Jul 20, 2016

বেঠিক নির্বাচন সঠিক ফল দেবে কি?

৪ জুন ষষ্ঠ দফায় ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬। সারা দেশে মোট ৪ হাজার ৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছেন, ‘সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’ (প্রথম আলো, ৪ জুন, ২০১৬)। সত্যিই কি তাই হয়েছে?
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে—তা আমরা বুঝব কীভাবে? এ জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। যেমন: (১) ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় যাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাঁরা ভোটার হতে পেরেছেন; (২) যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন; (৩) ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী ছিলেন এবং নির্বাচনটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ; (৪) যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন তাঁরা নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন; এবং (৫) ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে আমরা এর কোনোটিই হতে দেখিনি। তার মানে হলো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এবারের নির্বাচনে আমরা ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্য, নানা ধরনের অনিয়ম ও রক্তক্ষয় লক্ষ করেছি।


ভোটার তালিকায় ত্রুটি
সাম্প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটার তালিকা ছিল ত্রুটিযুক্ত। আমরা জানি, ২০০৮ সালের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ছিল নির্ভুল এবং সেই তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখের কিছু বেশি। এর কারণ হলো, আমাদের প্রায় ১ কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, তাঁদের প্রায় সবাই পুরুষ এবং অনেকেই ভোটার নন। কিন্তু ২০১৪ সালের হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় যে ৪৭ লাখের মতো নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিলেন, তাতে নারী-পুরুষের অনুপাত ৪৪: ৫৬। সর্বশেষ ২০১৫ সালে হালনাগাদ করা তালিকায়ও জেন্ডার গ্যাপ ছিল ৬ শতাংশ। তাই এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ভোটার তালিকা থেকে অনেক যোগ্য নারী ভোটার বাদ পড়ে গেছেন, যা বিদ্যমান তালিকা প্রশ্নবিদ্ধ না করে পারে না।

প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা
সাম্প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গ্রেপ্তার, মামলা-হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিরোধী দলের ও ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই অনেক প্রার্থীই মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। বিএনপির বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অনেক মামলা থাকার কারণে তাঁদের অনেকেই ছিলেন এলাকাছাড়া। এ ছাড়া কেউ কেউ জেলে ছিলেন, যা তাঁদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। এ ছাড়া হুমকি-ধমকি এবং মামলার ভয়ে অনেকেই প্রার্থী হতে চাননি। যে কারণে ছয় ধাপে বিএনপির মতো একটি বড় দলের পক্ষে ৫৫৪টি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হয়নি। উপরন্তু মনোনয়ন-বাণিজ্যের কারণে, যা এবার তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের অনেক যোগ্য প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি।

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়নি
নির্বাচন মানেই অনেকের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া। সঠিক নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকা আবশ্যক, যা এবারকার নির্বাচনে ছিল বহুলাংশে অনুপস্থিত। ২০১১ সালের নির্বাচনে ইউনিয়নপ্রতি চেয়ারম্যান পদে গড়ে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ছয়জন। এবার চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন গড়ে চারজনের কিছু বেশি। এ ছাড়া এবারকার নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ২১৪ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন,
যা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পরিচায়ক নয়। আর এসব ঘটেছে চেয়ারম্যান পদে দলীয়ভাবে নির্বাচনের কারণে।

প্রথম নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে শেষ দফার ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের সার্বিক বিবেচনায় এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সঠিক নির্বাচন বলা যায় না
স্বাধীনভাবে ভোট দিতে না পারা
এবারের ইউপি নির্বাচনে ভোটাররা সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমের সুবাদে সাম্প্রতিক নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, জাল ভোট প্রদানসহ নানা অনিয়মের খবর আমরা জানতে পেরেছি। অনেক ক্ষেত্রে এমনকি নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এতে অংশ নেন। এ ছাড়া এবারকার নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ মারা গেছে। প্রথম আলোর (৬ জুন ২০১৬) পরিসংখ্যান অনুযায়ী অন্তত ১০৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে (সুজন সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী নিহত ১৪৩ জন) এবং পাঁচ সহস্রাধিক আহত হয়েছেন (যদিও অন্য হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি)। ঘোষিত ৩ হাজার ৯৬৫ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে (স্থগিত আছে ১২৩টি) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা গড়ে ৬৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ আসন পেয়ে ২ হাজার ৬৪৭ ইউনিয়নে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীরা গড়ে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ আসন পেয়ে মাত্র ৩৬৭টি ইউনিয়নে জয়ী হয়েছেন, যা অনেকের মনেই সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা
দলগত নির্বাচনের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করার ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম দফা নির্বাচনের আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরে প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের সময় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে মনোনয়নপত্র বাতিল ও ত্রুটিপূর্ণ মনোনয়নপত্র গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে (যুগান্তর, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।

এবারের নির্বাচনে ফলাফল পাল্টানোর অভিযোগ উঠেছে। দ্বিতীয় দফা নির্বাচন শেষে ১৮ এপ্রিল ২০১৬ বাংলাদেশ প্রতিদিনে বিশিষ্ট কবি মোহন রায়হান প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক খোলা চিঠিতে সিরাজগঞ্জ জেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। প্রথম আলোতে প্রকাশিত (২০ মে ২০১৬) এক প্রতিবেদনের হেডলাইন ছিল, ‘মৃতরাও ভোট দিয়েছেন একটি ইউনিয়নে’!

এ ছাড়া নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও এসবের তদন্ত না করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কমিশনের বিরুদ্ধে, যদিও এ ব্যাপারে প্রতিকার করার কমিশনের সুস্পষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অভিযোগকারীদের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। প্রসঙ্গত, নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলায় [৫ বিএলসি (এডি) ২০০০] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে নির্বাচনের সময়ে কারচুপির খবর প্রকাশিত হলে কিংবা এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে, তদন্ত সাপেক্ষে কমিশনের নির্বাচন বাতিলেরও ক্ষমতা রয়েছে। কমিশনের দায়িত্ব এড়ানোর এমন আচরণ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পারে না।

নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া, এটি এক দিনের বা শুধু নির্বাচনের দিনের বিষয় নয়। নির্বাচনের দিনে কত শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়েছে বা কটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তা দিয়ে নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা নিরূপণ করা যায় না। ফলে প্রথম নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে শেষ দফার ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের সার্বিক বিবেচনায় এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সঠিক নির্বাচন বলা যায় না। নির্বাচন কমিশন শুধু সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানেই ব্যর্থ হয়নি, তারা এ ব্যর্থতার দায় না নিয়ে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।

তথ্যসূত্র 

No comments:

Post a Comment