Jul 20, 2016

এ যেন এক দুঃস্বপ্নের নির্বাচন!

ব্যাপক অনিয়ম ও রেকর্ড রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সর্বশেষ ৪ জুন ২০১৬ অনুষ্ঠিত ৬৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও সহিংসতার মাত্রা ছিল ব্যাপক। শুধু নির্বাচনের দিনেই নিহত হন পাঁচজন। গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২৩ ফেব্র“য়ারি ২০১৬ থেকে ৪ জুন ২০১৬ পর্যন্ত মোট ছয় দফা নির্বাচনে ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। তাই এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস নির্বাচন বলে আখ্যা দেয়া যায়। প্রসঙ্গত, দলভিত্তিক নির্বাচনের ফলে যে তৃণমূলেও ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে তা আমরা নির্বাচনের শুরুতেই আশংকা করেছিলাম, যা দুঃখজনক হলেও সত্যে পরিণত হয়েছে।

মূলত, এবারের ইউপি নির্বাচন ছিল এক দুঃস্বপ্ন। কারণ এটি নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রও নয়। আমরা এ নির্বাচনে যে পরিমাণ অনিয়ম, মনোনয়ন বাণিজ্য, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও নেতিবাচক অনুষঙ্গ দেখেছি তা আমলে নিলে এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলংকজনক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হিসেবেও আখ্যা দেয়া যায়।

বাংলাদেশে এর আগে আটবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অতীতের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রাণহানির তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ১৯৯২-এ প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ১৯৮৮ সালে ৮০ জন, ১৯৯৭ সালে ৩১ জন, ২০০৩ সালে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা যায় (ইত্তেফাক, ৪ এপ্রিল ২০১৬)। অতীতের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। অথচ এবারকার নির্বাচনে ১৩২ জন মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।
এবার সহিংসতার ধরনও ছিল ভিন্ন। আগের অন্য নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা হয়েছিল শুধু নির্বাচনের দিনে। কিন্তু এবার নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ হয় এবং তা চলে দীর্ঘমেয়াদিভাবে। প্রাণহানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে ১০ জন, প্রথম ধাপের নির্বাচনের দিন ১১ জন, প্রথম ধাপের নির্বাচনের পর থেকে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১১ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৯ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১৭ জন, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন পাঁচজন, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১০ জন, চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের দিন ৮ জন, চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের পর থেকে ২৩ জন, পঞ্চম দফা নির্বাচনের দিন ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন, পঞ্চম দফা নির্বাচনের পর ৮ জন এবং ষষ্ঠ দফা নির্বাচনের দিন পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক প্রাণহানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১ জন, ঢাকা বিভাগে ২৮, রাজশাহী বিভাগে ১৮, বরিশাল বিভাগে ১৭, খুলনা বিভাগে ১৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩, রংপুর বিভাগে ৭ এবং সিলেট বিভাগে ২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

আমরা দেখেছি যে, আগে নির্বাচনে সহিংসতা হতো আন্তঃদলীয় তথা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু এবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিংসতা হচ্ছে অন্তর্দলীয়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। সুজন সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ নির্বাচনে দলগত পরিচয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী বা সমর্থক ৪৭ জন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ১৫ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৩ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি’র ১ জন, জনসংহতি সমিতির ১ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ৩ জন, মেম্বার প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ৩৬ জন, পুলিশ বাহিনীর সদস্য ১ জন এবং ২৪ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন।

প্রশ্ন হল- নির্বাচনে এই পরিমাণ সহিংসতা কেন হল? আমরা মনে করি, এর তিনটি কারণ ছিল। প্রথমত, সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন উপায়ে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয় প্রায় নিশ্চিত- এমন একটি মানসিকতা প্রার্থীদের মধ্যে কাজ করছে। এছাড়া নির্বাচিত হওয়া মানেই পদ-পদবির মাধ্যমে ‘পেট্রোনেজ চেইনে’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া, হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়া, অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই দেখা যাচ্ছে, যে কোনোভাবে নির্বাচিত হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে প্রার্থীরা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা পেশিশক্তির ব্যবহার করেছেন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় তা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের দুর্বল উপস্থিতির কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় ক্ষমতাসীনদের জোর খাটানো সম্ভব হয়েছে। তৃতীয়ত, দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আমাদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলেই স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি শৃংখলার অভাব রয়েছে। চতুর্থত, দলগত নির্বাচনের কারণে স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করা। পঞ্চমত, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যাওয়া অর্থাৎ অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা রোধে ছিল নির্বাচনের কমিশনের নির্বিকার ভূমিকা।

এসব অনিয়ম ও সহিংসতা থেকে সুস্পষ্ট যে, আমাদের নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে নির্বাচনে ব্যাপক সহিসংতা হলেও ‘অতীতের যে কোনো বারের চেয়ে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ভালো হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ (যুগান্তর, ৫ জুন ২০১৬)। এর আগে ২৮ মে ২০১৬, বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেছিলেন, ‘মারামারি করছে স্থানীয় পর্যায়ে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে এর দায় নেবে? যারা মারামারি করছে এই দায় তাদেরই।’ অর্থাৎ নির্বাচন পরিচালনার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতে রাজি নয় আমাদের নির্বাচন কমিশন। অথচ নির্বাচন পরিচালনার সব প্রকার দায়-দায়িত্ব নেয়ার জন্যই কমিশনের সদস্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং অন্যরা এ কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি। আমাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ ১১৮ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবলই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে।’ এছাড়া আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম মামলার (ডিএলআর ৪৫, ১৯৯৩) রায়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ বলেছেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যা যা করা করণীয়, তার সবই করতে পারবে, এমনকি আইন ও বিধি-বিধানের সংযোজনও করতে পারবে। কিন্তু ক্ষমতা থাকার পরও কমিশন অনেকটাই নির্বিকার, ক্ষমতার যথার্থ প্রয়োগ করেনি।

আমরা মনে করি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অনিয়মের ঘটনা তদন্ত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এক্ষেত্রে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে পারে। নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলায় (৫বিএলসি(এডি)২০০০) বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে, নির্বাচনের সময়ে কারচুপির খবর প্রকাশিত হলে কিংবা এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে, তদন্ত সাপেক্ষে কমিশনের নির্বাচন বাতিলেরও ক্ষমতা রয়েছে। তাই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণে যে কোনো সচেতন নাগরিকই উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

স্থানীয় সরকার হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। কারণ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত, সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে সর্বস্তরে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এমন প্রত্যাশাই ছিল জনগণের। কিন্তু নির্বাচনের নামে রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহতের মতো ঘটনা শুধু আমাদের নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, এর ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থাই পুরোপুরি ভেঙে পড়ার এবং গণতন্ত্র পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। অথচ নির্বাচন হল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি উপায়। এ পথ রুদ্ধ হলে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের চেষ্টা হতে পারে, যা কারও কাম্য হতে পারে না।

পরিশেষে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হলেও আমরা মনে করি, যথাসময়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনটি স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য সুদিন নিয়ে আসবে এবং এ সুদিন আসাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। মূলত, দেশের প্রায় সব সমস্যাই স্থানীয় পর্যায়ের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন থেকে শুরু করে আইনশৃংখলা রক্ষা করা এসব সমস্যাই স্থানীয়। এর সমাধানও স্থানীয়ভাবেই করা দরকার। তাই স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমেই আমরা কার্যকর ও টেকসই সমাধান করতে পারব। এটা আমাদের সাংবিধানিক আকাক্সক্ষাও। এ অবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি সরকারের উচিত হবে এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থকড়ি এবং স্বায়ত্তশাসন দিয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ০৬ জুন, ২০১৬




     

No comments:

Post a Comment