Sep 29, 2015

বিশ্ব রূপান্তরের নতুন এজেন্ডা

২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র/সরকারপ্রধানেরা ‘ট্রান্সফরমিং আওয়ার ওয়ার্ল্ড: দ্য ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামের একটি কর্মসূচি অনুমোদন করেন। এই এজেন্ডায় কতগুলো ‘বিস্তারিত, সুদূরপ্রসারী ও গণকেন্দ্রিক, বিশ্বজনীন ও রূপান্তর সৃষ্টিকারী লক্ষ্য ও টার্গেট অন্তর্ভুক্ত’, যা ‘গ্লোবাল গোলস’ বা ‘২০৩০ এজেন্ডা’ হিসেবে অবহিত। এজেন্ডাটির উদ্দেশ্য হলো বিশ্বমানবতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্বাধীনতা ও কার্যকর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে মানুষ এবং অর্জিত হবে পরিবেশের ভারসাম্য। আশা করা যায়, এসব দুঃসাহসী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অঙ্গীকার আমাদের টেকসই ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা উন্নত জীবন উপভোগ করতে পারব এবং পুরো বিশ্বে ব্যাপক রূপান্তর ঘটবে। ১৫ বছর মেয়াদি এজেন্ডাটির বাস্তবায়ন শুরু হবে আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে।

