May 3, 2015

সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় আজকের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মাধ্যমেই সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

ঢাকার দুই অংশের জন্য এ নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, আট বছর ধরে তা মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ঢাকাকে বাসযোগ্য, আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে কি-না এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রয়োজনীয় সেবা তারা পাবে কি-না, তা বহুলাংশে নির্ভর করবে যদি এসব নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। তাই নাগরিকদের জন্য এ নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।

গুরুত্বের দিক থেকে তিন সিটি আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে দলীয় ভিত্তিতে প্রার্থীদের সমর্থন বা মনোনয়ন দেয়ার কারণে। দলীয় ভিত্তিতে প্রার্থী সমর্থনের ফলে এ নির্বাচন একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রক্সিতে পরিণত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। বস্তুত অনেকে মনে করছেন, এ নির্বাচনকে সরকার এবং সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল অনেকাংশে রেফারেন্ডামে পরিণত করেছে। অর্থাৎ এ নির্বাচন স্থানীয় নির্বাচনের চরিত্র হারিয়ে মিনি জাতীয় নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।


এর ফলে এ নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট উত্তাপ-উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় প্রার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-হানাহানি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই হানাহানিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে আইনশৃংখলা বাহিনীর উপস্থিতিতে তিন-তিনবার হামলার মাধ্যমে এবং হামলাকারীদের নির্বিঘ্নে হামলাস্থল ত্যাগ করতে দেয়ায়। সর্বশেষ মাহী বি. চৌধুরীর ওপর আক্রমণের মাধ্যমে সবার মধ্যে নতুনভাবে শংকা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

আজকের তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হওয়া জরুরি। কারণ একমাত্র নির্বাচনই ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পন্থা। ক্ষমতা হস্তান্তরের এটা সভ্যতম পন্থাও। নির্বাচন যদি শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে পারি। দ্বন্দ্ব-হানাহানির দানব আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, যা কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। এ ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি জঙ্গিবাদ উত্থানের উর্বর ক্ষেত্রও প্রস্তুত করে।

আজকের নির্বাচন নিয়ে অনেক গুজব শোনা যাচ্ছে। এসব গুজব অনেক উদ্বেগ-আশংকা তৈরি করে। ফলে নির্বাচনের ফল জনমতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাবে কি-না, এ ব্যাপারে জনমনে অনেক উদ্বেগ-আশংকা তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনী নিয়ে যে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে, তা উদ্বেগ-আশংকা সৃষ্টির পালে হাওয়া জুগিয়েছে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিলেও কমিশন তাদের ঘোষণা থেকে সরে এসেছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনীর ব্যারাকে থাকা সেনাবাহিনী মোতায়েন না করারই নামান্তর মনে করছেন অনেকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরাজমান উত্তাপ-উত্তেজনার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি অনেক নাগরিক করে আসছেন। কিন্তু সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে থাকলেও তাদের কাছ থেকে কোনো কার্যকর ভূমিকা নির্ভর করবে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসারদের সদিচ্ছার ওপর। উদাহরণস্বরূপ, গত উপজেলা নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সংশ্লিষ্ট উপজেলাতেই অবস্থান করছিল। কিন্তু নির্বাচনের শেষ কয়েক ধাপে ব্যাপক জালিয়াতি, কারচুপি, জাল ভোট দেয়া, ব্যালট বাক্সে সিল মারা, সহিংসতা, এমনকি মানুষের প্রাণহানি সত্ত্বেও সেনাবাহিনীকে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। তাই সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা বললেই হবে না। নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকতে হবে। সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে যে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করা হল, তাতে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেকের মনে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আরও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- নির্বাচন কমিশন থেকে আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগে খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে। আচরণবিধির ৬(১) ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে খালেদা জিয়া যদি জনগণের চলাফেরায় বিঘ্ন সৃষ্টি করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াই যেতে পারে এবং এটা করা প্রয়োজনও। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে আক্রমণ করে যারা শান্তিভঙ্গ করল, তাদের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অনেকের মতে, এটি কমিশনের একচোখা নীতিরই প্রতিফলন।

নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা দিলেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব কমিশনেরই। এ দায়িত্ব তাদেরই পালন করতে হবে। আর এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন আইনি বিধি-বিধানের সংযোজনও করতে পারে। তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে এবং যে কোনো মূল্যে সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। কমিশনকে এ ক্ষমতা ব্যবহার করে তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে হবে। তাই আজকের নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা।

আজকের নির্বাচন আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্যও একটি বড় ধরনের পরীক্ষা। ক্রমাগতভাবে দলীয়করণের কারণে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আইনশৃংখলা বাহিনীতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মও তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে পর্বতপ্রমাণ বাধা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনমনে এমন আশংকা সৃষ্টি হতে পারে যে, এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব কি-না! তাই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের নিজের স্বার্থেই আজকের নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

এ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের জন্যও একটি বড় মাপের পরীক্ষা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার তথাকথিত নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আশার বাণী শোনানো হয়েছিল যে, নির্বাচনের পরে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। আর এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার পর একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার জনগণের পপুলার ম্যান্ডেট পাওয়ার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গত ১৬ মাসে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, বরং অপশাসন আমাদের ওপর আরও জোরালোভাবে চেপে বসেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের ভাতের ও ভোটের অধিকারের স্লোগান জনপ্রিয় করেছিলেন। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। আজকের নির্বাচন তাদের এ বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের একটি সুবর্ণ সুযোগ বলে অনেকে মনে করছেন।

আমরা আশা করব, সংশিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল আচরণ করবেন, যাতে বিশুদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়। 

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ২৮ এপ্রিল ২০১৫
www.jugantor.com/window/2015/04/28/255791#sthash.Sh07HepG.dpuf

No comments:

Post a Comment