Sep 3, 2016

রবীন্দ্র দারিদ্র্য ভাবনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন অসামান্য প্রতিভাবান মানুষ। যদিও তিনি কবি হিসেবেই সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন, তাঁর প্রতিভা বিস্তৃত ছিল আরও অনেক সৃষ্টিশীল কর্মে। তিনি ছিলেন অনেক বড় মাপের গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, দার্শনিক এবং চিত্রশিল্পী। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ধারণার পথিকৃৎ। পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের তাঁর ভাবনা ও কর্মকাণ্ড এখনও আমাদেরকে অনুপ্রেরণা যোগায় ও মূল্যবান দিক-নির্দেশনা দেয়। 

রবীন্দ্রনাথের দারিদ্র্য ভাবনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর কাব্য-উপন্যাস, ছোট গল্পে ও সংগীতে। পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে তিনি তাঁর জমিদারিতে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন তা তাঁর বহুবিদ রচনায় ফুটে উঠেছে। এছাড়াও তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বহু ব্যক্তিকে অনেক চিঠি লিখেছেন, যেগুলোতেও তাঁর ভাবনাগুলো প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর লেখাগুলো থেকে প্রাপ্ত দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্পর্কিত ভাবনাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শিত পন্থাই দারিদ্র্য দূরীকরণের সবচেয়ে মোক্ষম উপায় বলে আমরা মনে করি। 


যৌবনের প্রারম্ভেই রবীন্দ্রনাথ বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ,নওগাঁ জেলার পতিসর ও সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর এলাকার পারিবারিক জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়ে জমিদারির কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বেচ্ছাব্রতী ও গ্রামের সাধারণ মানুষদেরকে নিয়ে পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এমনকি একাজে তিনি নিজের সন্তানকেও যুক্ত করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ একজন কবির অনুভূতি দিয়ে তাঁর প্রজাদের দারিদ্র্য উপলব্ধি করেছিলেন এবং তাদের দুর্দশা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। তাদের অবস্থা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে:

“ ... ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির
মূক সবে, ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর
বেদনার করুণ কাহিনী; স্কন্ধে যত চাপে ভার
বহি চলে মন্দগতি যতক্ষণ থাকে প্রাণ তার--
তার পরে সন্তানেরে দিয়ে যায় বংশ বংশ ধরি,
নাহি র্ভৎসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিন্দে দেবতারে স্মরি,
মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান,
শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনোমতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ
রেখে দেয় বাঁচাইয়া। সে অন্ন যখন কেহ কাড়ে,
সেপ্রাণে আঘাত দেয় গর্বান্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে,
নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে--
দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে
মরে সে নীরবে।” 

তিনি পতিসরের মানুষের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: “এত অবহেলা অস্বাস্থ্য অসৌন্দর্য দারিদ্র্য বর্বরতা মানুষের আবাসস্থলে কিছুতেই শোভা পায় না। সকল রকম ক্ষমতার কাছেই আমরা পরাভূত হয়ে আছি--প্রকৃতি যখন উপদ্রব করে তাও সয়ে থাকি, রাজা যখন উপদ্রব করে তাও সয়ে থাকি, এবং শাস্ত্র চিরকাল ধরে যে-সমস্ত দুঃসহ উপদ্রব করে আসছে তার বিরুদ্ধেও কথাটি বলতে সাহস হয় না। এ রকম জাতের পৃথিবী ছেড়ে একেবারে পলাতক হওয়া উচিত--এদের দ্বারা জগতের কোনো সুখও নেই, শোভাও নেই, এবং সুবিধাও নেই।”  শিলাইদহ থেকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দরিদ্র প্রজাদের সম্বন্ধে উল্লেখ করেন: “... আমার এই দরিদ্র চাষি-প্রজাগুলোকে দেখলে আমার ভারী মায়া করে, এরা যেন বিধাতার শিশুসন্তানের মতো নিরুপায়। তিনি এদের মুখে নিজের হাতে কিছু তুলে না দিলে এদের আর গতি নেই।” 

দরিদ্র প্রজাদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল অকৃত্রিম ভালবাসা। বস্তুত তিনি হয়ে পড়েছিলেন তাদেরই ‘লোক’। প্রতিমা দেবীকে লেখা একটি চিঠিতে প্রজাদের সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন: “...এরা যেন আমার একটি দেশজোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক। এইসমস্ত নিঃসহায় নিরুপায় নিতান্ত নির্ভরপর সরল চাষাভুষোদের আপনার লোক মনে করতে বড় একটা সুখ আছে। এদের ভাষা শুনতে আমার এমন মিষ্টি লাগেÑ তার ভিতর এমন স্নেহমিশ্রিত করুণা আছে ! এরা যখন কথা বলে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে পড়ে--অন্য নানা ছলে আমাকে সামলে নিতে হয়।”  শেষবারের মত ১৯৩৭ সালে তিনি যখন পতিসরে আসেন তখন প্রজাদের দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে কবি বলেছিলেন: “তোমরা আমার বড় আপনজন, তোমরা সবাই সুখে থাক।”  রবীন্দ্রনাথের দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রচেষ্টা ছিল প্রজাদের প্রতি তাঁর এই ভালবাসারই নিদর্শন।

প্রজারাও রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতো। পতিসরে দেওয়া সংবর্ধনায় সেখানকার কফিলউদ্দিন আকন্দ নামে একজন প্রজা একটি কবিতা পাঠ করেন:
“প্রভু রূপে হেথা আস নাই তুমি 
দেবরূপে এসে দিলে দেখা
দেবতার দান অক্ষয় হউক
হৃদিপটে থাক স্মৃতি রেখা।” 
১২ শ্রাবণ ১৩৪৪, মোঃ কফিলউদ্দিন আকন্দ, রাতোয়াল 


নিজে জমিদার হয়েও জমিদার শ্রেণিকে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন পরগাছা। তিনি লিখেছেন: “আমার জন্মগত পেশা জমিদারি, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি। এই কারণেই জমিদারির জমি আঁকড়ে থাকতে আমার অন্তরের প্রবৃত্তি নেই। এই জিনিসটার পরে আমার শ্রদ্ধার একান্ত অভাব। আমি জানি জমিদার জমির জোঁক; সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব... প্রজারা আমাদের অন্ন জোগায় আর আমলারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেয়Ñএর মধ্যে পৌরুষও নেই, গৌরবও নেই।” 

বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ প্রজাদেরকে জমিদারির মালিকানাও দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিমা দেবীকে তিনি লিখেন: “বহুকাল থেকেই আশা করেছিলুম, আমাদের জমিদারি যেন আমাদের প্রজাদেরই হয়, আমরা যেন ট্রাস্টির মতো থাকি। অল্পকিছু খোরাক-পোশাক দাবি করতে পারবো, কিন্তু সে ওদেরই অংশীদারের মতো।”  জীবন সায়ান্নে এসে পতিসরে দেওয়া সংবর্ধনা সভায় তিনি আফসোস করে বলেছিলেন: “ইচ্ছা ছিল মান সম্মান সম্ভ্রম সব ছেড়ে দিয়ে তোমাদের সঙ্গে তোমাদের মতই সহজ হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেব। কী করে বাঁচতে হবে তোমাদের সঙ্গে মিলে সেই সাধনা করব। কিন্তু আমার এই বয়সে তা হবার নয়, আমার যাবার সময় হয়ে এসেছে।” 

দরিদ্র প্রজাদের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯০৮ সালে তিনি শিলাইদহে পল্লী উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করেন। অমলা বসুকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন: “আমি সম্প্রতি পল্লীসমাজ নিয়ে পড়েছি। আমাদের জমিদারির মধ্যে পল্লীগঠন কার্যের দৃষ্টান্ত দেখাব বলে স্থির করেছি। কাজ আরম্ভ করে দিয়েছি। কয়েক জন পূর্ববঙ্গের ছেলে আমার কাছে ধরা দিয়েছে। তারা পল্লীর মধ্যে সেখানকার লোকদের সঙ্গে বাস করে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার প্রভৃতি কাজের ব্যবস্থা তাদের নিজেদের দিয়ে করাবার চেষ্টা করছে। তাদের দিয়ে রাস্তাঘাট বাঁধানো, পুকুর খোঁড়ানো, ড্রেন কাটানো, জঙ্গল সাফ করানো প্রভৃতি সমস্ত কাজের উদ্যোগ হচ্ছে।” 

পল্লী উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য দূরীকরণের কাজ তিনি পরিকল্পিতভাবে শুরু করেছিলেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তিনি শিলাইদহে পল্লীসমাজ গড়ার কাজে হাত দেন। এ সম্পর্কে তাঁর নিজের প্রস্তুত করা কর্মসূচি অনুযায়ী: “প্রতি জেলায় প্রধান প্রধান গ্রাম, পল্লী বা পল্লীসমষ্টি লইয়া এক বা ততোধিক পল্লীসমাজ সংস্থাপন করিতে হইবে। শহর, গ্রাম কি পল্লীনিবাসী সকলেই স্ব স্ব পল্লীসমাজভুক্ত হইবেন। গ্রাম বা পল্লীবাসীর অভিপ্রায় মত অন্য পাঁচ জনের উপর পল্লীসমাজের কার্যনির্বাহের ভার থাকিবে। তাঁহারা পল্লীবাসীদের মতামত ও সহায়তা লইয়া পল্লীসমাজের কার্য করিবেন।” 

পল্লীসমাজের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো ছিল: (১) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্য ও সদ্ভাব সৃষ্টিকরণ। (২) সর্বপ্রকার গ্রাম্য বিবাদ সালিসের মাধ্যমে মীমাংসাকরণ। (৩) স্বদেশী শিল্পদ্রব্যের প্রচলন। (৪) উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যালয় ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন। (৫) বিজ্ঞান, ইতিহাস বা মহাপুরুষদের জীবনী ব্যাখ্যার মাধ্যমে সুনীতি, একতা ও স্বদেশানুরাগ বৃদ্ধিকরণ। (৬) প্রত্যেক পল্লীতে একটি চিকিৎসা ও ঔষধালয় স্থাপন। (৭) পানীয় জল, নদী-নালা, পথ-ঘাট, ব্যায়ামশালা ও ক্রীড়াক্ষেত্র স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন। (৮) আদর্শ কৃষিক্ষেত্র বা খামার স্থাপনের মাধ্যমে যুবক বা অন্য পল্লীবাসীদের কৃষিকার্য বা গো-মহিষাদি পালন করে জীবিকা উপার্জন ও কৃষিকার্যের উন্নতি সাধন। (৯) দুর্ভিক্ষ নিবারণার্থে ধর্মগোলা স্থাপন। (১০) নারীদের আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান। (১১) মাদকদ্রব্য ব্যবহার থেকে জনগণকে নিবৃত্তকরণ। (১২) মিলনমন্দির ও ক্লাব স্থাপনের মাধ্যমের স্বদেশ হিতার্থে জনগণকে অবহিতকরণ। (১৩) জনসংখ্যা বিভাজন, গৃহসংখ্যা, রোগ-শোকের ব্যাপকতা, ফসলের অবস্থা ইত্যাদি-সহ পল্লীর সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য সন্নিবেশিতকরণ। (১৪) জেলায়-জেলায় ও গ্রামে-গ্রামে পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব সংস্থাপন ও ঐক্য সংবর্ধন। (১৫) জেলা-সমিতি, প্রাদেশিক সমিতি ও জাতীয় মহাসমিতির উদ্দেশ্য ও কার্যের সহায়তাকরণ।

এ সময় শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘কিশোরব্রতী-বালকদল’। তাদের মাধ্যমে কুঠিবাড়ির পাশেরই ছোট্ট কোমরকাঁদি গ্রামকে তিনি আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান। আদর্শ গ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই জরিপ কাজের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই জরিপের মাধ্যমে গ্রামের পুরো বিবরণ সংগ্রহ করা হতো। চব্বিশ জন ব্রতী-বালকদলের প্রত্যেকের ভাগে পাঁচখানা করে গৃহস্থের বাড়ি দেওয়া হয়। তাদের কাজ ছিল ওই বাড়িগুলোর সবাইকে লেখাপড়া করানো এবং কুঠিবাড়িতে স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো, তাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য উপদেশ দেওয়া ইত্যাদি। 

একইভাবে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে তাঁর জমিদারির অভ্যন্তরে লাহিনী গ্রামে ৪০/৫০ বিঘা জমির উপর পরিকল্পিত আদর্শ গ্রাম তৈরিতে সচেষ্ট হন। এখানেও তিনি জরিপ করে উন্নয়নের একটি নকশা তৈরি করেন। তারপর এই গ্রামে স্কুল, সমবায়, ডাক্তারখানা ও     রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই আদর্শ গ্রামের অধিবাসীদের জন্য রবীন্দ্রনাথ একটি বাজার তৈরির কাজে হাত দিয়েছিলেন। তিনি হিতৈষী বৃত্তিরও প্রচলন করেন। রবীন্দ্রনাথ একটি ‘কর্মীসংঘ’ গঠন করেছিলেন। কর্মীসংঘের উদ্দেশ্য ছিল বড় বড় মহাজনদের হাত থেকে গরিব চাষীদের রক্ষা করা। কৃষকদের উন্নতির কাজে যুক্ত হয়েছিল ব্রতীবালক দল।

শচীন্দ্রনাথ অধিকারী কিশোরব্রতী-বালকদের কাজের একটি বিবরণ দিয়েছেন তাঁর গ্রন্থে, “... আমাদের কর্মধারা ছিল প্রধানত তিনটি-- (১) হাতেকলমে কৃষি শিক্ষা (২) আদর্শ গ্রাম তৈরি (৩) ব্রতীবালক দল গঠন। প্রত্যহ ইস্কুল ছুটির পর আমাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এক ঘণ্টা করে কাজ করতে হতো। শনি ও রবিবারের কাজ ছিল অবশ্যকরণীয়, বেলা ২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। খেলা শেষ হতে অনেকদিন সাতটা বেজে যেত।” 

রবীন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় শিলাইদহ ও পতিসরে পল্লীর যে উন্নয়ন হয় তার একটি বিবরণ দিয়েছেন তার পুত্র রথীন্দ্রনাধ ঠাকুর। পিতৃস্মৃতিতে তিনি বলেছেন: “সেবার পতিসরে পৌঁছে গ্রামবাসীদের অবস্থার উন্নতি দেখে মন পুলকিত হয়ে উঠল। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছে না দেখলুমÑ নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছেলের দল ইস্কুলের ঘাটে ... পাঠশালা, মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। তিনটি হাসপাতাল ও ডিসপেনসারির কাজ ভালো চলছে। মামলা মোকদ্দমা খুবই কম, যে অল্পস্বল্প বিবাদ উপস্থিত হয় তখনই প্রধানরা মিটিয়ে দেন। যে সব জোলারা আগে কেবল গামছা বুনত তারা এখন ধুতি, শাড়ি, বিছানার চাদর বুনে আমাকে দেখাতে লাগতে আনল।” 

রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছিলেন গ্রামের উন্নতির সঙ্গে কৃষির উন্নতি জড়িত। এই কৃষির উন্নতির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি পদ্ধতির সঙ্গে যথাযথ সংযোগ সাধন। কৃষি বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে তিনি তাঁর নিজ সন্তান রথীন্দ্রনাথ ও বন্ধুর ছেলে সন্তোষ চন্দ্র মজুমদারকে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি ও গোষ্ঠবিদ্যা পড়িয়ে এনে এখানে গ্রাম উন্নয়নের কাজে লাগিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে কৃষিখামার তৈরি করে রথীন্দ্রনাথের মাধ্যমে উন্নত চাষের ব্যবস্থা করেছিলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিকে সমবায়ের আওতায় এনে সম্মিলিতভাবে ট্র্যাক্টর দিয়ে চাষের উপদেশ দিয়েছেন। বস্তুত, তিনিই সর্বপ্রথম যান্ত্রিক চাষের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এ উন্নতমানের চাষ ও কৃষিকাজে ট্র্যাক্টর ইত্যাদির ব্যবহার সম্বন্ধে তিনি বলেন: “আমাদের দেশের চাষের ক্ষেত্রের উপরে সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানের আলো ফেলিবার দিন আসিয়াছে। আজ শুধু একলা চাষির চাষ করিবার দিন নাই, আজ তাহার সঙ্গে বিদ্বানকে বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হইবে। আজ শুধু চাষির লাঙ্গলের ফলার সঙ্গে আমাদের মাটির সংযোগ যথেষ্ট নয়-- সমস্ত দেশের বুদ্ধির সঙ্গে বিদ্যার সঙ্গে তাহার সংযোগ হওয়া চাই।” 

রবীন্দ্রনাথ উন্নতমানের কৃষিব্যবস্থা নিয়ে হাতে-কলমে যে এক্সপেরিমেন্ট পরিচালনা করেছিলেন তার অংশ হিসেবে তিনি ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে, যা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে অবস্থিত শান্তি নিকেতন থেকে মাইল দুয়েক দূরে, ‘ইন্সিটিটিউট অব রুরাল রিকনস্ট্রাকশন’ নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। ‘ষাট বিঘার মতো ছিল শ্রীনিকেতনের খামারের আয়তন। সেচের জন্য ছিল মাঝখানে একটা বড় দীঘি। গতানুগতিক ফসলের বাইরে শাক-সবজি, ফলমূল উৎপাদনেও নজর দেন তিনি। নজর দেন উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনে। সেই সঙ্গে জমির উর্বরতা যাতে না কমে, সেদিকেও খেয়াল রাখেন। সার, বীজ -- এসবের সুষ্ঠু ব্যবহারে, আর উপযুক্ত সেচে কৃষিতে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন বাড়ানোর কৌশলও হাতে-কলমে শেখানো হয় কৃষকদের। আদর্শ খামার গড়ে আশেপাশের গ্রামবাসীকে ডেকে এনে তাদের তা দেখান। নতুন জ্ঞান তাদের ভেতর ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। আর রবীন্দ্রনাথ যাঁকে এই কাজগুলো করার জন্য নিয়োগ করেছিলেন, তিনি কৃষি অর্থনীতিবিদ ব্রিটিশ যুবক লিওনার্দো এল্মহার্স্ট।’ 

রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের প্রতি জমিদার-মহাজনের অত্যাচার সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। বিপন্ন চাষীদের মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করা, তাদের ঋণমুক্ত করা এবং কুটিরশিল্পের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে তিনি প্রথম শিলাইদহে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। এর প্রায় ১১ বছর পর ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরে অনুরূপ কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতা পেলেও নোবেল পুরস্কারের পুরো অর্থ (১ লাখ ৮ হাজার টাকা) তিনি পতিসর কৃষি ব্যাংকে জমা দেন। তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী: “কৃষি-ব্যাঙ্ক থেকে কর্জ নেবার চাহিদা খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। কালিগ্রাম পরগনার মধ্যে বাইরের মহাজনরা তাদের কারবার গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি কয়েক জন কৃষি-ব্যাঙ্কে ডিপজিট রাখতে আরম্ভ করেছিল। ব্যাঙ্ক খোলার পর বহু গরিব প্রজা প্রথম সুযোগ পেল ঋণমুক্ত হবার।”  পরে অবশ্য জঁৎধষ ওহফবনঃবফহবংং আইন প্রবর্তনের ফলে প্রজাদের ধার দেওয়া টাকা আদায় করা যায়নি, যে কারণে কৃষি ব্যাংক রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের আসল টাকা বিশ্বভারতীকে ফেরত দিতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথের দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র মৌলিক চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দারিদ্র্যকে একটি বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন, যার নিরসনে প্রয়োজন ছিল নানান ধরনের উদ্যোগ। তাঁর দারিদ্র্যের সংজ্ঞা ব্যাপক এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যাতে উন্নতমানের জীবনযাপন করতে পারে তা তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়: “কোনোমতে খেয়ে-পরে টিকে থাকতে পারে এতটুকু মাত্র ব্যবস্থা কোনো মানুষের পক্ষেই শ্রেয় নয়, তাতে তার অপমান। যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্ত অর্থ, উদ্বৃত্ত অবকাশ মনুষত্ব চর্চার পক্ষে প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন।”  তিনি অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি প্রজাদের মানসিক, শারীরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি পরিবেশগত উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।

পল্লী উন্নয়ন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা ও চর্চায় মানুষের আত্মশক্তি ও আত্মোন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ‘ফুল ফোটানো’ কবিতায় লিখেছেন:
“তোরা কেউ পারবি নে গো,
                পারবি নে ফুল ফোটাতে।
যতই বলিস, যতই করিস,
                যতই তারে তুলে ধরিস,
ব্যগ্র হয়ে রজনীদিন
                                                                            আঘাত করিস বোঁটাতে                                                                        তোরা কেউ পারবি নে গো,
                পারবি নে ফুল ফোটাতে।” 

ফুলের উদাহরণ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন, ফুলের যেমন স্বাভাবিক ধর্ম প্রস্ফূটিত হওয়া, আত্মশক্তি বা নিজ অন্তর্নিহিত শক্তিতে বলীয়ান, সৃজনশীল মানুষের পক্ষেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারাটাও স্বাভাবিক। সে ধরনের শক্তি-সামর্থ্য নিয়েই তার সৃষ্টি। বস্তুতঃ সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শক্তি নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে তার জন্ম, যাতে সে স্বনির্ভর হতে পারে। ফুল ফোটানোর জন্য যেমন টানাটানি করতে হয় না, তেমনিভাবে জোর করে কারও দারিদ্র্য দূর করারও প্রয়োজন পড়ে না এবং তা সম্ভবপরও নয়। তবে ফুল ফোটানোর জন্য যথাযথ পরিচর্যা ও একটি অনুকূল বা সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন, যা মালি নিশ্চিত করতে পারে। তেমনিভাবে মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস তথা আত্মশক্তি জাগ্রত ও তার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হলে, তার পক্ষেও নিজের জীবনের হাল ধরা সম্ভব। 

আত্ম ও আত্মনির্ভরশীল উন্নয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে’ চেয়েছিলেন। তিনি তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মোদ্যমকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি দূর করতে চেয়েছিলেন তাদের অদৃষ্টবাদকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ফুলের ফোটা যেমন স্বাভাবিক, মানুষের পক্ষেও নিজের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারাও স্বাভাবিক। মানুষের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেন: “আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ধন নিহিত আছে, এই সহজ কথাটি বুঝলে এবং কাজে খাটালে তবেই আমরা দারিদ্র্য থেকে বাঁচব।”  তিনি আত্মশক্তিকেই মানুষের মূল সম্পদ হিসেবে মনে করেছিলেন।

তাই তিনি দরিদ্রদেরকে জাগিয়ে তোলার ওপর জোর দেন: 
“... এই-সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে
দিতে হবে ভাষা; এই-সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে--
‘মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে;
যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা-চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে;
যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে
পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে;” 

তিনি এদেশের অবহেলিত নারী সমাজকে অবহেলিত গ্রামের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং নারীদের অবস্থার উন্নয়নে নিবেদিত ছিলেন। তিনি তাদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছিলেন।

দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ সংগঠিত হওয়ার ও সংগঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি লিখেন: “ভালো করিয়া ভাবিয়া দেখিলেই দেখা যাইবে, দারিদ্র্যের ভয়টাও এই ভূতের ভয়, এটা কাটিয়া যায় যদি আমরা দল বাঁধিয়া দাঁড়াইতে পারি। বিদ্যা বলো, টাকা বলো, প্রতাপ বলো, ধর্ম বলো, মানুষের যা-কিছু দামী এবং বড়ো, তাহা মানুষ দল বাঁধিয়াই পাইয়াছে।” 

সংগঠন তৈরির লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ সমবায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সমাজের সকল ক্ষেত্রকে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, এককভাবে কারো পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এবং সে কারণেই তিনি সমবায়-পদ্ধতি প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৃষকদের লক্ষ করে তিনি বলেন: “ইহাদিগকে বুঝাইয়া দিতে হইবে, যাহা একজনে না পারে তাহা পঞ্চাশ জনে জোট বাঁধিলেই হইতে পারে। তোমরা যে পঞ্চাশ জনে চিরকাল পাশাপাশি পৃথক পৃথক চাষ করিয়া আসিতেছ, তোমরা তোমাদের সমস্ত জমি হাল-লাঙল গোলাঘর পরিশ্রম একত্র করিতে পারিলেই গরিব হইয়াও বড়ো মূলধনের সুযোগ আপনিই পাইবে। তখন কল আনাইয়া লওয়া, কলে কাজ করা, কিছুই কঠিন হইবে না।” 

