Jul 8, 2015

ভুঁইফোড় সংগঠনের বিষফোঁড়া

দৈনিক সমকালে গত ৪ জুলাই শনিবার প্রকাশিত 'চাঁদাবাজ ভুঁইফোড় সংগঠনের ছড়াছড়ি' শীর্ষক প্রধান প্রতিবেদনটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জন্ম দিয়েছে কৌতূহলেরও। আমরা যখন মূলধারার রাজনীতিতে নানা অসঙ্গতি দেখে অভ্যস্ত, তখন এই খবর নতুন মাত্রা যোগ করে বৈকি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নাম, আদর্শ, নেতৃত্ব, প্রতীক ব্যবহার করে শতাধিক ভুঁঁইফোড় সংগঠনের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। তারা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সাইডলাইনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রধান বা বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারাও মহাউৎসাহে সেখানে যোগ দিয়ে নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আমরা সেটা দেখেও থাকি।
কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনটিতে কিছু 'নেপথ্য' খবরও পাওয়া যাচ্ছে। যেমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রধান বা বিশেষ অতিথিই যেচে সেখানে যান, এমনকি অর্থ সহায়তা দিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ক্ষমতাসীন দল সমর্থক কিছু ব্যবসায়ী যারা রাজনীতিতে আগ্রহী, তারাও আছেন এই দলে। প্রধান বা বিশেষ অতিথি না হলেও অন্তত বক্তা হিসেবে মঞ্চে বসা এবং সেই সুবাদে সংবাদমাধ্যমে 'পরিচিতি' পাচ্ছেন। এসব সংগঠনই আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে 'অবদান' রাখার জন্য নানা পদক বা পুরস্কার দিচ্ছে। অনুুমান করা কঠিন নয় যে, ওই পুরস্কার ও তার বিতরণ অনুষ্ঠানের আনুষঙ্গিক খরচ পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির পকেট থেকেই যাচ্ছে।
সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়াদের সাড়ে ছয় বছরের মাথায় এমন ভুঁঁইফোড় সংগঠনের সংখ্যা শতাধিক দাঁড়িয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম নয়টি সংগঠনের বাইরে অন্য কোনো সংগঠনের দলীয় পরিচয় ব্যবহারের সুযোগই নেই। সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পূর্বানুমোদনও বাধ্যতামূলক। কিন্তু ভুঁঁইফোড় সংগঠনগুলো এসব কিছুই মানছে না। এর তথাকথিত নেতাদের অনেকে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে গেছেন। তাদের গড়ে তোলা 'সংগঠন' কী ধরনের নাম ব্যবহার করে, সেটা বোঝার জন্য সমকালের ওই প্রতিবেদন থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি_ ''সংগঠনের নামকরণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ কামাল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উঠে আসছে অহরহ। এ ছাড়া 'আওয়ামী', 'লীগ', 'মুক্তিযুদ্ধ', 'মুক্তিযোদ্ধা', 'স্বাধীনতা', 'নৌকা', 'জয় বাংলা', 'প্রজন্ম'সহ নানা শব্দও ব্যবহার হচ্ছে অবাধে। হালে আওয়ামী লীগ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' স্লোগানের অনুকরণে সংগঠনের নামের আগে 'ডিজিটাল' শব্দের ব্যবহারও বেড়েছে।''
প্রশ্ন হচ্ছে_ কেন এসব নামে এতগুলো সংগঠন? অস্বীকার করা যাবে না যে সংগঠিত হওয়া, সংগঠন তৈরি ও জনপরিসরে অনুষ্ঠান সাংবিধানিক অধিকার। নাগরিকদের যে কেউ চাইলে রাজনৈতিক, পেশাজীবী বা সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করতে পারে ও যুক্ত হতে পারে। প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন সেসব নামের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নাম, আদর্শ ও প্রতীক যুক্ত করে শুধু আখের গোছানোর অপচেষ্টা চালানো হয়। এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, এই শতাধিক সংগঠনের বিপুল অধিকাংশই সৃষ্টি হয়েছে ফায়দাভিত্তিক রাজনীতির জন্য। ফায়দা মানে কী? এর অর্থ হচ্চ্েছ, সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে না হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট হবে এবং এই ব্যক্তিরা সেখানে অগ্রাধিকার লাভ করবে। ফায়দা দুইভাবে বিতরণ হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য। যাদের ফায়দা দেয়, তাদের সঙ্গে লেনদেন থাকে। দ্বিতীয় ধরনের হচ্ছে, দলের নাম ব্যবহার করে দলেরই কিছু ব্যক্তি এসব সংগঠনকে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এখানেও লেনদেনের সম্পর্ক থাকতে পারে।
এ ধরনের সংগঠন যে কেবল গত সাড়ে ছয় বছরে চালু হয়েছে, তা নয়। বস্তুত রাজনীতিতে সবসময়ই সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ছিল। স্বাধীনতার আগে-পরে পেশাজীবী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক সুষ্ঠুতা ও সুস্থতার ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর 'গণতান্ত্রিক' যুগে এসে পেশাজীবী সংগঠনের নামে এ ধরনের রাজনৈতিক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে এটা আরও নগ্ন হয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে। কেবল ক্ষমতাসীন নয়, বিরোধীদলীয় রাজনীতির সঙ্গেও এ ধরনের ভুঁঁইফোড় সংগঠন যুক্ত হচ্ছে।
নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায়, ভুঁঁইফোড় সংগঠনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, এর নেতৃস্থানীয়রা বরাবরই চরিত্রগত দিক থেকে সুবিধাবাদী। অন্যরাও তাদের এই চরিত্র সম্পর্কে কমবেশি জানে। দ্বিতীয়ত, এসব সংগঠন গড়ে তোলাই হয় প্রভাবশালীদের অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে। যারা এসব সংগঠনের কর্মী পর্যায়ে থাকেন, তারাও জানেন যে এখানে আদর্শ বলে কিছু নেই; মূল লক্ষ্য হচ্ছে সুযোগ-সুবিধা লাভ। তৃতীয়ত, নব্বই দশক থেকেই দেখা গেছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে; তাদের আদর্শ, প্রতীক, নাম নিয়ে ভুঁঁইফোড় সংগঠনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। চতুর্থত, কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন, পদক বিতরণ নয়; এসব সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে তারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। সফলও হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
এসব সংগঠন কি আইনগত বৈধ? বা ক্ষমতাসীন দলের গঠনতান্ত্রিক দিক থেকে স্বীকৃত? আইনগতভাগে বৈধ নয়। এগুলোর বিপুল অধিকাংশেরই নিবন্ধনের বালাই নেই। স্থায়ী ঠিকানাও নেই। বেশিরভাগ সংগঠনেরই ঠিকানা হিসেবে প্যাডে বা কাগজপত্রে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা থাকে। যেমন আলোচ্য সংগঠনগুলোর অনেকটির ঠিকানা হচ্ছে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ক্ষমতাসীন দলের গঠনতান্ত্রিক দিক থেকেও এসব সংগঠন স্বীকৃত নয়। কারণ নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এমন সংগঠন তো নয়ই; এমনকি অঙ্গ সংগঠনও থাকতে পারে না। যে কারণে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন মানতে গিয়ে এখন ছাত্রলীগ বা যুবলীগের মতো সংগঠনগুলোকে বলা হয় 'ভ্রাতৃপ্রতিম'। যদিও নামেই ভ্রাতৃপ্রতিম; আদতে অঙ্গ সংগঠনের চেয়েও পোষ্য। রাজনীতির নামে আসলে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যবহার করা হয়। এই যদি হয় অঙ্গ বা ভ্রাতৃসংগঠনের পরিস্থিতি; স্বীকৃতিহীন, বৈধতাহীন ভুঁঁইফোড় সংগঠনের অবস্থা বলাই বাহুল্য।
কেন শতাধিক সংগঠন? কারণ এগুলোর 'বাজার' আছে। এদের অনেক নেতা-নেত্রীর পৃষ্ঠপোষকতা আছে। তারা এদের মাধ্যমে মিডিয়ায় আসতে পারে। ব্যবসায়ীরা বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পান। মিডিয়া কাভারেজ হয়। আরেকটি কারণে হয়, এদের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলেরও সুবিধা হয়। তাদের কিছু বক্তব্য মিডিয়ায় আসে। গণতান্ত্রিক শাসনামলে দল সরকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। ফলে এগুলো দলের কিছু বক্তব্য, অবস্থান এসব সংগঠনের মাধ্যমে মিডিয়ায় আসে। মাঠ কিছুটা গরম থাকে। বড় কারণ হচ্ছে, অবশ্যই অর্থবিত্ত, গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়। অনেকেরই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। আরেকটি আকর্ষণ হচ্ছে, অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়া। 'দলীয়' লোক হিসেবে অন্যায়, দুর্নীতি করেও এই সাইনবোর্ডের কারণে পার পেয়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরে আমরা যে মেগাবাজেট দেখি, সেটাও হচ্ছে কিন্তু ফায়দাবাজি টিকিয়ে রাখার জন্য। আসলে ফায়দা চেইন থাকে; এসব ভুঁঁইফোড় সংগঠন সেই চেইনের অংশ। এদের কারণেই বাজেট-স্ফীতি বাড়ে, বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়।
প্রয়াত প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান একবার বলেছিলেন, দেশ বাজিকরদের দখলে। তিনি চাঁদাবাজি, কমিশনবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, তদবিরবাজির কথা বলেছিলেন। এখন বেঁচে থাকলে দেখতেন, বাজিকরদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কীভাবে বেড়েছে। এসব ভুঁঁইফোড় সংগঠন হচ্ছে ফায়দাবাজির মাধ্যম ও ফসল।
মুশকিল হচ্ছে, এসব সংগঠন ও তাদের আগে-পরের চেইনের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবেই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার ঘটে; আইনের শাসন পদদলিত হয়, মেধাশূন্যতা সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে সম্পদের অপচয়ও হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশের সম্পদের অপ্রতুলতা থাকে। কিন্তু এসব ভুঁঁইফোড় সংগঠন কিংবা ফায়দা চেইনের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় না। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে। আমি আশা করি, সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ক্ষমতাসীন দলের যারা প্রকৃত রাজনীতিবিদ, তারাও বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে সোচ্চার হবেন। কারণ এতে তাদের দল ও রাজনীতিরও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: ০৯ জুলাই ২০১৫, সমকাল

No comments:

Post a Comment