Jan 23, 2016

দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অযৌক্তিক

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৩৫টি পৌরসভায় মেয়র পদে দলভিত্তিক নির্বাচন। এরপর ইউনিয়নেও চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনী আনা হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনও দলভিত্তিক নির্বাচনের লক্ষ্যে আচরণবিধি সংশোধনের কাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলভিত্তিক কি কাক্সিক্ষত? সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়াটা জরুরি, কারণ নির্বাচন না হলে আইনগতভাবে পরিষদ গঠিত হয় না। আর পরিষদ গঠিত না হলে সংবিধান লঙ্ঘন হয়। সংবিধানের ৫৯ ধারায় প্রশাসনের সকল একাংশ বা স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার বাধ্যকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।
আর প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। তবে দলভিত্তিক নির্বাচন কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না বলেই আমাদের আশঙ্কা।

স্থানীয় সরকার, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের দোরগোরায় সরকার। তাই ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে (গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি) বা তৃণমূলের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম হয়। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনা করলে তৃণমূলে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি দলভিত্তিক হলে কিংবা নির্দলীয় হলে তাতে কিছু আসে যায় না। উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার সুযোগ পান। তাই শুধু দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমেই ইউনিয়ন পর্যায়ে তথা তৃণমূলে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে- এই যুক্তি ধোপে টেকে না।
আমাদের সংবিধানের ৫৯(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের আর একটি উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণমূলক সরকারি সব সেবা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তথা জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখা। জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। তাদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ। এই দুটি কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হতে হলে কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে অধিক সম্পদ, দায়িত্ব ও স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর কর্মসূচি। এসবই সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ক্ষেত্রেও নির্বাচন দলভিত্তিক হলো কি না হলো, তাতে কিছু আসে যায় না। সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদ হস্তান্তর সম্ভব। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্যও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলভিত্তিক করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বরং পৌর নির্বাচনে আমরা দেখেছি যে, দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে সহিংসতা ও হানাহানি তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সহিংসতা শুধু প্রধান দলগুলোর পরস্পরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দলের অভ্যন্তরেও ঘটেছে। তাই আমাদের আশঙ্কা যে, ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সহিংসতা আরও বিস্তৃতি লাভ করবে। উদাহরণস্বরূপ, দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে গ্রাম পর্যায়ে মারধর ও হাঙ্গামা লেগেই আছে।

এছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচনের জন্য যথার্থ দলের প্রয়োজন। যথার্থ দল মানে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ দল। কিন্তু আমাদের দেশে এমন দল এখনো গড়ে ওঠেনি। বরং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রের আখড়া। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুর্নীতি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ও দায়বদ্ধতাহীনতার সমস্যা প্রকট। বহু বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আফসোস করে বলেছিলেন, বাঙালি দলাদলিই করতে পারে, কিন্তু দল গড়ে তুলতে পারে না। তাই দলভিত্তিক নির্বাচন করার আগে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার করা জরুরি।

আরেক কারণেও দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কাক্সিক্ষত নয়। এর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান দলবাজির আখড়ায় পরিণত হতে পারে। দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীরা ভাবতে শুরু করতে পারেন যে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তাদের মনোনীত ও নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাই ইউনিয়ন পরিষদের সব সেবা ও সুযোগ-সুবিধা একমাত্র তাদেরই প্রাপ্য। এ ধরনের দলবাজি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরই প্রয়োজনীয় সেবা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে না, এর মাধ্যমে অনেক সাধারণ নাগরিকও বঞ্চিত হবেন। আর বঞ্চনা থেকে মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়। আর এই অসন্তুষ্টি সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। জটিল করে তুলতে পারে গ্রাম পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে।
পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে, দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন তৃণমূলের গণতন্ত্র জোরদারের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবে না। এমন নির্বাচন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রে কোনো অবদান রাখবে না। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে না। এছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে দ্বন্দ্ব, হানাহানিও বিস্তৃিত লাভ করতে পারে। এ ধরনের হানাহানি দলের সঙ্গে দলেরই নয়, দলের অভ্যন্তরেও ঘটবে বলে আমাদের আশঙ্কা। উপরন্তু দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে দলবাজির বিস্তার ঘটবে। আর রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু দলবাজি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য গণতন্ত্রের জন্য চরম ক্ষতিকারক। তাই আমাদের রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্যদের দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই। 

র বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।
র বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।
র বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।
তথ্যসূত্র: আমাদের সময়, 23 January, 2016
23 January, 2016
লিংক: http://www.dainikamadershomoy.com/2016/01/23/69573.php#sthash.0h2CyUtI.dpuf

1 comment: