Aug 12, 2015

ভোটার তালিকায় জেন্ডার গ্যাপ প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


বর্তমানে আমাদের ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের অনুপাত বা জেন্ডার গ্যাপ নিয়ে একটি বিতর্ক চলছে। গত ২৫ জুলাই 'সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক' বিদ্যমান ভোটার তালিকায় জেন্ডার গ্যাপ সম্পর্কিত কিছু তথ্য একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উত্থাপন করে। একই সঙ্গে একই দিনে শুরু হওয়া ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলে এবং কমিশনের কাছে এগুলোর ব্যাখ্যা দাবি করে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত লিখিত প্রবন্ধে বলা হয়, ২০০৮-এর তালিকা অনুযায়ী আমাদের ভোটার সংখ্যা ছিল মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮। এর মধ্যে নারী ভোটার ৪ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৯ এবং পুরুষ ভোটার ৩ কোটি ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৫৪৯। অর্থাৎ ওই তালিকায় নারী ভোটার পুরুষ ভোটার থেকে ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ বেশি এবং নারী-পুরুষের অনুপাত ৫০.৮৭ : ৪৯.১২ বা 'জেন্ডার গ্যাপ' +১.৭৪%।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের উদ্বৃতি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বর্তমান কমিশনের অধীনে ২০১৩-১৪ সালের হালনাগাদের পর ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার ৫৩১। এর মধ্যে নারী ভোটার ছিল চার কোটি ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৬ এবং পুরুষ ভোটার চার কোটি ৬১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৫। অর্থাৎ ২০১৩ সালের তালিকায় নারী ভোটার পুরুষ ভোটার থেকে দুই লাখ ৯১ হাজার ৩৯৯ কম এবং নারী-পুরুষের অনুপাত ৪৯.৮৪ ঃ ৫০.১৬ বা জেন্ডার গ্যাপ -০.৩২%।
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদের একটি সার-সংক্ষেপ কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। সার-সংক্ষেপ অনুযায়ী ২০১৪-১৫ সালের হালনাগাদ শেষে চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫২, যার মধ্যে নারী ভোটার ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার ১০ এবং পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৮৪ লাখ ৫১ হাজার ৬৪২। অর্থাৎ সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় সাত লাখ চার হাজার ৬৩২ কম। নারী-পুরুষের অনুপাত ৪৯.৬৩ : ৫০.৩৭ বা জেন্ডার গ্যাপ -০.৭৪%।
এছাড়াও লিখিত প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪-১৫ সালের হালনাগাদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন ২ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে একটি খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে এবং ২২ জানুয়ারির মধ্যে এটি সংশোধনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। খসড়া তালিকা অনুযায়ী, নতুন ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ লাখের কিছু বেশি এবং নতুন ভোটারদের মধ্যে জেন্ডার গ্যাপ -১১.৬৭%।
খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকা অনুযায়ী, আমাদের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে আটটি জেলায় জেন্ডার গ্যাপ ৫% এর নিচে, ২৮টি জেলায় ৫-১০% এর মধ্যে, নয়টি জেলায় ১০-১৫% এর মধ্যে, ১১টি জেলায় ১৫-২০% এর মধ্যে, চারটি জেলায় ২০-২৫% এর মধ্যে, দুটি জেলায় ২৫-৩০% এর মধ্যে, একটি জেলায় ৩০-৩৫% এর মধ্যে এবং একটি জেলায় ৩৫-৪০% এর মধ্যে। অর্থাৎ আমাদের ২৮টি জেলায় নতুন ভোটারদের মধ্যে জেন্ডার গ্যাপ ১০% এর বেশি, যা উদ্বেগের কারণ না হয়ে পারে না।
খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় জেন্ডার গ্যাপ হলো ফেনীতে, যার পরিমাণ -৩৫.৩%। এর পর লক্ষ্মীপুরে -৩০.৮২%, নোয়াখালীতে -২৬.৪৪%, চাঁদপুরে -২৫.৭২%, কুমিল্লায় -২৩.৪%, কক্সবাজারে -২২.৫৮% এবং ভোলায় -২০.৮৪%।
