Feb 28, 2016

গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভাঙবে

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা ২০০৮ ধারা ৯ (খ) অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হিসাব প্রতিবছর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ১২ জুন ২০১৩, তথ্য অধিকার আইনের অধীনে এ হিসাব পেতে আমি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করি। তিন-তিনবার কমিশনে আবেদন করেও এ তথ্য পেতে ব্যর্থ হই।
কমিশন যুক্তি দেয় যে, এগুলো রাজনৈতিক দলের গোপনীয় হিসাব এবং এগুলো আমাদের হয় দলগুলো থেকে সরাসরি পেতে হবে অথবা কমিশনের এগুলো দিতে হলে দলগুলোর অনুমতি লাগবে। তথ্য কমিশনে দুই-দুইবার আপিল করেও আমরা ব্যর্থ হই এবং তথ্য কমিশনও প্রায় একই যুক্তিতে আমাদের আপিল নাকচ করে দেয়। এর বিরুদ্ধে জানুয়ারি ২০১৫ সালে আমরা ছয়জন নাগরিক—হাফিজ উদ্দিন খান, এ এস এম শাহজাহান, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. তোফায়েল আহমদ, আলী ইমাম মজুমদার ও আমি—হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি মামলা করি।

চূড়ান্ত শুনানির পর মাননীয় বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও কাজী ইজারুল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নির্বাচন ও তথ্য কমিশনের রাজনৈতিক দলের তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক রায় দেন। মামলাটি পরিচালনা করেন ড. শরিফ ভূঁইয়া ও তানিম হোসেন শাওন।
হাইকোর্টের দেওয়া যুগান্তকারী রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, এর মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ বহুলাংশে উন্মুক্ত হলো এবং গোপনীয়তার সংস্কৃতির অবসান ঘটল। অর্থাৎ এখন থেকে যেকোনো ‘কর্তৃপক্ষ’ বা সরকারি দপ্তরে সংগৃহীত তথ্য—সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া (যেমন, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া)—যেকোনো নাগরিক বা গণমাধ্যমের পাওয়ার পথের প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হলো। কারণ এগুলো এখন থেকে আর গোপনীয় তথ্য নয়; বরং পাবলিক ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার তার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকার হিসেবে আবারও স্বীকৃতি পেল। কারণ নাগরিকের মত প্রকাশের জন্য তার মত গঠন আবশ্যক, যার জন্য তথ্য অপরিহার্য। তৃতীয়ত, এ প্রগতিশীল রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথ প্রশস্ত হলো।
আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের আখড়ায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বস্তুত, রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই দেশে অনেক অপকর্ম হয়ে থাকে। আর রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের অধীনে কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, যা করাও যৌক্তিক। কারণ যেসব প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থের কাজ করে তারাই তথ্য অধিকার আইনের অধীনে কর্তৃপক্ষ হওয়া উচিত এবং তাদের জনস্বার্থে নাগরিকদের তথ্য প্রদানে কোনোরূপ বাধা থাকা অনুচিত। প্রসঙ্গত, আইনে নির্ধারিত করা না থাকলেও ভারতীয় তথ্য কমিশন ইতিমধ্যেই ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো,

No comments:

Post a Comment