তিনি আরও লিখেছেন: “যদি প্রত্যেক চাষা কেবল নিজের ছোটো জমিটুকুকে অন্য জমি হইতে সম্পূর্ণ আলাদা করিয়া না দেখিত, যদি সকলের জমি এক করিয়া সকলে একযোগে মিলিয়া চাষ করিত, তবে অনেক হাল কম লাগিত, অনেক বাজে মেহন্নত বাঁচিয়া যাইত। ফসল কাটা হইলে সেই ফসল প্রত্যেক চাষার ঘরে ঘরে গোলায় তুলিবার জন্য স্বতন্ত্র গাড়ির ব্যবস্থা ও স্বতন্ত্র মজুরি আছে; প্রত্যেক গৃহস্থের স্বতন্ত্র গোলাঘর রাখিতে হয় এবং স্বতন্ত্রভাবে বেচিবার বন্দোবস্ত করিতে হয়। যদি অনেক চাষী মিলিয়া এক গোলায় ধান তুলিতে পারিত ও এক জায়গা হইতে বেচিবার ব্যবস্থা করিত তাহা হইলে অনেক বাজে খরচ ও বাজে পরিশ্রম বাঁচিয়া যাইত। যার বড়ো মূলধন আছে তার এই সুবিধা থাকাতেই সে বেশি মুনাফা করিতে পারে, খুচরো খুচরো কাজের যে-সমস্ত অপব্যয় এবং অসুবিধা তাহা তার বাঁচিয়া যায়।” 

পল্লী উন্নয়ন কাজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। ১৯০৮ সালে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে সভাপতি হিসেবে দেওয়া এক বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন: “তোমরা যে পারো এবং যেখানে পারো এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো, গ্রামবাসীদের বাসস্থান যাতে পরিছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর হয় তাহাদের মধ্যে সেই উৎসাহ সঞ্চার করো; এবং যাহাতে তাহারা নিজেরা সমবেত হইয়া গ্রামের সমস্ত কর্তব্য সম্পন্ন করে সেইরূপ বিধি উদ্ভাবিত করো। এই কর্মে খ্যাতির আশা করিয়ো না, এমনকি গ্রামবাসীদের নিকট হইতে কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে বাধা ও অবিশ্বাস স্বীকার করিতে হইবে।” 

রবীন্দ্রনাথের উন্নয়ন ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন। তাঁর মতে আত্মনির্ভরশীলতাই আত্মশাসনের পথ। তিনি লিখেছেন: “আমার প্রস্তাব এই যে বাংলাদেশের যেখানে হোক একটি গ্রাম আমরা হাতে নিয়ে তাকে আত্মশাসনের শক্তিতে সম্পূর্ণ উদ্বুধিত করে তুলি। সে গ্রামের রাস্তা-ঘাট, তার ঘর বাড়ির পরিপাট্য, তার পাঠশালা, তার সাহিত্যচর্চা ও আমোদ প্রমোদ, তার রোগী পরিচর্যা ও চিকিৎসা, তার বিবাদ নিষ্পত্তি প্রভৃতি সমস্ত কার্যভার সুবিহিত নিয়মে গ্রামবাসীদের দ্বারা সাধন করাবার উদ্যোগ আমরা করি।” 

রবীন্দ্রনাথ যথার্থ স্বরাজ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন: “অতএব আর দ্বিধা না করিয়া আমাদের গ্রামের স্বকীয় শাসনকার্য আমাদিগকে নিজের হাতে লইতেই হইবে। সরকারি পঞ্চায়েতের মুষ্টি আমাদের পল্লীর কণ্ঠে দৃঢ় হইবার পূর্বেই আমাদের নিজের পল্লী-পঞ্চায়েৎকে জাগাইয়া তুলিতে হইবে। চাষিকে আমরাই রক্ষা করিব, তাহার সন্তানদিগকে আমরাই শিক্ষা দিব, কৃষির উন্নতি আমরাই সাধন করিব, গ্রামের স্বাস্থ্য আমরাই বিধান করিব এবং সর্বনেশে মামলার হাত হইতে আমাদের জমিদার ও প্রজাদিগকে আমরাই বাঁচাইব। এ সম্বন্ধে রাজার সাহায্য লইবার কল্পনাও যেন আমাদের মাথায় না আসে -- কারণ, এ স্থলে সাহায্য লইবার অর্থই দুর্বলের স্বাধীন অধিকারের মধ্যে প্রবলকে ডাকিয়া আনিয়া বসানো।” 

রবীন্দ্রনাথ সরকারের ওপর নির্ভরশীলতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি লিখেছেন: “যে কর্ম সমাজ সরকারের দ্বারা করাইয়া লইবে, সেই কর্ম সম্বন্ধে সমাজ নিজেকে অকর্মণ্য করিয়া তুলিবে। অথচ এই অকর্মণ্যতা আমাদের দেশের স্বভাবসিদ্ধ ছিল না।” 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসাম্প্রদায়িকতার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং হিন্দু-মুসলমান সবাইকে নিয়ে কাজ করেছিলেন। ‘গোরা’ উপন্যাসে তিনি লিখেছেন: ”আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।” 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারিতে ম্যজিস্ট্রেটের অনুগত সরকারি পঞ্চায়েতের পরিবর্তে ‘মণ্ডলীপ্রথা’ তথা এক ধরনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে স্বরাজ স্থাপন বা স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। মণ্ডলীপ্রথা সম্পর্কে তিনি বলেন: “কতগুলি পল্লী লইয়া একটি মণ্ডলী স্থাপিত হইবে। সেই মণ্ডলীর প্রধানগণ যদি গ্রামের সমস্ত কর্মের এবং অভাব মোচনের ব্যবস্থা করিয়া মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পর্যাপ্ত করিয়া তুলিতে পারে তবেই স্বায়ত্তশাসনের চর্চা দেশের সর্বত্র সত্য হইয়া উঠিবে। নিজের পাঠশালা, শিল্প শিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্যভাণ্ডার ও ব্যাঙ্ক স্থাপনের ইহাদিগকে শিক্ষা সাহায্য ও উৎসাহ দান করিতে হইবে। প্রত্যেক মণ্ডলীতে একটি করিয়া সাধারণ মণ্ডপ থাকিবে, সেখানে কর্মে ও আমোদে সকলে একত্র হইবার স্থান পাইবে এবং সেইখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধানেরা সালিসের দ্বারা গ্রামের বিবাদ ও মামলা মিটাইয়া দিবে।” 

শচীন্দ্রনাথ অধিকারী তাঁর বইয়ে মণ্ডলীপ্রথা গঠন পদ্ধতি এবং এ পদ্ধতি প্রবর্তন করায় যে উন্নয়ন সাধন হয় একটি বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন: “প্রতিটি মণ্ডলীতে মণ্ডলীর নায়েব বাদে চারজন- দুজন হিন্দু, দুজন মুসলমান সভ্য বা কর্মী নিযুক্ত হতেন। কোন মণ্ডলীতে মুসলমান সভ্য থাকতেন একজন। প্রথমে সপ্তাহে দু-বার, পরে একবার করে এরা মিলিতে হয়ে কাজের ব্যবস্থা করতেন। এর ফলে সদর শিলাইদহ কাছারির গুরুত্ব কমে গেল, বিভাগীয় কাছারিগুলোতে অনেক সেরেস্তা গড়ে উঠল; তার ফলে মুসলমান কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ল। গতানুগতিক পল্লী জমিদারির একটা সাংগঠনিক অভিনবত্ব আত্মপ্রকাশ করল। চাষি-প্রজারা উৎসাহিত হল। ঠাকুরের এস্টেটের খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। প্রাচীন মামুলি সর্বস্ব জমিদারি ব্যবস্থার সংস্কারে ছোট বড় প্রজাসাধারণ বেশ উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল। এ সময়ে চাষিদের ঋণদানের জন্য কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হল কালীগ্রাম ও শিলাইদহ সদর কাছারিতে... দুই জমিদারিতে অনেক সংগঠনমূলক কাজ হল। শালিসি-বিচার প্রবর্তনের ফলে প্রজাসাধারণের অভ্যাসগত অনেক মামলা-মোকাদ্দমার আপস-নিষ্পত্তি হওয়ায় ঐ অঞ্চলের সবাই উপকৃত হল। শিলাইদহ গ্রামের মধ্যে দুটি প্রধান রাস্তা, গোপীনাথ মন্দিরের সংস্কার, দাতব্য চিকিৎসালয়, কুষ্টিয়া-শিলাইদহ রাস্তা ইত্যাদি শিলাইদহের চেহারা বদলে দিল।” 

রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন, শুধুমাত্র কৃষির ওপর নির্ভর করে একটি জাতি বাঁচতে পারে না, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পোন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। তাই রবীন্দ্রনাথ কৃষির পাশাপাশি শিল্পকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি শ্রীনিকেতনে ‘শিল্পভবন’ গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কৃষির পাশাপাশি থাকলেও পরবর্তীতে ‘শিল্পভবন’ স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ যে পল্লীসমাজ গড়ে তুলেছিলেন তার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য ছিল স্বদেশ-শিল্পজাত দ্রব্য প্রচলন এবং তা সুলভ ও সহজপ্রাপ্য করার জন্য ব্যবস্থা এবং সাধারণ ও স্থানীয় শিল্প উন্নতির চেষ্টা করা। তিনি শিলাইদহে তাঁত শিল্পের প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে এখানে তিনি একটি তাঁতের কারখানাও তৈরি করেছিলেন। কুমারখালী এবং শিলাইদহ অঞ্চলে তখন তাঁত ব্যবসার বেশ প্রসার হয়েছিল। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ সমবায়ের মাধ্যমে কুটির শিল্পেরও প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রথীন্দ্রনাথ তাঁর বাবা রবীন্দ্রনাথের কাজের সফলতা সম্পর্কে পিতৃস্মৃতিতে লিখেছেন: “১৩১৫ সালে বাবা যে লিখেছিলেন তাঁর এক চিঠিতেÑ ‘যাতে গ্রামের লোকে নিজেদের হিতসাধনে সচেষ্ট হয়ে ওঠে- পথ-ঘাট সংস্কার করে, জলকষ্ট দুর করে, জঙ্গল পরিষ্কার করে, দুর্ভিক্ষের জন্য ধর্মগোলা বসায় ইত্যাদি সর্বপ্রকারে গ্রাম-সমাজের হিতে নিজের চেষ্টা নিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়Ñ তারই ব্যবস্থা করা গিয়েছে।’ তাঁর দীর্ঘকালের সেই চেষ্টা যে এমন সুফল দিয়েছে তা দেখে আনন্দে মন ভরে গেল।” 

পল্লী উন্নয়ন চিন্তার অন্যতম পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্পর্কিত সৃজনশীল ধারণার শুধু উদ্ভাবকই ছিলেন না, তিনি এগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তাঁর লেখনী ও চর্চা থেকে আমরা যা পাই তা হলো, সংক্ষেপে বলতে গেলে:

(১) দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য শিক্ষা ও আনুসঙ্গিক প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি গ্রামের মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান তথা তাদের চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং তাদেরকে আধুনিক মানসিকতাসম্পন্ন করে তুলতে চেয়েছিলেন।
(২) তিনি জনগণের আত্ম ও আত্মনির্ভরশীল উন্নয়নের জন্য তাদেরকে প্রণোদিত করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা তাদের নিজ ভাগ্য গড়ার কারিগরে পরিণত হতে পারে। একাজে একদল অনুঘটকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মনে করেছিলেন। তিনি দান-অনুদানভিত্তিক পরনির্ভরশীল উন্নয়নের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে, কেউ কারো স্থায়ীভাবে উন্নয়ন করে দিতে পারে না; নিজের উন্নয়নের দায়িত্ব মূলত নিজেকেই নিতে হবে, যে কাজে অন্যরা সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে মাত্র।
(৩) তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা যৌথ কার্যক্রম হাতে নিতে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। তিনি নারী ক্ষমতায়নেও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। 
(৪) তিনি সেক্টর বা খাতভিত্তিক কাজের পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পয়ঃনিষ্কাশন তথা সার্বিক গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে আগ্রহী ছিলেন। তিনি আধুনিক চাষাবাদ ও শিল্পের মাধ্যমে আয়বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ওপর।
(৫) তিনি মণ্ডলীপ্রথা তথা একধরনের স্থানীয় সরকার কাঠমো সৃষ্টির মাধ্যমে অনুঘটকসূলভ স্থানীয় নেতৃত্ব সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যাতে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকে এবং টেকসই হয়।
(৬) তিনি কৃষির পাশাপাশি শিল্প-কারখানা ও কুটির শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

পরিশেষে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর ৭৫ বছর পরও পল্লী উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য দূরীকরণের পন্থা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা ও দিক-নির্দেশনা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বস্তুত, এক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান ধ্যান-ধারণা রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে বেশিদূর এগুতে পারেনি। বস্তুত, তাঁর দারিদ্র্য ভাবনা আমাদের জন্য এখনও বাতিঘর হিসেবে কাজ করে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কর্তৃক সাসটেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট গোলস (এসডিজি) বা ‘এজেন্ডা ২০৩০’ গৃহীত হওয়ার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র দারিদ্র্য ভাবনা যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত এজেন্ডা ২০৩০ কে ‘জনগণের জন্যে, জনগণের দ্বারা, জনগণের’ কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এটি বাস্তবায়নের জন্যও দরকার কমিউনিটি লেড ডেভেলাপমেন্ট (সিএলডি) এপ্রোচ বা জনগণের মালিকানায় পরিচালিত উদ্যোগ। আর এজন্য প্রয়োজন হবে সমাজের সকল স্তরের জনগণকে জাগিয়ে তোলা ও সংগঠিত করা, যাতে তারা তাদের ভবিষ্যতের হাল ধরতে পারে। এজন্য আরও প্রয়োজন হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো-সহ কতগুলো স্বচ্ছ, কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এছাড়াও যেহেতু এজেন্ডা ২০৩০-এর লক্ষ্যগুলো অবিভাজ্য ও পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত, এগুলো আংশিক বা বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি সম্পর্কিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই এ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে না Ñ এজন্য প্রয়োজন হবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ-সহ মানুষের সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন। রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের প্রেক্ষাপটে এ ধারণাগুলোই অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। 

No comments:

Post a Comment