Jan 23, 2016

কেমন হলো পৌর নির্বাচন?

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে ১২ জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত সারা দেশের ২৩৫টি পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবারের মতো দলভিত্তিক এই নির্বাচনে ২৩৫টি পৌরসভার মধ্যে মেয়র পদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৮২টিতে (সাতজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়) এবং বিএনপি ২৪টিতে বিজয়ী হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে একজন এবং স্বতন্ত্র ২৮ জন মেয়র পদে নির্বাচিত হন।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বিএনপি নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। নাগরিক সমাজের মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একধরনের সন্দেহ লক্ষ করা যায়। সত্যিকারভাবেই কেমন হয়েছে এ নির্বাচন?

নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ করতে হলে কতগুলো মানদণ্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের আইনে কিংবা আদালতের রায়ে কোনো মানদণ্ড দেওয়া নেই। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিতে—যেমন, ‘সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’–এ ‘জেনুইন’ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে এবং এর কিছু মানদণ্ডও দেওয়া আছে। যেমন: (১) ভোটার তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় যাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাঁরা ভোটার হতে পেরেছেন; (২) যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন; (৩) ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী ছিল; (৪) যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন; এবং (৫) ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।

ভোটার তালিকায় ত্রুটি
দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটার তালিকা ছিল অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত। প্রথমত, ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ১১ (১) ধারা অমান্য করে নির্বাচন কমিশন ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের পরিবর্তে জুলাই মাসে হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করার কারণে ৪৩ লাখের বেশি নতুন ভোটার যথাসময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি এবং তাঁদের অনেকেই সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ছিল সর্বাধিক নির্ভুল এবং সেই তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি ছিল ১৪ লাখের অধিক। এর কারণ হলো, আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ এবং অনেকেই ভোটার নন। কিন্তু ২০১৪ সালের হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় যে ৪৭ লাখের মতো নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিল, তাতে নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ৪৪: ৫৬, যা ঘটেছে তথ্য সংগ্রহকারীদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণে (যুগান্তর, ২৬ জানুয়ারি ২০১৫)। তাই ২০১৪ সালের হালনাগাদ করা তালিকায়, যে তালিকা দিয়ে সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, অনেক নারী ভোটার বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।


প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে গ্রেপ্তার, মামলা-হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিরোধী দলের ও ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিএনপি অভিযোগ তুলেছে যে পৌর নির্বাচনের প্রাক্কালে এক সপ্তাহেই তাদের প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৫)। ফলে বিএনপির অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ফেনীতে। ফেনীর তিনটি পৌরসভার ৪৮টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪৪টি এবং তিনটি মেয়র পদের মধ্যে দুটিতেই সরকারি দলের মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা ‘এমপি সাব’-এর ফেনী ‘স্টাইলে’ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে যে জমা দেওয়ার আগের রাতে তাঁদের কাছে থেকে মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয় (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫)।
ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে সব ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী ছিল না। যেমন, সাতজন মেয়র পদপ্রার্থী, যাঁদের সবাই সরকারি দলের, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। একইভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ১৩৪ জন কাউন্সিলর, যা ছিল একটি অনন্য নজির।
এ ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচন, প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে পৌরসভা প্রতি গড়ে ৫ দশমিক ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯২।
স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ভোটাররা সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্র দখল, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, জাল ভোট প্রদান, সহিংসতাসহ নানা অনিয়মের দৃশ্য গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এসব অনিয়মের কারণে ৩৯টি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করা হয়। তবে অনেকের আশঙ্কা, সমুদ্রে ভাসমান বরফখণ্ডের যেমন সামান্য অংশই দেখা যায়, তেমনিভাবে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে দৃশ্যমান অনিয়ম ছিল অদৃশ্য কারসাজির তুলনায় অতি নগণ্য।
এমনকি ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাতটি পৌরসভার নির্বাচনও জালিয়াতিমুক্ত ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম আলোর প্রতিবেদন (১৩ জানুয়ারি) অনুযায়ী: ‘ভোটকেন্দ্র দখল আর বহিরাগতদের অবাধে জাল ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে...নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভা নির্বাচনে পুনঃভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে...১২টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের আটজন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের এ ঘটনা ঘটে...দুপুর ১২টার পর মোট ১২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০টিই নৌকার সমর্থকেরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।’
সাধারণত নির্বাচনী সহিংসতা ঘটে নির্বাচনের দিনে, জয়-পরাজয়ের উত্তেজনায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনের আগেই অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে ‘সুজন’ ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যকার ২০ দিনে ৫০টি সহিংস ঘটনা চিহ্নিত করে। আর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৬ ডিসেম্বর এক দিনেই ঘটে ১১টি সহিংস ঘটনা, যা অনেক ভোটারের মনে শঙ্কার উদ্রেক করেছে এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের নিরুৎসাহিত করেছে।

ভোট গ্রহণ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা২৬ নভেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজস্ব জনবল থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ১৭৫টি পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। আর অভিযোগ উঠেছে যে, ‘আইন মানেন না রিটার্নিং কর্মকর্তারা...আইনে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের বিধান নেই। কিন্তু তা মানেননি খুলনার পাইকগাছা, মাগুরা ও বরগুনার বেতাগী পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা...একটি পৌরসভার মেয়র প্রার্থী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে থেকে নির্বাচন করলেও প্রার্থিতা বাতিল করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা’ (ইত্তেফাক, ৮ ডিসেম্বর ২০১৫)। 
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ২৫৫টি পৌরসভা নির্বাচনে, যে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ (সমকাল, ১০ মার্চ ২০১১)। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ঘোষিত ২০৭টি পৌরসভার ফলাফল অনুযায়ী সার্বিকভাবে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশের মধ্যে। ৫টি পৌরসভায় ভোট প্রদানের হার ছিল ৯০ শতাংশের এবং ৭৪টি পৌরসভায় ৮০ শতাংশের বেশি, যা অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এবারকার নির্বাচনে ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া এ নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য ও ভোট কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ২৩ জন এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া পৌর নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়মের শতাধিক অভিযোগের তদন্ত না করারও অভিযোগ ওঠে কমিশনের বিরুদ্ধে (যুগান্তর, ৫ জানুয়ারি ২০১৬), যদিও এ ব্যাপারে কমিশনের এমনকি নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এসব নির্লিপ্ততা তাদের নিরপেক্ষতা এবং একই সঙ্গে নির্বাচন-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ও ১২ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকে জেনুইন বা সঠিক নির্বাচন বলা যায় না।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনকে আরও দুটি মানদণ্ডের আলোকেও বিচার করা যায়। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নবম সংসদসহ আরও অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সমস্যা ছাড়া এসব নির্বাচনই ছিল মোটামুটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আরেকটি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যবশত এবারের পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার বিচারে আগের এসব নির্বাচনের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং এর পরবর্তী উপজেলা ও ঢাকা-চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী মানে নিম্নমুখিতার যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ধারাই অব্যাহত রয়েছে; তা থেকে উত্তরণ ঘটেনি এবং আমাদের নির্বাচনী-প্রক্রিয়া সুস্থধারায় ফিরে আসেনি।

No comments:

Post a Comment