May 30, 2016

মোজাফ্ফর আহমদ: জাতির বিস্মৃত বিবেক ও অভিভাবক

আমরা জানি, যেকোনো রাষ্ট্রের দুটি অংশ আছে। একটি হলো সরকার, আর আরেকটি জনগণ বা সিভিল। এই সিভিল এবং রাষ্ট্রের সার্বিক দেখভাল করার প্রতিনিধিরাই হলেন ‘সিভিল সোসাইটি’। আর সরকার যেহেতু জনগণের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়, সেহেতু সরকার জনগণের প্রতি তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে কিনা, তা তদারকি করার জন্য একটি সত্যিকার ‘সিভিল সোসাইটি’ প্রয়োজন, যে সিভিল সোসাইটি হবে দলনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক। একই সঙ্গে নাগরিকদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে যাঁরা থাকবেন সদা নিষ্ঠাবান। যেহেতু নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদেরকে নাগরিকদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে হয়, সেহেতু কখনো কখনো তারা সরকারের রক্তচক্ষুর কবলে পড়েন। কিন্তু নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা এ রক্তচক্ষুকে ভয় পান না। কারণ তাঁদের ওপর থাকে জনগণের বিপুল আস্থা ও সমর্থন।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ (১৯৩৬-২০১২) ছিলেন এমনই একজন সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি। মানুষের জন্য কথা বলার কারণে যিনি অনেক সময়ই সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই সমাজের প্রয়োজনে ছুটে গেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মানুষের কল্যাণে সভা-সমিতি, এমনকি রাজপথের আন্দোলনে যেতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। অর্থাত্ তিনি কখনো কারো শর্তে চলেননি, বরং চলেছেন নিজের বিবেকের শর্তের দ্বারা তাড়িত হয়ে।
বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি আজ অনেকটাই বিভক্ত। রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দেনা-পাওনার ভিত্তিতেই এ বিভাজন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ সিভিল সোসাইটি যদি নিরপেক্ষভাবে কোনো বিশেষ মত বা দলের সমর্থক না হয়ে কাজ করতে পারত, তাহলে অতীতের বিভিন্ন সময়ের মতো আজো তা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনত। এ রকম একটি সময়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের গুরুত্ব আমরা অনুভব করছি। যিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন বাংলাদেশে দলনিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটি গড়ে তোলার প্রাণপুরুষ।
ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি সচেতন হওয়া সত্ত্বেও তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ভাষায়, “সক্রিয় রাজনীতির জন্য একটা ভিন্ন রকমের চরিত্রের দরকার যা আমার ছিল না, ছিল দেশকে জানার প্রতি আকর্ষণ।” তবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনে সহমর্মিতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। বিশেষ করে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। তিনি নিজে রাজনীতি না করলেও রাজনীতিকে দেখেছেন, বুঝেছেন এবং রাজনীতির মান ও সংস্কৃতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে চিনি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তরুণ শিক্ষক। আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময়ে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব-মোনায়েমের তাঁবেদাররা অর্থনীতি বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক আবু মোহাম্মদের ওপর হামলা চালায়। একজন সম্মানিত শিক্ষকের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদ ছেড়ে দেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তিনি জীবন-জীবিকার উত্স বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেননি। যৌবনে তাঁর এই যে প্রতিবাদী রূপ, সেটা আমৃত্যু বজায় ছিল।
১৯৯১ সালে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি। যুক্ত হই আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের কাজের সঙ্গে। এ সংস্থার মাধ্যমে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টায় অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সবসময় আমাদের মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করতেন।
বস্তুতই তিনি ছিলেন বড় মাপের একজন অর্থনীতিবিদ। নোবেল বিজয়ী তৈরির কারখানাখ্যাত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘দ্য ডিমান্ড অব লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি মার্টিন মিলার (নোবেল বিজয়ী), মিল্টন ফ্রিডম্যান, বাকার এবং জনসন প্রমুখ খ্যাতিমান পণ্ডিতের সংস্পর্শে আসেন।
অধ্যাপক মোজাফ্ফরের সঙ্গে আমার আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয় ২০০২ সালে। যখন আমরা ‘সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশন’ নামের নাগরিক সংগঠন গড়ে তুলি। সে সময় আমাদের উপলব্ধিতে আসে যে, যদি রাজনীতি কলুষমুক্ত এবং সরকারি নীতি-কাঠামো দরিদ্রবান্ধব না হয়, তাহলে এ দেশের অমিত সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না। এ পরিবর্তন সাধনে সত্, যোগ্য, জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও জয়ী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ লক্ষ্যেই ‘সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশন’ গড়ে তোলা হয়। এ সংগঠন ২০০৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় ৫৫টি ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে তা ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করে। একই সঙ্গে প্রার্থীরা মুখোমুখি হন ভোটারদের। এ অভিজ্ঞতা ছিল ইতিবাচক। পরে জরিপে দেখা গেছে, এ ধরনের উদ্যোগের কারণে অনেক ভোটার তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন এবং অপেক্ষাকৃত যোগ্যরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। এ উদ্যোগের কারণে নির্বাচনী সহিংসতাও প্রায় ঘটেনি। এর ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদসহ সব ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষা, পেশা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান, আয়-ব্যয় ইত্যাদি সর্বসমক্ষে প্রচারের দাবি তুলি এবং তার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা হতে থাকে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালত থেকেও এর সপক্ষে মেলে ঐতিহাসিক রায়। এসব কাজের ফলে ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের যাবতীয় তথ্য তুলে ধরা সহজ হয়।
পরবর্তী সময়ে আমরা উপলব্ধি করি যে, শুধু সত্-যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হলেই চলবে না, পদ্ধতিগত সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা চাই। এজন্য সার্বিক সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়, যার অংশ ছিল নির্বাচনী পদ্ধতি সংস্কার, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, প্রার্থীদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য প্রদান ইত্যাদি। এ কাজের জন্য আমাদের নাগরিক সমাজের সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’ রাখা হয়। এ সংগঠন সারা দেশে ব্যাপক কার্যক্রম ও জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করে চলেছে। অনেক বিশিষ্ট নাগরিক এ কাজে যুক্ত হতে থাকেন। তবে সিপাহসালার ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। তাঁর সভাপতিত্বে এবং যোগ্য নেতৃত্বে ও উত্সাহে আমরা এ কাজ অব্যাহত রাখতে পারি। সুজন বর্তমানে সারা দেশে একটি পরিচিত ও মর্যাদাবান সংগঠনের নাম।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ তাঁর কর্মজীবনে যেখানেই কাজ করেছেন, সেখানেই সততা, যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে তাঁর দীর্ঘ পথচলায় যেমন অনেক সংগঠন তৈরি করেছেন, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানকে পৌঁছে দিয়েছেন উন্নতির শিখরে। যেখানেই তিনি কাজ করতেন, সেখানেই তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশের জন্য কিছু একটা করা।
তিনি ব্যাংকে কাজ করেছেন, কাজ করেছেন পূর্ব-পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা-ইপিআইডিসিতে। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে অতি দ্রুত প্রথম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পরিচালক হিসেবে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৮৮ জন শিক্ষককে বিদেশে উচ্চতর লেখাপড়া করানোর ব্যবস্থা করা, সেখানকার গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধ করা এবং বিভিন্ন নতুন বিভাগ চালু করাসহ সার্বিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানকে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে যান।
‘দুর্নীতির লাগাম কীভাবে টেনে ধরা যায়’ তার ভূমিকায় টিআইবি যে কাজ করে যাচ্ছে, তার সার্থক রূপকার ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, টিআইবির দেয়া তথ্য যথারীতি প্রত্যাখ্যান করলেও সাধারণ জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। অর্থাত্ নৈতিকতার পরীক্ষায় তিনি ছিলেন দুর্নীতিমুক্ত, সত্, নির্ভীক, উদার, নিরহঙ্কারী, সামাজিক কর্মচঞ্চল ও আপসহীন।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর ছাত্রজীবন থেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মাচরণ করতেন। তিনি যে একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন, তার প্রথম প্রেরণা আসে তার গভীর ধর্মবিশ্বাস থেকে। আর ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কঠিন ও কোমলে মেশানো একজন মানুষ।
২২ মে ছিল অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। তার মৃত্যু ছিল দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ তাকে যথার্থভাবেই বলতে পারি জাতির বিবেক ও অভিভাবক। এ শূন্যস্থান সহজে পূরণ হবে না। তবে তিনি তার জনহিতকর কাজের মধ্য দিয়ে যে পরিচয় ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়েই সে ক্ষতি আমাদের পুষিয়ে নিতে হবে। এজন্য তিনি পরিবেশ উন্নত করা, শিক্ষার প্রসার ও মান বাড়ানো, দুর্নীতি নির্মূল করা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সর্বক্ষেত্রে অনুসরণসহ যেসব ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন, তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আসুন সবাই আরো সক্রিয় হই। বিশেষভাবে বলব, যারা তাঁকে ভালোবেসেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন, তারা সবাই এগিয়ে আসুন। এভাবেই আমরা তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারি।

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা, ২০১৬-০৫-২৫

No comments:

Post a Comment