জানুয়ারি ২ থেকে ২২ তারিখের সংযোজন-বিয়োজনের পর ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সার-সংক্ষেপ অনুযায়ী ২০১৪-১৫ সালের হালনাগাদের মাধ্যমে নতুন ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৪৬ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫০। এর মধ্যে নারী ভোটার ২০ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৪ এবং পুরুষ ভোটার ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৫০৬। অর্থাৎ সর্বশেষ চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন ভোটারদের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটার থেকে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬২ জন কম এবং নারী-পুরুষের অনুপাত ৫৬ : ৪৪ বা জেন্ডার গ্যাপ -১২%। আমরা সংবাদ সম্মেলনে সুস্পষ্টভাবে আরও বলেছি, নতুন ভোটারদের মধ্যকার এ ধরনের জেন্ডার গ্যাপ আমাদের জনসংখ্যায় বিরাজমান সেক্স রেশিও বা নারী-পুরুষের অনুপাতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১৪-১৫ সালে ভোটার তালিকায় নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের মধ্যকার জেন্ডার গ্যাপের কারণ হিসেবে হালনাগাদের সময় তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আমরা যুগান্তরে (২৬ জানুয়ারি ২০১৫) প্রকাশিত 'ভোটার তালিকা হালনাগাদ বাড়ি বাড়ি না গিয়েই,' ইত্তেফাকে (১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) প্রকাশিত 'বাড়ি বাড়ি না গেলেও প্রস্তুত ভোটার তালিকা' এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত (৩১ জানুয়ারি ২০১৫) 'ভোটার করতে বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার অভিযোগ' শিরোনামের প্রতিবেদনের উদৃব্দতি দিই।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে প্রকাশ করা সার-সংক্ষেপে নতুন ভোটারদের সম্পর্কে জেলাভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেও কমিশন থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। তাই খসড়া সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় প্রকাশিত উপাত্ত থেকে প্রাপ্ত জেলাওয়ারি নারী ও পুরুষ ভোটারের বিভাজন বা জেন্ডার গ্যাপের তথ্য সংবাদ সম্মেলনের প্রবন্ধে উপস্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আইনে ভোটার হওয়ার নির্ধারিত বয়স ১৮ বছর হওয়া সত্ত্বেও, ২৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী হালনাগাদ কার্যক্রমে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়স্কদের নাম নিবন্ধনের বিষয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি। এ ব্যাপারে আমরা কমিশনের কাছ থেকে ব্যাখ্যা দাবি করি। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা হালনাগাদের পর পুরো তালিকাটিকে কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা অডিটের আয়োজন করার আহ্বান জানাই।
আমাদের সংবাদ সম্মেলনের পর নির্বাচন কমিশন ২৮ জুলাই একটি এবং ২৯ জুলাই আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একটি টেবিলের মাধ্যমে দেখানো হয়, ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ২০০৭-০৮ সালে ৫০.৮৯ ঃ ৪৯.১১; ২০০৯-১০ সালে ৫০.৫৪ ঃ ৪৯.৪৬; ২০১২-১৩ সালে ৪৯.৭৫ ঃ ৫০.২৫; এবং ২০১৪-১৫ সালে ৪৯.৬১ ঃ ৫০.৩৯। একই সঙ্গে যে কয়েকটি জেলার নতুন ভোটারদের মধ্যে অস্বাভাবিক উচ্চহারের জেন্ডার গ্যাপের তথ্য আমরা আমাদের লিখিত বক্তব্যে উপস্থাপন করেছি, কমিশন সেই সব জেলার মোট ভোটারদের মধ্যকার নারী-পুরুষের অনুপাতের তথ্য প্রকাশ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন দাবি করে, 'সুজনের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যাদি সম্পূর্ণ ভুল।'
লক্ষণীয়, মোট ভোটার তালিকার ক্ষেত্রে আমরা সংবাদ সম্মেলনে নারী-পুরুষের অনুপাতের যে তথ্য উপস্থাপন করেছি, তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রদত্ত তথ্যের কোনো অমিল নেই। তবুও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, সংবাদ সম্মেলনে আমাদের উপস্থাপিত তথ্যাদি সম্পূূর্ণ ভুল। আমাদের তথ্যের সূত্র নির্বাচন কমিশন এবং আমাদের তথ্য ভুল হলে এ জন্য দায়ী কমিশন। তবে আমাদের তথ্যে কোনো ভুল নেই।
