Sep 7, 2015

শাইখ সিরাজ : উন্নয়ন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার অমর টুয়েলফ্থ নাইট (Twelfth Night) নাটকে খ্যাতিমানদের সম্পর্কে বলেছেন, কেউ বিখ্যাত হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন, কেউ খ্যাতি অর্জন করেন, আবার কারও ওপর খ্যাতি আরোপ করা হয়। তবে এ তিনটি বিকল্পের মধ্যে নিঃসন্দেহে খ্যাতি অর্জনই সর্বাধিক আকর্ষণীয় ও সম্মানীয়। যুগে যুগে যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন, তারাই হয়েছেন বরেণ্য ও স্মরণীয়। তারাই বড় অবদান রেখেছেন ইতিহাসে। কারও কারও ক্ষেত্রে এ সকল অবদান এসেছে নিজের ব্যক্তিগত সফলতা থেকে, যা সমষ্টির জন্যও কল্যাণ বয়ে এনেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অবদানের প্রকৃতি হল অন্যের উপকার ও সমাজের অগ্রগতি। যার মাধ্যমে তারা সরাসরিভাবে অনেকের জীবন স্পর্শ করেছেন। কিংবা জাতির জন্য নতুন পথ রচনা করেছেন। এদের অবদানের ফলেই মানবসমাজ সামনে এগিয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে। বস্তুত এ সকল ব্যক্তির অবদানের ইতিহাসই মানবজাতির ইতিহাস।
শাইখ সিরাজ আমাদের সমাজের এমন এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব, যিনি উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে দিয়েছেন। যিনি সনাতন পদ্ধতির কর্মসংস্থানের পরিবর্তে আত্মন্নোয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের ধারণার প্রচলন করেছেন। যার মাধ্যমে বাংলাদেশে তিনি উন্নয়ন সাংবাদিকতার নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন এবং এর পথিকৃতে পরিণত হয়েছেন।
বস্তুত তিনি উন্নয়ন সাংবাদিকতা বিষয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ফলে সঙ্গতভাবেই তিনি অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেছেন। তবে এ খ্যাতির উৎস সরকারি ক্ষমতার আসন নয় বরং অসাধারণ একজন সামাজিক উদ্যোক্তা (social enterpreneur) হিসেবেই তার এ খ্যাতি।
রাজনীতিবিদরা আমাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, উন্নয়ন মানে রাস্তাঘাট, পুল, ব্রিজ, কালভার্ট, ইমারত তথা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এমন উন্নয়ন যা দেখা যায়, ধরা যায়, ছোঁয়া যায় এবং যা থেকে লাভবান হওয়া যায়। এমন উন্নয়ন মূলত অর্থনির্ভর, ভাগ-বাটোয়ারার উন্নয়ন। সরকারি কোষাগারই এমন উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। আমলা ও রাজনীতিবিদরাই মূলত এর বাস্তবায়নকারী।
শাইখ সিরাজ আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, সত্যিকারের উন্নয়ন মানুষের উন্নয়ন, তাদের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন। অবকাঠামোগত পরিবর্তন এ কাজে সহায়তা করতে পারে মাত্র, সরাসরি কর্মসংস্থান করতে পারে না। তাই সত্যিকারের মানব কল্যাণের জন্য প্রয়োজন তাদেরকেই নিজ জীবনের চালকের আসনে অধিষ্ঠিতকরণ।
শাইখ সিরাজ আরও দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কর্মসংস্থানের জন্য সনাতন পদ্ধতির ওপর সর্বদা নির্ভর করতে হয় না। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দ্বারে ধরনা দিতে হয় না। ‘জ্যাক’-এর মাধ্যমে কিংবা উৎকোচের বিনিময়ে সরকারি চাকরির আশায় জুতার তলা ক্ষয় করতে হয় না। এককথায়, চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে হয় না। ইচ্ছা করলে সাধারণ মানুষ নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান করে জীবনযাত্রার মানের উৎকর্ষ সাধন করতে পারে। একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ পেলে তাদের এ প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়া অবশ্য আরও সহজ হয়।
বস্তুত শাইখ সিরাজের প্রচেষ্টায়, তার উৎসাহে এদেশের অসংখ্য মানুষ তাদের কর্মসংস্থান করতে পেরেছে। পেরেছে নিজের জীবনের হাল ধরতে, নিজ ভাগ্য গড়ার কারিগর হতে। যা ঘটেছে মূলত নিজেদের সময়, শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের যা কিছু আছে তা দিয়েই তারা আত্মকর্মসংস্থান করেছে।
আত্মকর্মসংস্থানকারীরা শুধু হাঁস-গাছ-মাছই চাষ করছে না, তারা অনেক ব্যতিক্রমী পণ্যও উৎপাদন করছে। তারা উৎপাদনের অনেক নতুন ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। অনেক নতুন প্রযুক্তির প্রচলন করছে। তারা উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। নতুন নতুন পণ্য তারা দেশে-বিদেশে বাজারজাত করছে।
এ সকল আত্মকর্মসংস্থানকারীদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, গাঁয়ে-গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ। এদের একটি বড় অংশই স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর। এরা বহুলাংশে নিজেদের ন্যায্য প্রাপ্য সুযোগ ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা অবহেলিত। এদের মধ্যে নারী রয়েছে। রয়েছে পুরুষ। রয়েছে নবীন, রয়েছে প্রবীণ। এরাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পথের সকল বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। এরাই বাংলাদেশের মেরুদণ্ড।
