Dec 27, 2015

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচন। নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে কি-না তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় রয়েছে। সংশয় রয়েছে এটি উৎসবের পরিবর্তে দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার, যা আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এবার ২৩৪টি পৌরসভায় ৯২৩ জন মেয়র পদে (নারী ১৫ জন), আট হাজার ৫৮৯ জন সাধারণ কাউন্সিলর পদে এবং দুই হাজার ৫৩৩ জন সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কমিশন দলভিত্তিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সংখ্যা কত তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যেই ছয়জন মেয়র প্রার্থী এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের ১৩৪ জন কাউন্সিলর প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (ফেনীতে ৪৮টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪৪টিতেই একক প্রার্থী) নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে, যা পৌর নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দলভিত্তিক এবং দলীয় প্রতীকে (শুধু মেয়র পদে) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তাই দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে এ নির্বাচনের দিকে।
পৌর নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের যোগ্যতা ও সততার ওপর নির্ভর করবে আগামী পাঁচ বছর এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন চলবে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ওপরই গণতন্ত্রের ক্রিয়াশীলতা ও সুশাসন বহুলাংশে নির্ভর করবে। কারণ, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন কমিশন ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৫টিতে জনপ্রশাসন থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করল, তা অনেকের বোধগম্য নয় (প্রথম আলো, ২৬ নভেম্বর ২০১৫)। এসব রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করবেন না বলেই অনেকের আশংকা। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের মতে, ‘জনপ্রশাসন থেকে নিয়োগকৃত রিটার্নিং অফিসাররা নির্বাচন কমিশনের কথা শুনতে চান না। তারা মন্ত্রী-এমপিদের কথাই বেশি শোনেন।’ ইতিমধ্যে নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি প্রার্থীদের আচরণবিধি লংঘনের বহু খবর এসেছে নির্বাচন কমিশনে। এসবের বিরুদ্ধে কমিশন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশনা পাঠাচ্ছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ব্যবস্থা নেয়ার, যার বেশিরভাগই উপেক্ষিত থাকছে। আর শুধু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন কমিশনাররা (আমাদের সময়, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫)।
দ্বিতীয়ত, ৪ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেনী জেলার ফেনী, পরশুরাম ও দাগনভূঞা পৌরসভার সাধারণ ও সংরক্ষিত আসন মিলে মোট ৪৮টি ওয়ার্ডের ৩৩টিতেই মাত্র একজন করে কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা, তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত রাখা এবং তাদের মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে মৌখিকভাবে অভিযোগ করলেও কেউই লিখিতভাবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানাননি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে এসব বিষয়ে তদন্ত করতে দেয়া হয়নি, যদিও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের।
তৃতীয়ত, একটি পৌরসভায় একটি দলের পক্ষ থেকে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল হলে সবক’টি মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান থাকলেও মাগুরা সদর, খুলনা জেলার পাইকগাছা এবং বরগুনা জেলার বেতাগী পৌরসভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সব মনোনয়নপত্র বাতিল না করে একজন করে প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী।
চতুর্থত, সমর্থকের স্বাক্ষরে মিল না থাকা বা সমর্থক হিসেবে যার নাম তালিকায় আছে এমন ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে (প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০১৫)। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অভিযোগ, সমর্থকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে এমনটি করা হয়েছে।
পঞ্চমত, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আচরণবিধি লংঘন করতে দেখা গেছে। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম দেখে যে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে এবং তাদের কয়েকজন ভুল স্বীকার করে এবং ভবিষ্যতে আচরণবিধি ভঙ্গ করবেন না মর্মে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছেন। আমরা আশা করেছিলাম, কমিশন আচরণবিধি লংঘনের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কমিশনের কঠোর অবস্থানে যাওয়া তো দূরের কথা, ১১ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে তারা আচরণবিধি লংঘনের জন্য মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব তারা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।’ এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। তবে সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী কমিশন তার সিদ্ধান্ত পাল্টেছে এবং আমরা এর ফলাফলের অপেক্ষায় আছি।
