May 1, 2015

সিটি নির্বাচন-২০১৫: চ্যালেঞ্জটায় আমরা উত্তীর্ণ হতে পারিনি

শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো যে আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করি না। বরং আমরা শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের প্রতিষ্ঠান সুজনের মাঠ পর্যায়ে সেই অর্থে কোনো পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও নেই। আমরা এখন যা বলছি সেটা গণমাধ্যমের সুবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের যেসব স্বেচ্ছাভিত্তিক সূত্র আছে সেসব থেকে পাওয়া তথ্যের আলোকে, কিছুতেই পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে নয়।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি উঠেছে বিএনপি ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। তাঁদের ভাষ্য হচ্ছে, তাঁদের এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি; অনেক ক্ষেত্রে এজেন্ট ও ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও নির্বাচনী কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন; জাল ভোটও পড়েছে। এ ধরনের অনেক অভিযোগ তাঁদের।
একই সঙ্গে আরো কিছু অভিযোগ উঠেছে যে গণমাধ্যমের ওপর কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়। আর এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহারও করেছেন। চট্টগ্রামে বিএনপি সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মনজুর আলম তো সকালবেলায়ই সরে দাঁড়িয়েছেন। সম্ভবত সকাল ১১টা বা এর কাছাকাছি কোনো সময়ে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।


এদিকে পাল্টা অভিযোগ এসেছে সরকারের পক্ষ থেকেও। তারা বলছে, বিএনপির পক্ষ থেকে এসবই পূর্বপরিকল্পিত। নির্বাচনে হারবে- এ উপলব্ধি হওয়ার কারণেই তারা সরে দাঁড়িয়েছে। আর মনজুর আলমের সকাল ১১টার দিকেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোকে ক্ষমতাসীনপক্ষ সন্দেহজনকভাবেই দেখছে। তারা আরো বলছে, মনজুর আলম যে রাজনীতি থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, এটাও সেই পূর্বপরিকল্পনারই অংশ; একই সঙ্গে এটি দলের প্রতি তাঁর ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ।

আমরা এখনো বিশদ জানি না। তবে এটা ঠিক যে নির্বাচনটা যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে হচ্ছে না। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এবং মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রতি সমর্থনদানের ফলে শান্তির একটি সুবাতাস বইছিল। আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচনটি বিতর্ক ছাড়া, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ ছাড়া সম্পন্ন হবে এবং এর ধারাবাহিকতায় শান্তির সুবাতাসও যথারীতি প্রবহমান থাকবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক যেসব বিরোধ বিদ্যমান, সেই বিরোধও মীমাংসার পথ সুগম হবে নির্বাচনের পর। একই সঙ্গে আরো কিছু সমস্যা ছিল। যেমন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আস্থাহীনতার অভিযোগ ছিল ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে। অভিযোগ ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এ নির্বাচনের সুবাদে এসব অভিযোগেরও অবসান হবে যথারীতি। আমরা এ আশাও করেছিলাম যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ ধরে সুগম হবে আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে বিতর্কেরও অবসান হবে।

চ্যালেঞ্জটায় আমরা উত্তীর্ণ হতে পারিনি

তাই বলতে হয়, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, যেমন এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, বিএনপির এই নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা, সেই সঙ্গে মনজুর আলমের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো- এক কথায় এসবই চরম হতাশাব্যঞ্জক হলো। এ ছাড়া আমাদের জনগণের যে ভোটের অধিকার এই তিন সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম তারও গুড়ে বালি। এক অর্থে এটা সবার জন্য অশনিসংকেতও। আমাদের আশঙ্কার কারণ, নির্বাচন হলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের উপযুক্ত পথ। এই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালা বদলের পন্থাটি যখন রুদ্ধ হয় তখন শান্তি আর ফিরে আসে না।

আর এই নির্বাচন নিয়ে এমনিতেই অনেক সংশয় ছিল। কারণ এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও একে জাতীয় নির্বাচনে রূপ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিন সিটি নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের প্রক্সিতে পরিণত হয়েছিল। আর আমাদের প্রধান দল দুটি যেহেতু যুদ্ধংদেহি ভাব নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান করে থাকে এবং তাদের মধ্যে যে মাত্রায় উত্তাপ-উত্তেজনা, দ্বন্দ্ব-হানাহানি বিদ্যমান, এর ফলে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এটা আসলেই একটা বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। এটা নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের জন্য একটা পরীক্ষাও ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সে চ্যালেঞ্জটায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি।

আর আমাদের নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ, ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। যেমন, এক পক্ষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সংঘটিত ব্যাপক সহিংসতা নিয়ে অভিযোগ ও ক্ষোভ রয়েছে আরেক পক্ষের। পেট্রলবোমায় বহু লোকের প্রাণহানির জন্য তারা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মসূচিকেও দায়ী করছে। আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচনের সুযোগে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই জনগণ তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। কিন্তু নির্বাচন যখন বিতর্কিত হয়ে পড়ে তখন এই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশটি ঘটার সুযোগ আর থাকে না। ম্যান্ডেটের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন পাওয়ার যে ব্যাপারটি থাকে তা আর তখন সম্ভব হয় না। আর এ অবস্থায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশটি ঘটতে পারে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে।

আমাদের সমাজের জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ তরুণ। এই তরুণরাই আমাদের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে থাকে। এই তরুণরা একই সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপও হয়ে উঠতে পারে। রাজনীতিবিদরা এই তরুণদের বিভিন্ন রকমের সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছেন। এখন যদি নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের ক্ষোভ, আবেগ এসবের বহিঃপ্রকাশের পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন এর বহিঃপ্রকাশ অনিয়মতান্ত্রিকভাবেও হতে পারে। আর এই তরুণরা যদি এর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং আমরা জানি তাদের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ, ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে, তখন আমাদের দেশটি নরকে পরিণত হতে পারে। এই বাস্তবতায় আমি শঙ্কিত, আতঙ্কিত। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমি আশা করি, নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট সবাই মাথা ঠাণ্ডা করে বিষয়টা পর্যালোচনা করে জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থে, দল-মত-নির্বিশেষে সব নাগরিকের স্বার্থে একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেবে। এর অন্যতম লক্ষ্য হবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা, সেই সঙ্গে সহিংসতার পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিকতা ফিরিয়ে আনা।

এখন যদি রাজনীতিবিদরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন, তাহলে হয়তো আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের একটা পর্বে উত্তীর্ণ হতে পারব। তা না হলে আবারও পরিস্থিতি সেই আন্দোলন, দ্বন্দ্ব, হানাহানি, সহিংসতা, মানুষের প্রাণহানির দিকে চলে যেতে পারে। আর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যায় এবং মানুষের ক্ষোভ যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকাশের সুযোগ না পায়, তাহলে এর পরিণতি হয় যথারীতি অনিয়মতান্ত্রিকতা।

শেষে নির্বাচন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলি, আমি যে কেন্দ্রে সকালে ভোট দিয়েছি, সেখানে ওই সময় শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ভোটার উপস্থিতি অবশ্য কম ছিল। আর যেসব জায়গায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির লোকজন বসবাস করে, সেখানে ভোটার উপস্থিতি কমই ছিল। তবে আমি পরে শুনেছি, আমার কেন্দ্রেও গোলমাল হয়েছে।

তথ্যসূত্র:
http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2015/04/29/216022#sthash.wGKXkDtE.dpuf

No comments:

Post a Comment