Nov 2, 2015

দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন কতটা যুক্তিযুক্ত

দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। আমরা মনে করি যে, এটি একটি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত এবং এর মাধ্যমে আমাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি উগ্রবাদের জন্য উর্বর ক্ষেত্রই প্রস্তুত করে দেবে, যা দলমত নির্বিশেষে কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।

দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে রাজনীতিতে দলের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। বলা হয় যে, দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে দলের মনোনয়ন নিয়ে জয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা যাবে, ফলে তারা দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য হবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিরাজমান দলান্ধতার সংস্কৃতির কারণে আমাদের রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। অর্থাত্ আমাদের দেশে দলীয় শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই।

দলীয় নির্বাচনের পক্ষে আরেকটি যুক্তি হলো যে, দলীয় প্রতীক ব্যবহার করলে নির্বাচনটি হবে ‘রাজনৈতিক’, ফলে নির্দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ‘বিরাজনীতিকীকরণের’ পথ রুদ্ধ হবে। দলভিত্তিক হোক বা নির্দলীয় হোক, নির্বাচন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, তাই নির্দলীয় নির্বাচন রাজনীতি-বিবর্জিত নয়। সুতরাং, যারা যুক্তি দেখান যে, নির্দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিরাজনীতিকীকরণ হয়, তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেই ধারণা অস্পষ্ট।

আর নির্দলীয় নির্বাচন নয়, বরং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন বাণিজ্যের মত নীতিহীন আচরণের কারণেই আমাদের রাজনীতি আজ মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকে গিয়েছে’। আমাদের সংসদ সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বর্তমানে ব্যবসায়ী। দলীয় মনোনয়নের কারণে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়রদের ৮০ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। গত কয়েক বছরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের যে কয়জন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই ব্যবসায়ী। ফলে রাজনীতিই আজ ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে এবং আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন বহুলাংশে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের মতই আচরণ করে।

প্রসঙ্গত, আমাদের রাজনীতিতে বিরাজ-নীতিকীকরণের প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান। আমাদের জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নব্য ধনী ও পেশিশক্তির মালিকরা ক্রমান্বয়ে অধিক হারে নির্বাচিত হচ্ছেন। বিরাজমান ফায়দা প্রদানের রাজনীতির ফলে এখন পেশিশক্তির মালিকরা যে হারে বিত্তবান হচ্ছেন, তাতে ভবিষ্যতে এটি আরও ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। কারণ এসব ধনবান নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাধারণত অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন এবং এদের প্রধান অগ্রাধিকার জনসেবার পরিবর্তে আরও বিত্তবান হওয়া। নিঃসন্দেহে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মানে ক্রমাবনতি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।

এছাড়াও আমাদের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, শুধু দলীয়ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমেই তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন, আর এ সম্মতি অর্জিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিরা—দলীয় কিংবা নির্দলীয়— যদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হয়। এর মাধ্যমে এক ঝাঁক নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির পথও সুগম হয়। অর্থাত্ স্থানীয় পর্যায়ে দলভিত্তিক নির্বাচন আর রাজনীতি যেমন এক কথা নয়, তেমনিভাবে গণতন্ত্রও দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে না।

আবার অনেকেই বলেন যে, নির্দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন হবার কথা থাকলেও, যেহেতু দলগুলো তা মানে না, তাই দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানই হবে যুক্তিযুক্ত। আর যেহেতু দলীয়ভাবে নির্বাচন হয়েই আসছে, আইন করে তা করতে ক্ষতি কী! এটিও খোঁড়া যুক্তি। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এবং রাজনৈতিক নেতারা আইনকানুন মেনে চলেন না বলে কি আইন-কানুন ময়লার স্তূপে ফেলে দিতে হবে?

এটি সুস্পষ্ট যে, দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষের যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমরা মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। বস্তুত, আমাদের আশঙ্কা যে, আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে ন্যূনতম মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা হয় না, আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই এবং তারা চরমভাবে দুর্বৃত্তায়িত, দলীয়ভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

গণতন্ত্রের অন্যতম মূল্যবোধ হলো বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ও ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অসহ্যই করে না, তারা সংঘর্ষিক রাজনীতিতে জড়িত, এমনকি পরসপরকে নির্মূল করার অপচেষ্টায়ও লিপ্ত। তারা মানুষের মৌলিক অধিকার, এমনকি স্বাধীন ভোটাধিকারের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল নয়। তাই দলীয় সরকারের অধীনে আমাদের দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায় না, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। সুতরাং, দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার চেয়ে দলতন্ত্র ও দলবাজি তথা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যকেই উত্সাহিত করবে। আর দল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য হলেও, দলতন্ত্র ও দলবাজি গণতন্ত্রের চরম শত্রু।

দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনের জন্য গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। দলের অপরাধগ্রস্ততা, একনায়কতান্ত্রিকতা ও কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকাও আবশ্যক। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে আমরা যথার্থ রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে সক্ষম হইনি। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আফসোস করে বলেছেন, বাঙালি দলাদলিই করতে পারে, কিন্তু দল গড়ে তুলতে পারে না। আমাদের আশঙ্কা যে, দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মত দলের নামে দলাদলি ও মারামারি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, ১ জানুয়ারি, ২০১০ ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে লিখিত এক চিঠিতে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক খুনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, দলীয় ক্যাডাররাই যদি রাজ্যের আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কী? এ প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাডারদের মধ্যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও খুনোখুনি লেগেই আছে।

আর তাই দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন যদি করতেই হয়, তাহলে সকল রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক আচরণ ও মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে অনতিবিলম্বে একটি ব্যাপকভিত্তিতে সংলাপের আয়োজন আবশ্যক। প্রস্তাবিত সংলাপের উদ্দেশ্য হবে: রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক ও দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছা, যাতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। একইসঙ্গে মনোনয়নের জন্য গণতান্ত্রিক পন্থার প্রচলন করা। এছাড়াও নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মত প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা, কারণ এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাতদুষ্টতা প্রহসনের নির্বাচনের পথই সুগম করে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাতদুষ্টতা আজ আমাদের জন্য এক গুরুতর সমস্যা।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও দলের প্রস্তাবিত সংস্কার ব্যতীত দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য হবে ব্যাপক টাকার খেলা ও পেশিশক্তির ব্যবহার, যা প্রার্থীর যোগ্যতাকে নিম্নমুখী করতে বাধ্য। এছাড়াও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, দলভিত্তিক নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এতে ভোটারের চয়েস কমে যাবে। উপরন্তু নির্বাচন দলভিত্তিক হলে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মামলা-হামলা দ্বারা বিরোধীদলের প্রার্থীদেরকে হয়রানি, এলাকাছাড়া, এমনকি প্রার্থী হওয়া থেকেও বিরত করা হতে পারে। এ কাজে দলীয় ক্যাডার ও সরকারি ক্ষমতা ব্যবহূত হতে পারে।

উল্লেখ্য, একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের বাধার কারণে ২৫ শতাংশ প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্রই জমা দিতে পারেননি। এটি সবারই জানা যে, ভারতীয় নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্টতার ঊর্ধ্বে এবং পশ্চিমবঙ্গের আমলাতন্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও আমাদের মত ভয়াবহ দলতন্ত্রের শিকার নয়। তাই প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও দলের সংস্কার ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই আমাদের আশঙ্কা।

আর ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্তই করবে। ইতোমধ্যেই নির্বাহী বিভাগের ওপর ক্ষমতাসীন দলের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং জাতীয় সংসদও তাদের করায়ত্তে। দলীয় প্রশাসক নিয়োগের কারণে জেলা পরিষদ ক্ষমতাসীন দলের কব্জায়। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা উপজেলা পরিষদেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এখন অবশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেও ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ হবে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। কারণ গণতন্ত্র হল সবাইকে নিয়ে পথ চলা এবং সকল স্তরে একটি শক্তিশালী বিরোধী প্রতিপক্ষের উপস্থিতি।

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ এবং দলতন্ত্রের চর্চা বিরোধী দলের প্রতি অনুগতদের, সাধারণ জনগণ, এমনকি সরকারি দলে সাধারণ সমর্থকদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। দলীয় প্রতীকের কর্তৃত্ববাদী প্রভাব এবং আমাদের ‘কলাগাছে’ ভোট দেয়ার সংস্কৃতির কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের, যারা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচ্ছন্ন এবং যোগ্য, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী ও নির্বাচিত হওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে। এভাবে দলভিত্তিক নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রতিনিধিদের গুণগত মানেই অবনতি ঘটাবে না, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের বিকাশকেও ব্যাহত করবে।

এছাড়াও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজ অনেকের মনে। তৃণমূল পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা কি ভবিষ্যতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের বিচারকের আসনে বসাতে চাই? এর মাধ্যমে কি ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম হবে? দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা কি আমাদের বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও কলুষিত করতে চাই?

প্রসঙ্গত, দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্তমান সরকারের অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম। গত ১৯ অক্টোবর রংপুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৬২ জন ব্যক্তির উপস্থিতিতে এই বিষয়ে একটি আলোচনা সভায় আমার অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়, যে আলোচনায় ২৮ জন ব্যক্তি অংশ নেন। আর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২০ জনই এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দেন এবং চারজন কোনো পক্ষ নেননি।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে আমাদের ধারণা যে, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত বর্তমানে যেসব স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন, তাদের অধিকাংশও দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনের বিপক্ষে। কারণ তাদের অনেকেই মনে করেন যে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, তারা নব্য ধনী ও পেশিশক্তির মালিকদের কারণে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন এবং মনোনয়ন পেলেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের অনেকেই দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারবেন না।

পরিশেষে, ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখের নির্বাচনের আগে আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে, অন্যান্য দেশে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদেরকেও সেই পথেই যেতে হবে। আর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। এখন আবার আমাদেরকে বলা হচ্ছে যে, অন্য দেশে স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে হয় এবং দলীয়ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা ভারত ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিশ্বের গণতান্ত্রিক ক্লাবের সদস্য হবো। কিন্তু আবারও এসব বাগাড়ম্বরের ফুলঝুরিতে আমরা বিভ্রান্ত হতে চাই না।
 
তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক, ০৩ নভেম্বর ২০১৫

No comments:

Post a Comment