২০৩০ সালের এজেন্ডায় সবার ও সব দেশের জন্য প্রযোজ্য ১৭টি লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত: (১) সব ধরনের দারিদ্র্য দূর করা; (২) ক্ষুধা দূর করা; (৩) সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা; (৪) সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা; (৫) নারীদের সম-অধিকার এবং তাঁদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা; (৬) সবার জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা; (৭) সবার জন্য সুলভ, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা; (৮) সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম উৎসাহিত, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা; (৯) স্থিতিশীল অবকাঠামো তৈরি, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা; (১০) অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা; (১১) নগর ও জনবসতিগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই করা; (১২) টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করা; (১৩) জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা; (১৪) পরিবেশ উন্নয়নে সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা; (১৫) স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও টেকসই ব্যবহার উৎসাহিত, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, মরুকরণ প্রতিহত এবং ভূমির মানে অবনতি রোধ ও জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা; (১৬) টেকসই উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ এবং সর্বস্তরে কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা;(১৭) টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা। এই ১৭টি লক্ষ্যের অধীনে রয়েছে সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট, সময়াবদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য ১৬৯টি টার্গেট।
২০৩০ সালের এজেন্ডার সঙ্গে এমডিজির অনেকগুলো পার্থক্য রয়েছে:
প্রথমত, এমডিজি প্রণীত হয়েছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্য নিয়ে, ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য হলো এগুলোর অবসান। যেখানে এমডিজির উদ্দেশ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য অবসানে আমাদের ‘অর্ধেক পথে’ নিয়ে যাওয়ার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও আনুপাতিক লক্ষ্য অর্জন, সেখানে ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের সফলতার শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়া—এগুলো শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। ২০৩০ এজেন্ডার উদ্দেশ্য হলো সবচেয়ে পেছনে পড়াদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, ২০৩০ এজেন্ডা হলো সর্বজনীন, উন্নত-অনুন্নত সব দেশে, সব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর লক্ষ্য হলো জেন্ডার, বয়স, বিকলাঙ্গতা, আয়, স্থান, জাতিসত্তা ও অন্যান্য অবস্থা-নির্বিশেষে কেউ যেন বাদ না যায়।
তৃতীয়ত, ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য হলো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ইস্যু সমন্বয়ে সুসংহত উন্নয়ন উৎসাহিত করা। অন্যান্য উন্নয়ন-সম্পর্কিত ইস্যুর সঙ্গে গণতন্ত্র, দায়বদ্ধতা, সহিংসতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয় অগ্রাধিকারে আনা।
চতুর্থত, সহিংসতা ও দারিদ্র্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি অর্জন ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য অপরিহার্য। নতুন এজেন্ডা শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছে। ‘যেসব কারণে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা, যেমন: অবিচার, দুর্নীতি, অপশাসন এবং অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র প্রবাহ—নতুন এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত।’
পঞ্চমত, এমডিজিতে সংখ্যার ওপর, যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে ভর্তির হারের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যার ফলে অনেক দেশে শিক্ষার মানে চরম অবনতি ঘটেছে। পক্ষান্তরে, ২০৩০ এজেন্ডায় প্রথমবারের মতো শিক্ষার মান, তথা জ্ঞানার্জন ও শিক্ষার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব তৈরির কথা বলা হয়েছে।
ষষ্ঠত, ২০৩০ এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো, এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার ওপর, যা মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে...মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, কার্যকর আইনের শাসন ও সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং স্বচ্ছ, কার্যকর ও দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে।’ অনেক দেশেই বর্তমানে অপশাসনের ভয়াবহতা গুরুত্বপূর্ণ ‘উন্নয়ন ইস্যু’তে পরিণত হয়েছে। বস্তুত গণতান্ত্রিক, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের অভাব এখন অনেক সমাজের ভিত কাঁপিয়ে তুলছে এবং সহিংস উগ্রবাদ কায়েমের পথ প্রশস্ত করছে।
সপ্তমত, এমডিজির বিপরীতে ২০৩০ এজেন্ডার অর্জিত ফলাফল পরিবীক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। যার জন্য প্রয়োজন হবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর উপজাতিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত ও কঠোর পর্যালোচনার আয়োজন করা। এসব পর্যালোচনা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ, গণকেন্দ্রিক, মানবাধিকারের প্রতি সংবেদনশীল এবং এগুলোর বিশেষ অগ্রাধিকার হতে হবে সবচেয়ে দারিদ্র্য, ঝুঁকিতে থাকা এবং পেছনে পড়ারা। এতে উন্নত মানের, সহজলভ্য, সময়োপযোগী, বিশ্বাসযোগ্য ও বিস্তারিত উপাত্ত ব্যবহার করা হবে। এসব পর্যালোচনার লক্ষ্য হবে নাগরিকদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।
অষ্টমত, এমডিজি বাস্তবায়ন বহুলাংশে নির্ভরশীল ছিল বৈদেশিক সাহায্যের ওপর, যা বাস্তবে ঘটেনি। কিন্তু ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়ন মূলত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিকরণ ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে সম্পদ সংগ্রহকরণের ওপর। তবে যেহেতু নতুন এজেন্ডাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং সম্মিলিত উদ্যোগ, তাই এর বাস্তবায়নের জন্য সম্পদ সংগ্রহ, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করার ওপর এতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ‘সরকার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ ও অন্যান্য পক্ষকে একত্রকরণ এবং সকল প্রাপ্তিসাধ্য সম্পদ আহরণে সহায়তা করবে।’
নতুন এজেন্ডার একটি বিশেষত্ব হলো, এটি সংশ্লিষ্ট সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যদিও এমডিজি প্রণয়ন করেছিলেন একদল বিশেষজ্ঞ। বস্তুত, ২০৩০ এজেন্ডার ভিত্তি হলো জাতিসংঘের ইতিহাসের সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ, যাতে বহু দেশের অসংখ্য নাগরিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সদস্যরাষ্ট্রসমূহ অংশ নিয়েছে। তাই এটি বাইরের থেকে আরোপিত নয়, বরং জাতীয় মালিকানায় অর্জিত এজেন্ডা। বস্তুত, এটি ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য ও জনগণের এজেন্ডা’ এবং এর বাস্তবায়নও নির্ভর করবে মূলত জনগণের ওপর। তবে সদস্যরাষ্ট্রসমূহকে এ লক্ষ্যে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রদর্শন এবং অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে হবে।
যদিও নতুন এজেন্ডা এমডিজির অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত, কিন্তু এটির গুরুত্ব হলো যে এটির পরিধি এমডিজি থেকে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং এমডিজির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা হলো এর লক্ষ্য। দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিসহ উন্নয়নের গতানুগতিক কর্মসূচিগুলোর বাইরেও এটিকে আরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ-সংক্রান্ত লক্ষ্য নিয়ে। ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য ও টার্গেটগুলোর গভীর আন্তসংযোগ ও পারস্পরিক যোগসূত্র নতুন এজেন্ডায় সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত।
২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য ও টার্গেটের অবিভাজ্যতা, পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ও সংযুক্ততার গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষত এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, এগুলো আংশিক বা বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। শুধু শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতির ওপর প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ২০৩০ এজেন্ডা অর্জন করা যাবে না, এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে শান্তি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র গঠন, মানবাধিকার বাস্তবায়ন ও সুশাসন কায়েম করার মতো ইস্যুগুলোর প্রতি মনোনিবেশ। এর জন্য অবশ্য প্রয়োজন একধরনের হলিস্টিক, ঊর্ধ্বমুখী ও সুসংহত ‘কমিউনিটি-লেড ডেভেলপমেন্ট’ অ্যাপ্রোচ, যার উদ্দেশ্য হবে পুরো সমাজের পরিবর্তন, এর অনুন্নয়নের আংশিক প্রতিকার নয়। এর জন্য প্রয়োজন হবে সমাজে নারী, পুরুষ ও তরুণদের তাঁদের জীবনের হাল ধরার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রক্রিয়ার জন্য আরও প্রয়োজন হবে নাগরিকদের পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে সক্রিয়করণ; তৃণমূল সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কণ্ঠকে উচ্চকিত করার সুযোগ প্রদান; গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি সৃষ্টি এবং অনুঘটকের ভূমিকা পালনকারী একটি কার্যকর ও দায়বদ্ধ স্থানীয় সরকারব্যবস্থা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো,

No comments:

Post a Comment