আরও লক্ষণীয়, ২০১৪-১৫ সালে ভোটার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হওয়া প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের মধ্যে বিরাজমান -১২% জেন্ডার গ্যাপের বিষয়টি কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়। বরং কমিশন তার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আমরা বলেছি পুরো ভোটার তালিকার মধ্যে
-১২% জেন্ডার গ্যাপ। এ ধরনের কোনো বক্তব্যই আমাদের ২৫ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি। তাই কমিশনের প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রদত্ত বক্তব্য সত্যের সম্পূর্ণ অপলাপ। নিজেদের অপারগতা ঢাকার জন্যই কমিশন একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের আচরণ আশা করা যায় না।
দ্বিতীয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সুজনের নাম উল্লেখ না করে কমিশন কর্তৃক চলমান হালনাগাদ কার্যক্রমে ১৫-১৭ বছর বয়স্কদের নিবন্ধনের ব্যাখ্যা দেয়। কমিশন দাবি করে, এসব অপ্রাপ্তবয়স্ককে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা হচ্ছে না, বরং সম্ভাব্য ভোটার হিসেবে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে এবং ১৮ বছর পূর্ণ হলে তাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে আগামী দু'বছর আর ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে না, যাতে অর্থ সাশ্রয় হবে।
আমরা মনে করি, কমিশনের এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত এবং এর পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে। প্রথমত, বিদ্যমান ভোটার তালিকা আইন ২০০৯ অনুযায়ী, প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা কমিশনের জন্য বাধ্যতামূলক। এছাড়াও হালনাগাদ কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে শুধু এমন ব্যক্তিদেরই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে অতীতে ভোটার হতে পারেনি এমন ব্যক্তিদের নামও ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হয়, মৃত এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, এবং ঠিকানা বদল করেছে এমন ব্যক্তিদের নাম নতুন ঠিকানায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই আগামী দু'বছর হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনা না করা এবং ভোটারদের বাড়িতে না গিয়ে হালনাগাদ করা হলে সেই তালিকা সঠিক হবে না, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি করবে বলেই আমাদের আশঙ্কা।
পরিশেষে, সেনাবাহিনীর সহায়তায় আগের নির্বাচন কমিশন প্রণীত ২০০৮ সালের ভোটার তালিকাটি ছিল তৃতীয় পক্ষের অডিট অনুযায়ী প্রায় নির্ভুল। সেই তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার ছিল ১৪ লাখের মতো বেশি। কিন্তু বর্তমান কমিশনের অধীনে ২০১৪-১৫ হালনাগাদের সময় যে ৪৭ লাখের মতো নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে তাতে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার কম। ফলে জেন্ডার গ্যাপ -১২%। এ ধরনের জেন্ডার গ্যাপ আমাদের জনসংখ্যায় বিরাজমান সেক্স রেশিওর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এছাড়াও আমাদের দেশে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়া উচিত। কারণ আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে কর্মরত; তাদের অধিকাংশই পুরুষ এবং তাদের অনেকেই ভোটার নন। উপরন্তু আমাদের দেশে নারীদের গড় আয়ুষ্কাল পুরুষের চেয়ে বেশি। তাই আমাদের আশঙ্কা, আমাদের ভোটার তালিকার সঠিকতা ঝুঁকির মুখে এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন 'ভোটার-তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ'-এর সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না।

তথ্যসূত্র: সমকাল, ১২ আগস্ট ২০১৫

No comments:

Post a Comment