নির্বাচন কমিশনারদের আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, নির্বাচনী অনিয়ম বা আচরণবিধি ভঙ্গের কোনো ঘটনা ঘটলে লিখিত অভিযোগ না পেলে কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেবে না। এমন সিদ্ধান্তও দায়িত্ব এড়ানোরই শামিল। কারণ কমিশনের ভূমিকা অনেকটা রেফারির মতো এবং রেফারির ভূমিকা হল চোখ-কান খোলা রাখা এবং যে কোনো অন্যায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিকার করা এবং অন্যায় যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
এদিকে আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা প্রতিদিন ঘটেই চলছে। এছাড়াও সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছেন এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন- এমন অভিযোগও চারদিক থেকে উঠছে। এমনকি সহিংসতার ঘটনাও দিন দিন বাড়ছে। নির্বাচনের দিনের আগে প্রচারণায় ব্যাপকভাবে বাধা প্রদান ও সহিংসতার ঘটনা এবারই প্রথম।
ষষ্ঠত, কোনো কোনো পৌরসভা যেমন, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ পৌরসভার আওয়ামী লীগের একজন বিদ্রোহী প্রার্থী এবং চাটখিল পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীকে ‘অস্ত্রের মুখে’ জোর করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের অভিযোগ উঠেছে (যুগান্তর, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫)। দলীয় শৃংখলা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো কোনো প্রার্থীকে অবশ্যই দল থেকে বহিষ্কার করতে পারে; কিন্তু জোর করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানোর অর্থই হচ্ছে নির্বাচনী আচরণবিধির লংঘন। এক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।
সপ্তমত, প্রার্থী প্রদত্ত হলফনামা নিয়ে এবারও যথেচ্ছাচার হয়েছে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। অনেক প্রার্থীই হলফনামায় বিস্তারিত তথ্য দেননি বা তথ্য গোপন করেছেন। যেমন, অনেকে হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য উল্লেখ করেননি, যার ফলে প্রার্থীর মোট সম্পদের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। আইন অনুযায়ী, সম্পদের ক্ষেত্রে প্রার্থীরা অর্জনকালীন মূল্য উল্লেখ করেন। তাই প্রকৃত ও পরিপূর্ণ তথ্য পেতে হলে ভবিষ্যতে হলফনামায় পরিবর্তন আনতে হবে।
এছাড়া আরও যেসব সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে তা হল- ওয়েবসাইটে অনেক দেরিতে তথ্য দেয়া, সব পৌরসভার তথ্য না থাকা, কোনো পৌরসভার তথ্য দেয়া থাকলেও সব প্রার্থীর তথ্য না থাকা, দলভিত্তিক পরিচয় সংবলিত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করা, এক প্রার্থীর জায়গায় অন্য প্রার্থীর তথ্য থাকা ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, আদালত ভোটারদের প্রার্থী সম্পর্কে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে বাকস্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, কারণ ভোটাররা তাদের বাকস্বাধীনতা প্রয়োগ করেন ভোটের মাধ্যমে। তাই সময়মতো ও যথাযথভাবে তথ্য প্রকাশ না করা ভোটারদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল।
এটি সুস্পষ্ট যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং তা বিশ্লেষণ ও বিতরণ ভোটারদের সচেতন করতে এবং তাদের সৎ ও যোগ্য তথা সঠিক প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে শুধু তথ্য পেলেই হবে না, তথ্য সঠিক হতে হবে। তাই প্রার্থী প্রদত্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনকে চুলচেরাভাবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীদের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং নির্বাচিত হলে নির্বাচন বাতিল করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে এটি বলা যায়, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আচরণবিধি লংঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অপারগতা প্রকাশ করছে। কমিশন আগে থেকে কঠোর অবস্থান না নেয়ায় এ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা ও আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা বাড়ছে। ২১ ডিসেম্বর সাভার পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীর বাসায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগ ও এর বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বিএনপি ও এর বিদ্রোহী মেয়র পদ প্রার্থীর মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। এছাড়া নাটোর সদর ও গোপালপুর পৌরসভাসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভায় সংঘর্ষ, নির্বাচনী প্রচারে বাধা ও হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও খবর পাওয়া গেছে যশোর, জামালপুর ও লাকসামে সহিংসতার। এসব আচরণবিধি ভঙ্গের অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে ইতিমধ্যে কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চেয়েছে, যার মধ্য দিয়ে কমিশনের অসহায়ত্বেরই প্রতিফলন ঘটেছে। অথচ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের নিজস্ব ক্ষমতা আছে আচরণবিধি লংঘনের দায়ে যে কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের, এমনকি প্রার্থিতা বাতিলের। তাই আসন্ন পৌর নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংশয় কাটছে না। 
 
তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫
২৭ ডিসেম্বর ২০১৫
২৭ ডিসেম্বর ২০১৫
আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচন। নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে কি-না তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় রয়েছে। সংশয় রয়েছে এটি উৎসবের পরিবর্তে দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার, যা আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এবার ২৩৪টি পৌরসভায় ৯২৩ জন মেয়র পদে (নারী ১৫ জন), আট হাজার ৫৮৯ জন সাধারণ কাউন্সিলর পদে এবং দুই হাজার ৫৩৩ জন সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কমিশন দলভিত্তিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সংখ্যা কত তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যেই ছয়জন মেয়র প্রার্থী এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের ১৩৪ জন কাউন্সিলর প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (ফেনীতে ৪৮টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪৪টিতেই একক প্রার্থী) নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে, যা পৌর নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড।বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দলভিত্তিক এবং দলীয় প্রতীকে (শুধু মেয়র পদে) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তাই দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে এ নির্বাচনের দিকে।পৌর নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের যোগ্যতা ও সততার ওপর নির্ভর করবে আগামী পাঁচ বছর এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন চলবে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ওপরই গণতন্ত্রের ক্রিয়াশীলতা ও সুশাসন বহুলাংশে নির্ভর করবে। কারণ, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন কমিশন ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৫টিতে জনপ্রশাসন থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করল, তা অনেকের বোধগম্য নয় (প্রথম আলো, ২৬ নভেম্বর ২০১৫)। এসব রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করবেন না বলেই অনেকের আশংকা। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের মতে, ‘জনপ্রশাসন থেকে নিয়োগকৃত রিটার্নিং অফিসাররা নির্বাচন কমিশনের কথা শুনতে চান না। তারা মন্ত্রী-এমপিদের কথাই বেশি শোনেন।’ ইতিমধ্যে নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি প্রার্থীদের আচরণবিধি লংঘনের বহু খবর এসেছে নির্বাচন কমিশনে। এসবের বিরুদ্ধে কমিশন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশনা পাঠাচ্ছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ব্যবস্থা নেয়ার, যার বেশিরভাগই উপেক্ষিত থাকছে। আর শুধু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন কমিশনাররা (আমাদের সময়, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫)।দ্বিতীয়ত, ৪ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেনী জেলার ফেনী, পরশুরাম ও দাগনভূঞা পৌরসভার সাধারণ ও সংরক্ষিত আসন মিলে মোট ৪৮টি ওয়ার্ডের ৩৩টিতেই মাত্র একজন করে কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা, তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত রাখা এবং তাদের মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে মৌখিকভাবে অভিযোগ করলেও কেউই লিখিতভাবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানাননি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে এসব বিষয়ে তদন্ত করতে দেয়া হয়নি, যদিও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের।তৃতীয়ত, একটি পৌরসভায় একটি দলের পক্ষ থেকে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল হলে সবক’টি মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান থাকলেও মাগুরা সদর, খুলনা জেলার পাইকগাছা এবং বরগুনা জেলার বেতাগী পৌরসভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সব মনোনয়নপত্র বাতিল না করে একজন করে প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী।চতুর্থত, সমর্থকের স্বাক্ষরে মিল না থাকা বা সমর্থক হিসেবে যার নাম তালিকায় আছে এমন ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে (প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০১৫)। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অভিযোগ, সমর্থকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে এমনটি করা হয়েছে।পঞ্চমত, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আচরণবিধি লংঘন করতে দেখা গেছে। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম দেখে যে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে এবং তাদের কয়েকজন ভুল স্বীকার করে এবং ভবিষ্যতে আচরণবিধি ভঙ্গ করবেন না মর্মে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছেন। আমরা আশা করেছিলাম, কমিশন আচরণবিধি লংঘনের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কমিশনের কঠোর অবস্থানে যাওয়া তো দূরের কথা, ১১ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে তারা আচরণবিধি লংঘনের জন্য মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব তারা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।’ এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। তবে সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী কমিশন তার সিদ্ধান্ত পাল্টেছে এবং আমরা এর ফলাফলের অপেক্ষায় আছি।নির্বাচন কমিশনারদের আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, নির্বাচনী অনিয়ম বা আচরণবিধি ভঙ্গের কোনো ঘটনা ঘটলে লিখিত অভিযোগ না পেলে কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেবে না। এমন সিদ্ধান্তও দায়িত্ব এড়ানোরই শামিল। কারণ কমিশনের ভূমিকা অনেকটা রেফারির মতো এবং রেফারির ভূমিকা হল চোখ-কান খোলা রাখা এবং যে কোনো অন্যায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিকার করা এবং অন্যায় যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।এদিকে আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা প্রতিদিন ঘটেই চলছে। এছাড়াও সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছেন এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন- এমন অভিযোগও চারদিক থেকে উঠছে। এমনকি সহিংসতার ঘটনাও দিন দিন বাড়ছে। নির্বাচনের দিনের আগে প্রচারণায় ব্যাপকভাবে বাধা প্রদান ও সহিংসতার ঘটনা এবারই প্রথম।ষষ্ঠত, কোনো কোনো পৌরসভা যেমন, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ পৌরসভার আওয়ামী লীগের একজন বিদ্রোহী প্রার্থী এবং চাটখিল পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীকে ‘অস্ত্রের মুখে’ জোর করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের অভিযোগ উঠেছে (যুগান্তর, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫)। দলীয় শৃংখলা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো কোনো প্রার্থীকে অবশ্যই দল থেকে বহিষ্কার করতে পারে; কিন্তু জোর করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানোর অর্থই হচ্ছে নির্বাচনী আচরণবিধির লংঘন। এক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।সপ্তমত, প্রার্থী প্রদত্ত হলফনামা নিয়ে এবারও যথেচ্ছাচার হয়েছে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। অনেক প্রার্থীই হলফনামায় বিস্তারিত তথ্য দেননি বা তথ্য গোপন করেছেন। যেমন, অনেকে হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য উল্লেখ করেননি, যার ফলে প্রার্থীর মোট সম্পদের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। আইন অনুযায়ী, সম্পদের ক্ষেত্রে প্রার্থীরা অর্জনকালীন মূল্য উল্লেখ করেন। তাই প্রকৃত ও পরিপূর্ণ তথ্য পেতে হলে ভবিষ্যতে হলফনামায় পরিবর্তন আনতে হবে।এছাড়া আরও যেসব সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে তা হল- ওয়েবসাইটে অনেক দেরিতে তথ্য দেয়া, সব পৌরসভার তথ্য না থাকা, কোনো পৌরসভার তথ্য দেয়া থাকলেও সব প্রার্থীর তথ্য না থাকা, দলভিত্তিক পরিচয় সংবলিত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করা, এক প্রার্থীর জায়গায় অন্য প্রার্থীর তথ্য থাকা ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, আদালত ভোটারদের প্রার্থী সম্পর্কে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে বাকস্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, কারণ ভোটাররা তাদের বাকস্বাধীনতা প্রয়োগ করেন ভোটের মাধ্যমে। তাই সময়মতো ও যথাযথভাবে তথ্য প্রকাশ না করা ভোটারদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল।এটি সুস্পষ্ট যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং তা বিশ্লেষণ ও বিতরণ ভোটারদের সচেতন করতে এবং তাদের সৎ ও যোগ্য তথা সঠিক প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে শুধু তথ্য পেলেই হবে না, তথ্য সঠিক হতে হবে। তাই প্রার্থী প্রদত্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনকে চুলচেরাভাবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীদের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং নির্বাচিত হলে নির্বাচন বাতিল করার ব্যবস্থা নিতে হবে।পরিশেষে এটি বলা যায়, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আচরণবিধি লংঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অপারগতা প্রকাশ করছে। কমিশন আগে থেকে কঠোর অবস্থান না নেয়ায় এ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা ও আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা বাড়ছে। ২১ ডিসেম্বর সাভার পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীর বাসায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগ ও এর বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বিএনপি ও এর বিদ্রোহী মেয়র পদ প্রার্থীর মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। এছাড়া নাটোর সদর ও গোপালপুর পৌরসভাসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভায় সংঘর্ষ, নির্বাচনী প্রচারে বাধা ও হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও খবর পাওয়া গেছে যশোর, জামালপুর ও লাকসামে সহিংসতার। এসব আচরণবিধি ভঙ্গের অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে ইতিমধ্যে কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চেয়েছে, যার মধ্য দিয়ে কমিশনের অসহায়ত্বেরই প্রতিফলন ঘটেছে। অথচ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের নিজস্ব ক্ষমতা আছে আচরণবিধি লংঘনের দায়ে যে কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের, এমনকি প্রার্থিতা বাতিলের। তাই আসন্ন পৌর নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংশয় কাটছে না। - See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2015/12/27/30225#sthash.xoQ5PlGm.dpuf

No comments:

Post a Comment