Aug 12, 2015

আমার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার সময়টায় আমি তার একজন কর্মী ছিলাম। ১৯৬৪ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তারপর থেকে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়। ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের সময় সেই আন্দোলনের আমিও একজন তরুণ সক্রিয় কর্মী। তিনি এবং মনি ভাই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। ঊনসত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ‘মুজিব ভাই’কে কারামুক্ত করে যে বিশাল জনসভায় আমাদের সহযাত্রী তোফায়েল আহমেদ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন, তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেই সভার আমিও একজন গর্বিত অংশীদার।
বঙ্গবন্ধুর মতো একজন সর্বজয়ী ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে আমরা নিজেরাও ষাটের দশকে নিজেদের অজেয় ভাবতে শিখেছিলাম। আমাদের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং তার প্রতি আমাদের দ্বিধাহীন আস্থাই এর কারণ। ষাটের দশকের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ইতিহাসও যেন নির্ভর করার জন্য এ দীর্ঘদেহী, ঋজু মানুষটির প্রশস্ত কাঁধেই তার দক্ষিণহস্ত স্থাপন করেছিল।

অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক সংগ্রামের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে সক্রিয় এবং কালের পরিক্রমায় পাদপ্রদীপের সবটুকু আলো নিজের ওপর টেনে নিয়ে তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। বিশেষত ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিগত ক্যারিশমার যে সর্বোচ্চ চূড়ায় তিনি আরোহণ করেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত তার সে অবস্থান ছিল অবিচল। একটা পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর একক কোনো ব্যক্তির এমন সর্বব্যাপী কর্তৃত্ব ও প্রভাব অর্জনের ঘটনা পুরো পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল।
বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনপরিক্রমা পর্যবেক্ষণ করলে তার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের একটা বিকাশের ধারা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। অবিভক্ত ভারতে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালি তরুণের মতোই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তিনি বাঙালি মুসলমানের মুক্তি নিহিত বলে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। সে লক্ষ্যে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। অবহেলিত পূর্ব বাংলার আরও অনগ্রসর এক মফস্বলের একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হয়েও অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের জন্য তিনি অচিরেই সোহরাওয়ার্দীর মতো একজন জাতীয় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। মুসলিম লীগের সাংগঠনিক বিস্তারে মুজিবের ওপর সোহরাওয়ার্দীর নির্ভরতা ছিল অপরিসীম, আর তাদের এ গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক টিকে ছিল আজীবন।
ভারত ভাগের সেই সময়টায়, যখন রাজনীতির বড় প্রভাবক ছিল সাম্প্রদায়িকতা, তখনও বঙ্গবন্ধুর ওপর নেতাজী সুভাষ বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। বিশেষত নেতাজীর নেতৃত্বে ‘আযাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠন করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুকে যথেষ্ট আলোড়িত করেছিল। পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধু ক্রমশ মুসলিম লীগের কট্টরপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল অংশ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল ও উদারপন্থী অংশের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। এ পর্যায়ে আবুল হাশিম সাহেবের সংস্পর্শ বঙ্গবন্ধু ও তার সমসাময়িক তরুণ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। একজন মুসলিম জাতীয়তাবাদী থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর উন্মেষের সূচনাও ঘটে এ সময়।
পাকিস্তানের সূচনালগ্নেই ভাষার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় দর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যান। বস্তুত পাকিস্তান অর্জনের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা বুঝতে বঙ্গবন্ধু মোটেও সময় ব্যয় করেননি। মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার রাজনীতিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির মূলধারা হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তান আমলজুড়ে তার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। যখন প্রদেশের নাম পাল্টে ‘পূর্ব পকিস্তান’ করার সিদ্ধান্ত হয়, তখন ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, “আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে ‘বাংলা’ নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, একটা ঐতিহ্য আছে।”
বাঙালির ইতিহাস, তার ঐতিহ্যের গর্বিত উত্তরাধিকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “এক সময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।... একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।” তার বাঙালি জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের অস্তিত্বের শেকড় ধরেই টান দিয়েছিল। পাকিস্তানি এস্টাব্লিশমেন্ট বঙ্গবন্ধুকে দেখত দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্য প্রধানতম হুমকি হিসেবে।
পাকিস্তান আমলজুড়ে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে বঙ্গবন্ধু নিজেকে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গণতন্ত্র নিয়ে তার বোঝাপড়া, তার কমিটমেন্ট তিনি দলীয় কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেও অক্লান্ত ছিলেন। ছাত্রলীগ থেকে তার বিদায়ী সম্মেলনে তিনি কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’ রাজনৈতিক পদ-পদবির চেয়ে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা তার কাছে যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল- তার প্রমাণ তিনি বিভিন্ন সময়েই রেখেছেন। ১৯৫৭ সালে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দলকে সংগঠিত করতে। ১৯৭০-এর নির্বাচন-পরবর্তী শাসনতান্ত্রিক সংকটকালে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, বাংলার মানুষের অধিকার চাই।’ মানুষ তার কথা বিশ্বাস করেছিল।
আইয়ুব খানের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’র বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রায় দশকব্যাপী সার্বজনীন ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। কারণ বেসিক ডেমোক্রেসি মূলত গণতন্ত্রের ছদ্মনামে রাজনৈতিক দলগুলোকে অকার্যকর করে তোলা, বিরাজনীতিকরণ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করারই আয়োজন ছিল। একই সঙ্গে একীভূত পাকিস্তানের নামে সব সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে তিনি বিকেন্দ্রীকরণ তথা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। তার ঐতিহাসিক ছয় দফা একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। এই ছয় দফাকে গ্রহণ না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রের অঙ্গহানি ঘটিয়েছে। অথচ আজও বেলুচিস্তানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়িত জাতিগুলোর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শেখ মুজিব ও তার ছয় দফা এক অনিঃশেষ প্রেরণার নাম।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের একটি সার্থক সংকলন হিসেবেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটিকে দেখতে পাই। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এ চার মূল নীতিকে ভিত্তি করে একটি বহুত্ববাদী, অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পদে পদে বিঘ্নিত হয়েছে। আমাদের শাসকদের স্বার্থপরতা, গণতন্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধা, জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার অভাব এবং নিজেদের প্রতি আস্থাহীনতাই আমাদের এ স্বপ্নযাত্রা বিঘ্নিত হওয়ার প্রধান কারণ। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্রের চেতনা আমাদের মধ্যে পুনর্জাগরিত হবে, মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসা ও আস্থা নিয়ে বজ নিনাদে আবারও ‘বাংলার মানুষের অধিকার চাই’ বলার মতো সিংহহৃদয় নেতৃত্বের আবির্ভাব হবে এ প্রত্যাশায় থাকি। কারণ মানুষের মৃত্যু আছে কিন্তু তার আদর্শ ও অবদানের মৃত্যু নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি জানাই আমার সশ্রদ্ধ সালাম।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ১২ আগস্ট ২০১৫
১২ আগস্ট, ২০১৫
১২ আগস্ট, ২০১৫

No comments:

Post a Comment