এ সকল উদ্যমী ব্যক্তিদের মাধ্যমেই শাইখ সিরাজের কাজের সঙ্গে আমার পরিচয় দুই দশক আগে। দি হাঙ্গার প্রজেক্টের মাধ্যমে আমি নিজেও একটি ব্যতিক্রমী কাজে নিয়োজিত। এদেশের অতি সাধারণ মানুষ যাতে নিজেদেরকে জয় এবং অন্যদেরকে যুক্ত করে আত্মনির্ভরশীলতার পথে সামনে এগিয়ে যেতে পারে সে লক্ষ্যেই আমরা একদল স্বেচ্ছাব্রতী ‘উজ্জীবক’ সৃষ্টি করছি। গ্রামে-গঞ্জে প্রতিনিয়ত ঘোরার সুবাদে আত্মশক্তিতে বলীয়ান অসংখ্য এ সকল উজ্জীবকের কাছ থেকে তাদের জীবনে শাইখ সিরাজের অবদানের কথা প্রথম শুনতে পাই, যদিও তার সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় হয় আরও অনেক পরে। শুনতে পাই, কিভাবে তারা বিটিভি কর্তৃক প্রচারিত, শাইখ সিরাজ গ্রন্থিত ও উপস্থাপিত ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রণোদিত হয়ে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান করেছে। তাদের জীবনে তিনি আশার সঞ্চার করেছেন, ভরসা যুগিয়েছেন। এদের অনেকের জীবনের সত্যিকার হিরো শাইখ সিরাজ।
যতটুকু জানি, শাইখ সিরাজ ‘জিরো থেকেই হিরো’ হয়েছেন। কৃষিভিত্তিক একটি অনুষ্ঠানের একজন উপস্থাপক থেকে তিনি সারা বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত মুখ, একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। সমাজ পরিবর্তনের একজন গুরুত্বপূর্ণ রূপকার হয়ে উঠেছেন। তিনি একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। আরও অনেক সম্মাননা তাকে দেয়া হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়েছে।
শাইখ সিরাজের সম্মোহনী শক্তিতে ‘মাটি ও মানুষ’ বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটিতে পরিণত হয়েছিল। যদিও এর বিষয়বস্তুতে কোনো গ্লামার কিংবা মানুষের রিপুতে সুড়সুড়ি দেয়ার মতো উপাদান ছিল না। এটি সিনেমা, নাটক, গান কিংবা ক্রীড়া বিষয়ক অনুষ্ঠান ছিল না। রাজনীতিও এর বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এতে কোনো নামকরা নায়ক-নায়িকার উপস্থিতি ছিল না। ছিল না ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের সমাগম। তবুও এর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। দর্শক ছিল অগণিত। একইভাবে চ্যানেল আই-এ হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানটিও এদেশের কৃষক খামারিদের প্রাণের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শহর-নগরের মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে।
কিভাবে তা হল? আমার ধারণা, শাইখ সিরাজ কৃষির মতো নিরস বিষয়কে অত্যন্ত সফল ও মানুষের জীবনস্পর্শকারী অনুষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছেন তার বিশ্বাস ও একাগ্রতার কারণে। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন এদেশের মাটি ও মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনাকে। তিনি আরও বিশ্বাস করেন, এদেশের মাটিতে সোনা ফলাতে পারে। তিনি অনুধাবন করেন, উর্বর মাটি আর মিষ্টি পানির বাংলাদেশ এক অমিত সম্ভাবনার দেশ।
আমি দেখেছি, এদেশের মানুষের ওপর শাইখ সিরাজের আস্থা অপরিসীম। তিনি বিশ্বাস করেন নিরক্ষর হলেও, অপুষ্টিতে ভুগলেও, আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও, আমাদের জনগণ কোনো অংশেই কারও থেকে কম নয়। বিশেষত মেধা, সৃষ্টিশীলতা ও কর্মোদ্যমের দিক থেকে। তিনি বিশ্বাস করেন কবি নজরুলের সেই বিখ্যাত উক্তিতে, ‘বাঙালী তুমি ক্ষুদ্র নও, তুমি তুচ্ছ নও।/ একবার জেগে ওঠ, দেখবে তুমিও বিশ্ব বিজয়ী হতে পার’। এ আশা থেকেই তিনি এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছেন এবং তাদেরকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। একজনের সফলতার কাহিনী তুলে ধরে অন্যদেরকে প্রেরণা যুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছেন। একটি দৃষ্টান্ত ক্যামেরাবন্দি করে প্রচারের মাধ্যমে তিনি হাজারও কথার প্রয়োজনীয়তা দূর করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, চোখে দেখার মাধ্যমেই মানুষের মনে বিশ্বাসের উদ্রেক হয়।
আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির বাইরেও শাইখ সিরাজ উপস্থাপিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ ও পরবর্তীকালে চ্যানেল আই-এর ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান আরও দু’ভাবে বাংলাদেশের জন্য বিরাট অবদান রেখে চলেছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে দেশের যুব সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশের একটি অর্থবহ কার্যক্রমে নিয়োজিত ও ব্যস্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ অনুষ্ঠান দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টির অভাব পূরণে অনেকটা সহায়তা করেছে।
আমার দেখায়, শাইখ সিরাজ নিজেও একজন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী মানুষ। সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এবং ভিশনারি। তিনি দেশের স্বার্থে কথা বলেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। তিনি সকলের সম্মিলিত ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের জন্য একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শাইখ সিরাজ ইতিমধ্যে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার ৬২তম জন্মদিনে এ অবদান সম্পর্কে দুটি কথা বলতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। তিনি ভবিষ্যতে আরও গুরুপূর্ণ অবদান রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস। তাকে জন্মদিনের উষ্ণ শুভেচ্ছা।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

No comments:

Post a Comment