May 30, 2016

চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচন: সহিংসতা ও অনিয়ম পিছু ছাড়েনি

দেশে চলমান নবম ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের চতুর্থ ধাপেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ইউপি নির্বাচনের প্রথম তিন ধাপে ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মের পরও চতুর্থ ধাপের ভোটগ্রহণে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপের বাস্তবায়ন নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ভোটগ্রহণকালে ব্যাপক সংঘর্ষ ও অনিয়ম হয়। স্থানীয় সরকার হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। তাই গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এমন প্রত্যাশা জনগণের। কিন্তু সরকার দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনের নামে রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহতের মতো ঘটনায় গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করছে, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নির্বাচন। এর চেয়ে দুঃখজনক কী হতে পারে! চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনেও ৮ জন নিহত হয়েছেন। চলমান ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সংঘর্ষ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধের জেরে নিহত হয়েছেন ৭৮ এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি।
প্রাণহানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের ৩৫টি জেলায় এই হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে। প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে ১০, নির্বাচনের দিন ১১ ও নির্বাচনের পর থেকে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৯, নির্বাচনের পর থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১৭, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৫ ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের জীবনের কি কোনো দাম নেই? অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। প্রথম ধাপ থেকে শুরু করে চতুর্থ ধাপের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর এই সংখ্যা ১৫০-এ দাঁড়িয়েছে। প্রথম ধাপে ৫৪, দ্বিতীয় ধাপে ৩৪, তৃতীয় ধাপে ২৯ ও চতুর্থ ধাপে ৩৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তারা সবাই আওয়ামী লীগের। এর আগে ১৯৮৮ সালের ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ১০০ জন। বিষয়টি হাস্যকর ছাড়া কিছুই নয়! চার ধাপে শেষ হওয়া নির্বাচন একটি বিকৃত নির্বাচন, গণতন্ত্র ধ্বংস করার নির্বাচন। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এবার ইউপি নির্বাচনে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের পরের দিন পর্যন্ত সহিংসতা চলমান ছিল। দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনে দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইউপির সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসির ব্যর্থতাই বলে দেয়, এ নির্বাচনে একটি দলের একক কর্তৃত্ব ছিল। নির্বাচনে সহিংসতা ঘটে। তবে এবারের নির্বাচনে সহিংসতার মাত্রাটি ছিল বেশ ভয়াবহ। এবারের নির্বাচনী সহিংসতার মাত্রাটি দীর্ঘমেয়াদি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এখন পর্যন্ত এ সহিংসতা চলছে। এটি অতীতে দেখা যায়নি। যাহোক, এ সহিংসতার মাধ্যমে যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, এটি তৃণমূল পর্যায়ের সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যটি দারুণভাবে বিনষ্ট করবে বলে আমার ধারণা। এ সহিংসতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতার অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে হয়েছে। তাদেরই রক্ত ঝরছে। তারাই এর ভিকটিম হয়েছেন এবং মাশুল দিচ্ছেন।
চার দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত ও বিকৃত হয়েছে। এবারের নির্বাচন অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি প্রাণের গুরুত্ব আছে। আবারও প্রাণহানি না হওয়াটাও নির্বাচন সুষ্ঠুতার একক মানদ- নয়। কারণ অস্ত্র দেখলেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা আগেই সরে যান। ইউপি নির্বাচন এক ধাপ শেষ হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, আগামী ধাপে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। একে একে চতুর্থ ধাপের নির্বাচন শেষ হয়েছে। কোনো ধাপের নির্বাচনই নির্বাচন কমিশন করতে পারেনি। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন পুরোপুরি ব্যর্থ। প্রমাণ হয়ে গেছে, তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই ব্যর্থতার দায় নিয়েই তাদের সরে দাঁড়ানো উচিত।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন। এতে অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে দুপুরের আগেই চট্টগ্রামে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন মনজুর আলম। ঢাকায় একই ঘোষণা দেন মির্জা আব্বাসের পক্ষে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস ও তাবিথ আউয়াল। এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে সরকার-সমর্থক নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার শিকার হয়েছেন ২১ সাংবাদিক। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২৩০টি পৌর নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ আনে বিএনপি। এই নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত হন দুজন ও আহত হন দুই শতাধিক। লিখিত অভিযোগ করলেও ইসি এর সত্যতা খুঁজে পায়নি, ব্যবস্থা নেয়নি। এতে কি প্রমাণ হয় না, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ইসি? সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব ইসির। ওই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অবশ্যই তাদের সরে যেতে হবে। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ ১১৮ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবলই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে।’ কিন্তু ক্ষমতা থাকার পরও ইসি একেবারেই চুপ, কোথাও ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। দৃশ্যমান কোনো অ্যাকশন দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইসিকে সাংবিধানিকভাবেই অনেক ক্ষমতা দেওয়া হলেও এর ব্যবহার দেখা যায় না। উল্টো ইসি সহিংসতার দায় দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কমিশনের হাতে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কঠোর না হওয়ার ফলে সহিংসতা ও অনিয়ম বাড়ছে। ইসি তার ক্ষমতা ব্যবহার করলে ভোটগ্রহণ আরও সুষ্ঠু হতো। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসি ব্যর্থ।
আমাদের আশঙ্কা যে, এর চর্চা সংক্রামক ব্যাধির মতো ভবিষ্যতে রাজনীতির সব স্তরে আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আরেকটি অনাকাক্সিক্ষত দিক হলো পেশিশক্তির প্রয়োগ ও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন। এবারকার ইউপি নির্বাচনে এটি বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী নির্বাচনগুলোয় এ সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না।
অতীতের নির্বাচনেও রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহত হওয়া- সর্বপ্রকার ঘটনাই ঘটেছে। এসব বন্ধ করতে না পারলে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না। ক্ষমতার বলে ভোটকেন্দ্রে যা খুশি, তা-ই করবে- এটি হতে পারে না। যথাযথ ও যৌক্তিক কাজটি নিরপেক্ষভাবে করে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ ও গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। সামনের নির্বাচনগুলো সামনে রেখে যদি এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হয়, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সবাইকেই এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে এর পরিণতি নিয়ে। যদি নির্বাচনী এ অবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে না পারি, তাহলে পুরো জাতিকেই এর মাশুল দিতে হবে।

তথ্যসূত্র: আমাদের সময়, ১০ মে ২০১৬

No comments:

Post a Comment