Jul 20, 2016

সংঘাতের রাজনীতি সহিংস নির্বাচন

ইউনিয়ন পরিষদের ষষ্ঠ এবং শেষ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো গতকাল। নির্বাচনের শুরুতে এ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। এর কারণ হলো আমাদের দেশে সাধারণত নির্বাচন একদিকে যেমন উত্সবের আবহ তৈরি করে। ঠিক তেমনি তাদের মনোনিত প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী করে আনে। কিন্তু নির্বাচনে এককেন্দ্রিক ফলাফল, ব্যাপক সংঘাত, সহিংসতা এবং লাশের মিছিল দেখে মানুষের মধ্যে সে আগ্রহ আর নেই। বরং এ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা।

ইতোমধ্যে নির্বাচনী সহিংসতায় সারাদেশে ১২৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় আট হাজার জন আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ২৮ মে ২০১৬ অনুষ্ঠিত পঞ্চম দফা নির্বাচনে দুই প্রার্থীসহ ১২ জন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরও চারজন নিহত হয়েছেন। এজন্য এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস নির্বাচন বলে আখ্যা দেয়া যায়।
প্রসঙ্গত, দলভিত্তিক নির্বাচনের ফলে যে তৃণমূলেও ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে তা আমরা নির্বাচনের শুরুতেই আশঙ্কা করেছিলাম, যা দুঃখজনক হলেও আজ সত্যে পরিণত হয়েছে।

চলমান ইউপি নির্বাচন নির্বাচনও নয়, গণতন্ত্রও নয়। বরং এ যেন এক দুঃস্বপ্ন। নির্বাচনে অনিয়ম, মনোনয়ন বাণিজ্য, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া অর্থাত্ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও নেতিবাচক অনুষঙ্গের দৃশ্যমানতার কারণে এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হিসেবেও আখ্যা দেয়া যায়।

বাংলাদেশে এর আগে আটবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে চলছে নবমবারের নির্বাচন। অতীতের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রাণহানির তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে, ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ১৯৯২-এ প্রাণহানির তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ১৯৮৮ সালে ৮০ জন, ১৯৯৭ সালে ৩১ জন, ২০০৩ সালে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা যায় (ইত্তেফাক, ৪ এপ্রিল ২০১৬)। অতীতের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। অথচ শেষ দফা নির্বাচন বাকি থাকতেই চলমান নির্বাচনে ১২৩ জন নিহত হয়েছেন।

এবার সহিংসতার ধরনও ভিন্ন। আগের অন্য নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা হয়েছিল শুধুমাত্র নির্বাচনের দিনে। কিন্তু এবার নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ হচ্ছে এবং তা চলছে দীর্ঘমেয়াদীভাবে। প্রাণহানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, প্রথম ধাপের নির্বাচনের পূর্বে ১০ জন, প্রথম ধাপের নির্বাচনের দিন ১১ জন, প্রথম ধাপের নির্বাচনের পর থেকে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ১১ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৯ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ১৭ জন, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৫ জন, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ১০ জন, চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের দিন ৮ জন, চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের পর থেকে ২৩ জন, পঞ্চম দফা নির্বাচনের দিন ১৫ জন প্রাণ এবং পঞ্চম দফা নির্বাচনের পর ৪ জন এবং ষষ্ঠ ও শেষ দফা নির্বাচনের দিন কমপক্ষে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

আমরা দেখেছি যে, আগে নির্বাচনে সহিংসতা হতো আন্তঃদলীয় তথা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু এবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিংসতা হচ্ছে অন্তর্দলীয়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পঞ্চম দফা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৩টি ঘটনাই ঘটেছে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থকদের মধ্যে।

বর্তমানে নির্বাচনী সহিংসতা অনেকটাই পৈশাচিক রূপ লাভ করেছে। পঞ্চম দফা নির্বাচনের দিন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল উদ্দিন। অর্থাত্ সহিংসতার মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে তৃণমূলে বিরাজমান আমাদের সম্প্রীতি-সৌহার্দ যে দারুণভাবে বিনষ্ট হচ্ছে তা অনেকটাই স্পষ্ট, যা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না।

প্রশ্ন হলো— নির্বাচনে এই সহিংসতা কেন? আমরা মনে করি, এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সামপ্রতিককালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন উপায়ে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয় প্রায় নিশ্চিত—এমন একটি মানসিকতা প্রার্থীদের মধ্যে কাজ করছে। এছাড়া নির্বাচিত হওয়া মানেই পদ-পদবির মাধ্যমে ‘পেট্রোনেজ চেইনে’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া, হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়া, অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই দেখা যাচ্ছে, যে কোনো নির্বাচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রার্থীরা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা পেশিশক্তির ব্যবহার করছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় তা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের দুর্বল উপস্থিতির কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় ক্ষমতাসীনদের জোর খাটানো সম্ভব হয়েছে। তৃতীয়ত, দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আমাদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলেই স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। চতুর্থত, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যাওয়া অর্থাত্ অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশনের নির্বিকার ভূমিকা।

এসব অনিয়ম ও সহিংসতা থেকে সুস্পষ্ট যে, আমাদের নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে। ২৮ মে ২০১৬, বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেছেন, ‘মারামারি করছে স্থানীয় পর্যায়ে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে এর দায় নেবে? যারা মারামারি করছে এই দায় তাদেরই’ অথচ নির্বাচন পরিচালনার সকল প্রকার দায়-দায়িত্ব নেওয়ার জন্যই কমিশনের সদস্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং অন্যরা এ কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি। আমাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ ১১৮ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবলই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে।’ এছাড়া আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম  মামলার (ডিএলআর ৪৫, ১৯৯৩) রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যা যা করণীয়, তার সবই করতে পারবে, এমনকি আইন ও বিধি-বিধানের সংযোজনও করতে পারবে। কিন্তু ক্ষমতা থাকার পরও কমিশন অনেকটাই নির্বিকার, ক্ষমতার যথার্থ প্রয়োগ করেনি।

আমরা মনে করি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অনিয়মের ঘটনা তদন্ত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এক্ষেত্রে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে পারে। ‘কিন্তু নির্বাচন কমিশন তদন্ত করবে কেন? তদন্ত করবে পুলিশ’—একজন নির্বাচন কমিশনারের এমন বক্তব্য আমাদের রীতিমত হতাশ করে। কারণ নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলায় [৫বিএলসি (এডি) ২০০০] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে, নির্বাচনের সময়ে কারচুপির খবর প্রকাশিত হলে কিংবা এব্যাপারে অভিযোগ করা হলে, তদন্ত সাপেক্ষে কমিশনের নির্বাচন বাতিলেরও ক্ষমতা রয়েছে। তাই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণে যেকোনো সচেতন নাগরিকই উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

স্থানীয় সরকার হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। কারণ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত, সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে সর্বস্তরে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তাই গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল জনগণের। কিন্তু নির্বাচনের নামে রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহতের মতো ঘটনা শুধু আমাদের নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, এর ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থাই পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বে এবং গণতন্ত্র পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। অথচ নির্বাচন হলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি উপায়। এ পথ রুদ্ধ হলে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের চেষ্টা হতে পারে, যা কারো কাম্য হতে পারে না।

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক, ০৫ জুন, ২০১৬ ইং

No comments:

Post a Comment