Mar 21, 2016

নির্বাচন বিকৃত হলে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়

ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপের নির্বাচনের প্রায় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি শুধু ২২ মার্চের ভোটাভুটি। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না ভোটের দিন কী ধরনের পরিবেশ বিরাজ করবে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না। তবে এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা পর্বে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের একটি বিকৃত ধরনের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকের আশঙ্কা।
প্রথম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হলো তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্য। আমাদের দেশে অতীতেও মনোনয়ন-বাণিজ্য ছিল, কিন্তু তা ছিল ওপরের স্তরে, মূলত সংসদ নির্বাচনে। লাখ লাখ, এমনকি কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বিক্রির অভিযোগ আমরা শুনেছি। অতীতে এ ধরনের অভিযোগ ছিল বড় বড় নেতার বিরুদ্ধে এবং এগুলো ছিল অনেকটা গুজবের মতো। কারণ, এ ব্যাপারে কেউ কখনো মুখ খোলেনি এবং কারও বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগও আনেনি। তবে এর ব্যাপকতা সম্পর্কে অনেকের মনেই কোনো সন্দেহ নেই। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মনোনয়ন-বাণিজ্যের কারণেই আমাদের জাতীয় সংসদ এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত এবং রাজনীতি চরমভাবে কলুষিত।

এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ কিন্তু গোপনে, রাখঢাক করে, আকারে-ইঙ্গিতে বা ফিসফিস করে তোলা হচ্ছে না। এগুলো এখন সরবে, সুস্পষ্টভাবে এবং নামধাম উল্লেখ করে উচ্চারিত হচ্ছে (যুগান্তর, ১১ মার্চ ২০১৬)। খবরের কাগজ খুললে প্রায় প্রতিদিন এ ধরনের অভিযোগ চোখে পড়ে এবং ভুক্তভোগীরাই এসব অভিযোগ তুলছেন।
এটি স্পষ্ট যে আমাদের দেশে রাজনীতি এখন একটি লাভজনক ব্যবসা। মূলত, মনোনয়নের বিনিময়ে লেনদেনই আমাদের রাজনীতিকে এখন একটি ‘অনন্য’ বা ব্যতিক্রমী ব্যবসায়িক খাতে পরিণত করেছে। চাল-ডালের ব্যবসার মতো এতে কোনো পুঁজি লাগে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটি সত্য যে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ ধরনের ব্যবসায়ের পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নতুন একদল ‘ব্যবসায়ীর’ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা যে এর চর্চা সংক্রামক ব্যাধির মতো ভবিষ্যতে রাজনীতির সব স্তরে আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
টাকা দিয়ে বা বস্তুগত কিছুর বিনিময়ে ভোট কেনাবেচার সংস্কৃতি আমাদের দেশে বহুদিন থেকেই চলে আসছে। তবে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিস্তৃতি আমাদের নির্বাচনে টাকার খেলাকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। আমরা এখন সত্যিকার অর্থেই ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন উত্তম গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়েছি। অর্থাৎ, আমাদের রাজনীতি এখন কলুষতার দিক থেকে ষোলোকলায় পূর্ণ হলো।
এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত দিক হলো পেশিশক্তির প্রয়োগ ও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন। অতীতেও আমাদের নির্বাচনে হানাহানি ও সহিংসতার সমস্যা ছিল। নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ক্ষেত্র ছাড়া এসব সহিংসতা সাধারণত ঘটেছে নির্বাচনের দিনে এবং জয়-পরাজয়ের উত্তাপে। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য সহিংসতা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সব কটি নির্বাচনেই সহিংসতা একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এটি বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার কারণে অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ মার্চ ২০১৬)। অনেক আগে থেকেই এগুলো শুরু হয়েছে এবং অনেকের আশঙ্কা যে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের অন্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দিক হলো বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, প্রথম ধাপের নির্বাচনে ১১৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে তাদের কোনো প্রার্থী নেই এবং অন্তত ৮৩টি ইউনিয়নে ক্ষমতাসীনদের বাধার কারণে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি (প্রথম আলো, ১২ মার্চ ২০১৬)। এ ধরনের বাধা শুধু বিএনপির ক্ষেত্রেই ঘটেনি, সরকারি দলের বিদ্রোহী, এমনকি মহাজোটের শরিকদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। যাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পেরেছেন, তাঁদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন ধরনের হামলা-হয়রানির সম্মুখীন বলে অভিযোগ উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দুজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অবরুদ্ধ অবস্থায় নিজ নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সাধ মিটে যাওয়ার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে যাতে বাড়ি থাকতে পারেন, সেই আকুতি জানান (মানবজমিন, ১২ মার্চ ২০১৬)।
এবারকার সংঘাত-সহিংসতার একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো এগুলো ঘটছে মূলত ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে, তাদের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। এর মূল কারণ হলো, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রাপ্তি পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে বিজয় হওয়া প্রায় নিশ্চয়তার পর্যায়ে নিয়ে যায়। এ কারণেই এবারকার নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য ও দ্বন্দ্ব-হানাহানির ব্যাপকতা, যা ক্ষমতাসীন দলকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিভিন্ন ধরনের হুমকি, হয়রানি ও বাধা দেওয়ার কারণে প্রথম ধাপে ৬২টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন, যা অভূতপূর্ব। এ ধরনের ঘটনা অতীতে কোনো দিন ঘটেনি। দুর্ভাগ্যবশত, এসব অনিয়ম ও নির্বাচনী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি (প্রথম আলো, ১২ মার্চ ২০১৬)।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে রয়েছে চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক নির্বাচনের একটি অর্বাচীন সিদ্ধান্ত। কোনো ধরনের ভাবনাচিন্তা না করে, বিশেষত ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ক্ষমতা দখলের এবং আঁকড়ে ধরে থাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বিবেচনায় না নিয়েই এবং কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মনোনয়ন দেওয়ার পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করেই দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে, মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচার হচ্ছে। যেমন, ক্ষমতাসীনদের দলের মনোনয়নের ক্ষেত্রে সাংসদদের কোনো ধরনের ভূমিকা না থাকার নির্দেশনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, দলীয় নেতাদের সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের সাংসদ (যিনি মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য) এককভাবে মনোনয়ন দেন, জেলা পর্যায়ের নেতারা যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া মনোনয়ন দেওয়ার বাঁধাধরা কোনো পদ্ধতি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দলের পরীক্ষিত, এমনকি কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন পেয়েছেন ক্ষমতাধরদের অনুগত ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা।
প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন-প্রক্রিয়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সুস্পষ্ট করা আছে, যদিও আমাদের বিদ্যমান যথেচ্ছাচারিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এগুলো উপেক্ষাই করে আসছে।
এটি সুস্পষ্ট যে ক্রমবর্ধমান মনোনয়ন-বাণিজ্য এবং মামলা-হামলা ও সহিংসতা আমাদের একটি বিকৃত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের বিকৃত নির্বাচন আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পারে না। আর যখন নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন নির্বাচন আর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পন্থা হিসেবে থাকে না এবং নাগরিকেরা এর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, যার পরিণতি অশুভ হতে বাধ্য। এ এফ এম শাহ আলম বনাম মুজিবুর রহমান মামলার রায়ে [৪১ ডিএলআর(এডি)(১৯৮৯)৷ বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী আমাদের সুস্পষ্টভাবে হুঁশিয়ার করেছেন যে বিকৃত বা ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment