নততর। অর্থাৎ নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ছাড়া গণতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে না।
একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শুধু গণতন্ত্রকেই সুসংহত করে না, উন্নয়ন কার্যক্রমকেও ত্বরান্বিত করে। প্রতিনিয়ত মানুষ যেসব সমস্যার সম্মুখীন, তার অধিকাংশই স্থানীয় এবং এগুলোর সমাধানও স্থানীয়ভাবেই হতে হবে। যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, পানীয় জল সরবরাহ, পরিবেশ উন্নয়ন, নারীর অবস্থার পরিবর্তন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অপরাধ দমন, এমনকি আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম ইত্যাদি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ মূলত স্থানীয়ভাবেই গ্রহণ করতে হয়। একটি সত্যিকারের ও কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেই এসব সমস্যার স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব। বস্তুত, আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের মতে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা [কুদরত-ই-ইলাহি বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ ডিএলআর (এডি) (১৯৯২)]। প্রসঙ্গত, আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদেও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ওপর ‘স্থানীয় শাসনের ভার’ অর্পণ করা হয়েছে, জনকল্যাণমূলক সরকারি সেবা প্রদান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব পালন যার অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বনেতারা যে যুগান্তকারী ও সর্বজনীন ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) অনুমোদন করেছেন—যে লক্ষ্যমাত্রার উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বকে, কাউকে বাদ না দিয়ে, সম্পূর্ণরূপে ও টেকসইভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করা—সেগুলোও স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এ জন্যও প্রয়োজন হবে সত্যিকারের বিকেন্দ্রীকৃত ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা।
ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের অপরিহার্যতার ওপর প্রধানমন্ত্রী তাঁর দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫) গ্রন্থে অনেক আগেই জোর দিয়েছেন: ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পভিত্তিক বা সমাজকল্যাণমূলক, ছিটেফোঁটা অনুদান বা ঋণ বিতরণ বা খয়রাতি সাহায্য হিসাবে কর্মসূচি গ্রহণ করলে চলবে না...(এর জন্য) বাড়াতে হবে তার অধিকার সচেতনতা, তার সংগঠন করার ক্ষমতা, স্থানীয় পর্যায়ে স্ব-শাসিত সরকারের (Local Self-government) কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণের মাত্রা।’
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার এমন অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে: ‘আমাদের এবারের অগ্রাধিকার: সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণ’। ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের ক্ষমতায়ন ও অধিকতর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণ করা হবে। বর্তমান কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাছে অধিকতর ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হবে। সর্বস্তরে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে অধিকতর ক্ষমতাশালী ও দায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।’
ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণ তথা জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ভূমিকার গুরুত্ব আমরা আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও দেখতে পাই। কয়েক বছর ধরে আমরা ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর উদ্যোগে সারা দেশে ১৮৫টি ইউনিয়নে কাজ করে আসছি, যার মধ্যে ৬১টি ইউনিয়নে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ব্র্যাকের ‘সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি’র সঙ্গে যৌথভাবে। এসব ইউনিয়নে আমরা এমডিজি/এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে জনগণ, জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের পার্টনারশিপ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে সহায়তার মাধ্যমে আমরা ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছি। ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশন, স্থায়ী কমিটিকে কার্যকর করা ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পেরেছি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে এমন উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে তাঁরা জনগণের নেতা এবং বিরাজমান শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের পক্ষে সাধারণ মানুষের জীবনমানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব।
একই সঙ্গে আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘উজ্জীবক’, ‘নারীনেত্রী’ ও ‘ইয়ুথ লিডার’ তৈরি করছি, যাঁরা তৃণমূলে ‘সিভিল সোসাইটি’ বা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিবর্তনের রূপকারের দায়িত্ব পালন করছেন। নাগরিক সমাজের এসব প্রতিনিধি ইউনিয়ন পরিষদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা নারীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে উজ্জীবিত ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছেন। এই কাজের লক্ষ্য হলো জনগণের সচেতনতার স্তর উন্নীত এবং তাদের ভাগ্য গড়ার কারিগরে পরিণত করা। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সত্যিকারের একটি ‘কমিউনিটি-লেড উন্নয়ন প্রচেষ্টা’র মডেল বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত একাধিক মূল্যায়ন থেকে দেখা গেছে যে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জীবনমানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে আমাদের ‘এমডিজি/এসডিজি ইউনিয়ন কৌশল’ অত্যন্ত কার্যকর। সর্বোপরি যেহেতু দলমত-নির্বিশেষে সমাজের সব ক্ষেত্রের মানুষ আমাদের এই প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত এবং তারা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে; তাই আমরা লক্ষ করেছি যে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও আমাদের কাজের সঙ্গে জড়িত ইউনিয়নগুলো ছিল সংঘাতমুক্ত। আমরা আরও লক্ষ করেছি যে তৃণমূলের নাগরিক সমাজ যেখানে যত বেশি সক্রিয়, সেখানেই ইউনিয়ন পরিষদ তত বেশি কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে ও জনগণ তত বেশি উদ্যোগী হয়েছে এবং মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন তত বেশি হয়েছে।
পরিশেষে আমরা আশা করি যে ইউনিয়ন পরিষদের সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তা কাজে লাগাতে সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেবে। উদ্যোগ নেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দক্ষতা বৃদ্ধির এবং একই সঙ্গে একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি নীতি-কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে তাদের সফলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির। এ ক্ষেত্রে সরকার আমাদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে পারে। ফলে আগামী পাঁচ বছরেই পল্লিজীবনে এক বিরাট গতিশীলতা আসবে এবং মানুষের জীবনমানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে। উপরন্তু এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর করার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারই শুধু নয়, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারও বাস্তবায়িত হবে। পাশাপাশি এমডিজি অর্জনের বিরাট সফলতার ধারাবাহিকতায় এসডিজি বাস্তবায়নের পথও সুগম হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৬

No comments:

Post a Comment