Sep 6, 2015

নির্বাচন কমিশন: আইন, বাধ্যবাধকতা সবই উপেক্ষিত

আমাদের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে যে চারটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ‘ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ’ অন্যতম। এ কাজে সহায়তার জন্য সংসদ কতগুলো আইন প্রণয়ন করেছে। কমিশনকে এসব আইনের আওতায় তার কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন, বাধ্যবাধকতা সবই উপেক্ষা করে চলেছে।
ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ১১(১) ধারায় বলা হয়েছে: ‘বিদ্যমান সকল ভোটার তালিকা, প্রতি বৎসর ২ জানুয়ারী হইতে ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে, নির্ধারিত পদ্ধতিতে, নিম্নরূপে হালনাগাদ করা হইবে, যথা:- (ক) পূর্বের বৎসরের ২রা জানুয়ারী হইতে যিনি ১৮ বৎসর পূর্ণ হইবার কারণে ভোটার হইবার যোগ্য হইয়াছেন অথবা যোগ্য ছিলেন, কিন্তু...তালিকাভুক্ত হন নাই, তাহাকে ভোটার তালিকাভুক্ত করা; (খ) উক্ত সময়ে যিনি মৃত্যুবরণ করিয়াছেন কিংবা তালিকাভুক্ত হইবার অযোগ্য ছিলেন কিংবা হইয়াছেন, তাহার নাম কর্তন করা;
এবং (গ) যিনি বিদ্যমান নির্বাচন এলাকা বা ক্ষেত্রমত, ভোটার এলাকা হইতে অন্য নির্বাচনী এলাকায় বা ক্ষেত্রমত, ভোটার এলাকায় আবাসস্থল পরিবর্তন করিয়াছেন, তাহার নাম পূর্বের এলাকার ভোটার তালিকা হইতে কর্তন করিয়া স্থানান্তরিত এলাকার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।’
আর ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য উপরিউক্ত কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২-তে ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর এ জন্য বিধিমালার ৩ ধারায় ‘ভোটার তালিকা প্রণয়ন, সংশোধন, পুনঃপরীক্ষা ও হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য...বাড়ি বাড়ি গমনপূর্বক ভোটারদের মধ্যে নির্ধারিত ফরম বিতরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য’ কমিশনকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাস্তবতার নিরিখেই আইনে জানুয়ারি মাসকে ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। জানুয়ারি মাস শুকনো মৌসুম, যখন বৃষ্টি-বাদলা, কাদা এবং বন্যা হওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ। তাই এই সময়ে তথ্য সংগ্রহকারীদের পক্ষে বিধি অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হবে।
ভোটার তালিকা আইনের ৭(১)(খ) ধারায় ‘আঠার বৎসরের কম বয়স্ক নহেন’ এমন ব্যক্তিদের নিয়ে ভোটার তালিকা তৈরির বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রথমে একটি ‘খসড়া’ এবং ওই তালিকায় সংযোজন ও বিয়োজনের পর ‘চূড়ান্ত’ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করার কথা বলা আছে।
ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ৭ ধারা অনুযায়ী: ‘(৬) চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নির্ধারিত পদ্ধতিতে রক্ষিত হইবে এবং জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকিবে, এবং কোন ব্যক্তি নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে উহার কপির জন্য আবেদন করিলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাকে উহা সরবরাহ করা হইবে। (৭) ভোটার তালিকা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশনের ওয়েব সাইটে সর্বসাধারণের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং হালনাগাদকৃত তালিকা দ্বারা উহা প্রতিস্থাপিত হইবে।’ প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের হালনাগাদের পর খসড়া সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা কমিশন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছিল।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো সুস্পষ্ট: (১) প্রতিবছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে; (২) জানুয়ারি মাসে হালনাগাদের কাজটি করতে হবে; (৩) হালনাগাদের কাজটি করতে তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে; (৪) ১৮ বছরের কম বয়স্কদের নিবন্ধন করতে কমিশনের আইনগত কোনো ক্ষমতা নেই; (৫) হালনাগাদ করা তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে; এবং (৬) কেউ ভোটার তালিকার কপি চাইলে কমিশনকে তা সরবরাহ করতে হবে। শেষোক্ত বাধ্যবাধকতাটি তথ্য অধিকার আইনেও রয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত আইনের এসব বাধ্যবাধকতার একটিও বর্তমান নির্বাচন কমিশন মানছে না। আইনের ১১(১) ধারায় প্রতিবছর ২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ভোটার তালিকা ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে হালনাগাদের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কমিশন গত ২৫ জুলাই থেকে তা শুরু করেছে। ২০১৪ সালেও মে থেকে নভেম্বর মাসে কমিশন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা হালনাগাদ কার্যক্রমের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দেশের অনেকগুলো এলাকা বর্তমানে বন্যাকবলিত এবং এখন তথ্য সংগ্রহের উপযুক্ত সময় নয়। তাই
বর্তমান সময়ে পরিপূর্ণ আন্তরিকতা থাকলেও কমিশনের পক্ষে হালনাগাদের কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২ অনুযায়ী, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার কথা থাকলেও তথ্য সংগ্রহকারীরা তা করবেন কি না, সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে খুব আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। কারণ, ২০১৪ সালে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি না গিয়েই হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এ বছরের প্রথম দিকে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম ছিল: ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ বাড়ি বাড়ি না গিয়েই’, (যুগান্তর); ‘বাড়ি বাড়ি না গেলেও প্রস্তুত ভোটার তালিকা,’ (ইত্তেফাক); ‘ভোটার করতে বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার অভিযোগ’, (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।
প্রসঙ্গত, বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণেই গত হালনাগাদের সময়ে যে ৪৬ লাখ ৯৫ হাজার নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে জেন্ডার গ্যাপ ছিল ১২ শতাংশ বা নারী-পুরুষের অনুপাত ৪৪: ৫৬, যদিও সর্বশেষ জনমিতি অনুযায়ী আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। আর ১৫ শতাংশের বেশি জেন্ডার গ্যাপ ছিল ১৯টি জেলায় এবং সর্বোচ্চ ছিল ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ ফেনী জেলায়। অর্থাৎ, গতবার অনেক নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের হালনাগাদের সময়ে তালিকায় যুক্ত হতে না পারলে তাঁরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রসঙ্গত, বিষয়টি একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরার কারণে নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি অযাচিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে।
বিদ্যমান ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এ ১৮ বছরের কম বয়সের কাউকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও নির্বাচন কমিশন ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়স্কদের অগ্রিম সাদা কাগজে নিবন্ধন করছে। নির্বাচন কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী (২৯ জুলাই ২০১৫), এভাবে ‘দুই বছরের অগ্রিম তথ্য নেওয়ার কারণে আগামী দুই বছর আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে না’। কমিশনের এ সিদ্ধান্ত ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২-এর ৩ ধারায় প্রতিবছর হালনাগাদ করার বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এর চেয়েও শঙ্কার বিষয় হলো, আগামী দুই বছর তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি না গেলে বাদ পড়া যোগ্য ভোটাররা কীভাবে তালিকায় যুক্ত হবেন? অযোগ্য ভোটারদের নামই বা কীভাবে তালিকা থেকে কর্তন করা হবে? আর বাড়ি বাড়ি না গেলে যেসব ভোটার আবাসস্থল পরিবর্তন করবেন, তারা কীভাবে নতুন আবাসস্থলে ভোটার হবেন? আর এসব সংযোজন-বিয়োজন না হলে, ভোটার তালিকা কোনোভাবেই নির্ভুল হবে না। তাই কমিশনের আগামী দুই বছর তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ না করা একটি তুঘলকি সিদ্ধান্ত বলেই আমাদের কাছে মনে হয়।
ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ৭(৭) ধারা অনুযায়ী, কমিশনের ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের জন্য সংরক্ষিত থাকার বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও কমিশনের ওয়েবসাইটে ভোটার তালিকা নেই। এ ছাড়া আইনের ৭(৬) ধারা অনুযায়ী যে কারও পক্ষেই ভোটার তালিকার কপি পাওয়ার বিধান থাকলেও এ ব্যাপারে কমিশনের আচরণ আইনের পরিপন্থী, এমনকি অস্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ, গত ১৮ জুনে এই লেখক ‘সুজন’-এর পক্ষ থেকে ‘হালনাগাদকৃত ভোটার তালিকার নারী-পুরুষের বিভাজনসহ বিস্তারিত তথ্য অর্থাৎ আসন ও জেলাভিত্তিক ভোটার’ সংখ্যা-সম্পর্কিত তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ভোটার তালিকার তথ্যের পরিবর্তে আমি নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে গত ৭ জুলাই একটি পত্র পাই, যাতে বলা হয়েছে: ‘আপনার সংস্থাটি কোন সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিবন্ধিত কিনা এবং নিবন্ধিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষের নাম, নিবন্ধন সংখ্যা ও সাল জানানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ ভোটার তালিকার তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধের সঙ্গে সুজনের নিবন্ধনের কী সম্পর্ক, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। আরও বোধগম্য নয়, এই পত্রের মাধ্যমে কমিশন আমাদের কী বার্তা দিতে চাইছে? তারা কি আমাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের আওতায় নাগরিকের সংগঠন করার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে?
পরিশেষে, একটি সঠিক ভোটার তালিকা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তথা গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য অপরিহার্য। ২০০৮ সালে প্রণীত আমাদের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকাটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা, যে তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশনের অধীনে গত হালনাগাদের সময় যে ৪৬ লাখ ৯৬ হাজার নতুন ভোটার বিদ্যমান তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন, তাতে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার বা ১২ শতাংশ কম, যা আমাদের ভোটার তালিকার সঠিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পারে না। আর ভোটার তালিকা হালনাগাদের বর্তমান উদ্যোগের ক্ষেত্রে কমিশন যে পথে চলছে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে বাধ্য।

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment